উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা: (৬৩৪-৬৪৪খ্রি.)
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর মৃত্যুর পর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।তার শাসন ছিল ন্যায়বিচার, কঠোর শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের অনন্য সংমিশ্রণ।
সাম্রাজ্যের অভূতপূর্ব বিস্তার বিজয় ও শাসন:
হযরত ওমর (রা.)-এর ১০ বছরের শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা আরবের বাইরে বহুদূরে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সেনাপতিদের দক্ষ পরিচালনায় তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি—পারস্য (ইরান) এবং রোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হয়। এর ফলে ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর এবং খোরাসান মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশেষ করে জেরুজালেম বিজয় ছিল তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা, যেখানে তিনি কোনো রক্তপাত ছাড়াই শহরটি জয় করেন এবং খ্রিস্টানদের জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা দেন।
রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্য বিজয়: রোমানরা ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল এবং শক্তিশালী বাহিনী। সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চল থেকে রোমানদের হটিয়ে দেওয়ার জন্য এই অভিযান চালানো হয়-
৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ, এটি ছিল রোমানদের সাথে মুসলমানদের চূড়ান্ত লড়াই। রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস প্রায় ২ লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী পাঠান, যার বিপরীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৬ থেকে ৪০ হাজার। এই যুদ্ধে মুসলমানদের প্রধান সেনাপতি ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। তাঁর অসাধারণ রণকৌশল এবং মুসলমানদের অটল বিশ্বাসের কাছে রোমানরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই এক যুদ্ধের মাধ্যমেই পুরো সিরিয়া ও জর্ডান অঞ্চলের ওপর রোমান কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যায়।
ইয়ারমুকের পর মুসলমানরা পবিত্র শহর জেরুজালেম ঘেরাও করে। সেখানকার ধর্মযাজক সোফ্রোনিয়াস শর্ত দেন যে, তিনি খলিফা উমর (রা.) ছাড়া আর কারও কাছে শহরের চাবি দেবেন না। খলিফা উমর (রা.) নিজে সাধারণ পোশাকে উটে চড়ে মদিনা থেকে জেরুজালেমে যান এবং কোনো রক্তপাত ছাড়াই শহরটি জয় করেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক সফর এবং খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা দেওয়ার ঘটনা আজ পর্যন্ত ইনসাফের বড় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমানরা রোমানদের হাত থেকে মিশরকে মুক্ত করেন। রোমানদের কঠোর কর এবং ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে মিশরের সাধারণ মানুষ মুসলমানদের সাদরে গ্রহণ করেছিল।
পারস্য (ইরান) বিজয় : পারস্য ছিল কয়েকশ বছরের পুরোনো এক বিশাল সাম্রাজ্য। তারা অহংকারী ছিল এবং মুসলমানদের তুচ্ছজ্ঞান করত। খলিফা ওমর (রা.)-এর সময়ে তাদের দম্ভ ধুলোয় মিশে যায়-
৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ, সেনাপতি সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে পারস্যের বিশাল বাহিনীর সাথে ইরাকের কাদেসিয়া নামক স্থানে লড়াই হয়। পারস্যের সেনাপতি রুস্তম বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করলেও মুসলমানদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পরাজিত হন এবং রুস্তম নিহত হন। এই বিজয় পারস্য সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ড কাঁপিয়ে দেয় এবং মুসলমানরা পারস্যের রাজধানী মাদায়েন জয় করেন।
৬৪২ খ্রিস্টাব্দ, কাদেসিয়ার পরাজয়ের পর পারস্য সম্রাট ইয়াজদগিরদ তাঁর শেষ শক্তি দিয়ে লড়াই করার চেষ্টা করেন। নিহাওয়ান্দে মুসলিম বাহিনীর কাছে তারা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধকে মুসলমানরা ফাতহুল ফুতুহ বা বিজয়সমূহের বিজয় নামে অভিহিত করেন। এর মাধ্যমে পারস্যের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা চিরতরে ভেঙে পড়ে।
উমর (রা.) পারস্য বিজয়ের পর সেখানকার কৃষকদের অধিকার ফিরিয়ে দেন, অত্যাচারী সামন্তপ্রথা বিলুপ্ত করেন এবং আরবী মুদ্রার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনিক সুবিধা বজায় রাখেন। এর ফলে খুব দ্রুত বর্তমান ইরান ও পারস্যের মানুষ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে।
ওমর (রা.)-এর কৌশল ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞা :
খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রায় ২২ লক্ষ বর্গমাইল এলাকায় বিস্তৃত হয়েছিল। রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ছিল বিশ্বের ইতিহাসে এক বড় ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, যা ইসলামের প্রচার ও প্রসারকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিল।ওমর (রা.) কেবল মদিনায় বসে নির্দেশ দিতেন না, বরং যুদ্ধের প্রতিটি ধাপ তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি আদেশ দিয়েছিলেন যে, বিজিত অঞ্চলের কোনো মন্দির, গির্জা বা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা যাবে না। যুদ্ধবন্দীদের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে। এই নৈতিকতার কারণেই বিশাল রোমান ও পারস্য অঞ্চলের মানুষ মুসলমানদের মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তিনি সৈন্যদের জন্য আলাদা বেতন, রেশন এবং সেনানিবাস (যেমন: কুফা ও বসরা শহর) তৈরি করেছিলেন। তাঁর সুশৃঙ্খল গোয়েন্দা বিভাগের কারণে তিনি হাজার মাইল দূরে থেকেও জানতেন যুদ্ধের ময়দানে কী ঘটছে।
তিনিই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রকে একটি আধুনিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করান। বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য তিনি একে বিভিন্ন প্রদেশে ভাগ করেন এবং প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে ওয়ালি বা গভর্নর নিয়োগ করেন। এছাড়া তিনি মহানবী (সা.)-এর হিজরতকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি হিজরি ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি প্রথম আহদাস বা পুলিশ বাহিনী এবং একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে আলাদা করেন এবং দক্ষ কাজী বা বিচারক নিয়োগ দেন, যারা খলিফার প্রভাবমুক্ত হয়ে রায় দিতে পারতেন।
হযরত ওমর (রা.) রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মাল-কে জনগণের আমানত হিসেবে দেখতেন। তিনি প্রথম সরকারিভাবে আদমশুমারি করান এবং প্রতিটি নাগরিকের (মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে) জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেন। অসহায় বৃদ্ধ, বিধবা এবং এতিমদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তিনি অসংখ্য রাস্তা, সেতু, মসজিদ এবং মুসাফিরখানা নির্মাণ করেন। দুর্ভিক্ষ ও সংকটের সময় তিনি নিজে পিঠে আটার বস্তা বয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিতেন।
ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর কাছে আমির-ফকির, আপন-পর কোনো ভেদাভেদ ছিল না। এমনকি অপরাধ করলে তিনি নিজের ছেলেকেও শাস্তি দিতে দ্বিধা করেননি। তাঁর শাসনামলে বাঘ ও ছাগল এক ঘাটে জল খেত—এই প্রবাদটি মানুষের মুখে মুখে ছিল। এত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও তাঁর কোনো রাজপ্রাসাদ বা দেহরক্ষী ছিল না। তিনি সাধারণ মানুষের মতো তালি দেওয়া পোশাক পরতেন এবং মাটিতে ঘুমাতেন।
Comments
Post a Comment