হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনকাল (৬৬১-৬৮০ খ্রি.)
হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনকাল (৬৬১-৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। হযরত হাসান (রা.)-এর সাথে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ২০ বছর শাসন করেন। তাঁর শাসনকালকে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর হাত ধরেই ইসলামের ইতিহাসে উমাইয়া রাজবংশের সূচনা হয়। তিনি খিলাফতের প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী মদিনা থেকে সরিয়ে সিরিয়ার দামেস্কে স্থানান্তর করেন। দামেস্ক ছিল তৎকালীন সময়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রোমানদের কাছ থেকে বিজিত একটি উন্নত শহর। এই পরিবর্তনের ফলে আরব উপদ্বীপের বাইরে বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করা তাঁর জন্য সহজ হয়।
হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে বলা হয় মুসলিম নৌবাহিনীর জনক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে হলে সমুদ্রে শক্তিশালী হতে হবে। তাঁর শাসনামলে প্রায় ১,৭০০ যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা হয়। এই নৌবাহিনীর সাহায্যেই মুসলমানরা সাইপ্রাস, রোডস এবং ক্রিট দ্বীপ জয় করে। এমনকি তাঁর সময়েই প্রথমবার সমুদ্রপথে রোমানদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) ঘেরাও করা হয়েছিল।
দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য তিনি একটি সুশৃঙ্খল ডাক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। ঘোড়ার মাধ্যমে এক শহর থেকে অন্য শহরে দ্রুত চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।জালিয়াতি রোধ করার জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্র বা নির্দেশে বিশেষ সীল বা মোহার ব্যবহারের নিয়ম চালু করেন।তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের জন্য আলাদা আলাদা দপ্তর (যেমন অর্থ দপ্তর, রাজস্ব দপ্তর) গঠন করেন, যা রাষ্ট্র পরিচালনার কাজকে সহজ করে দেয়।
সীমান্ত রক্ষা ও সাম্রাজ্য বিস্তার:হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর ২০ বছরের শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার গভীরে পৌঁছে যায়। পশ্চিমে তাঁর বাহিনী উত্তর আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত এবং পূর্বে বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, মিশর, ইরাক, ইরান, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং উত্তর আফ্রিকার কিছু অংশ তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।রোমানদের সাথে লড়াইয়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং সীমান্তে নিয়মিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে মুসলিম ভূখণ্ডকে নিরাপদ রাখতেন।:
হযরত মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা হিলম (ধৈর্য ও সহনশীলতা)-এর জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি বলতেন:
"যেখানে আমার চাবুক কাজ করে, সেখানে আমি তলোয়ার ব্যবহার করি না। আর যেখানে আমার কথা দিয়ে কাজ হয়, সেখানে আমি চাবুক ব্যবহার করি না।"
তিনি বিরোধীদের সাথেও আলোচনার মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করতেন। দীর্ঘ পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধের পর তাঁর শাসনামলে সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরে এসেছিল।
উত্তরাধিকারী নির্বাচন ও চুক্তি লঙ্গন:মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনের শেষ পর্যায়ে তিনি একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন, চিন্তা করেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যদি কোনো নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারী না থাকে, তবে মুসলিম সাম্রাজ্য আবার গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে। এই আশঙ্কায় তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নেন। যা ইসলামের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে।
হযরত হাসান (রা.)-এর সাথে চুক্তির একটি প্রধান শর্ত ছিল যে, মুয়াবিয়া (রা.) নিজের ইচ্ছামতো কাউকে উত্তরাধিকারী করবেন না; বরং খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহর (শুরা কমিটির) ওপর থাকবে। ইয়াজিদকে মনোনীত করার মাধ্যমে এই চুক্তিটি সরাসরি লঙ্ঘিত হয়। তিনি তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলে ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করেনএবং মুয়াবিয়া (রা.) বেঁচে থাকতেই বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের কাছ থেকে ইয়াজিদের জন্য বায়াত বা আনুগত্যের শপথ আদায় করতে শুরু করেন। এর আগে খলিফা নির্বাচনের জন্য সাহাবীদের পরামর্শ বা জনগণের ভোট নেওয়া হতো, কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.)-এর এই সিদ্ধান্তের ফলে খিলাফত একটি রাজতন্ত্রের রূপ নেয়। অনেক বিশিষ্ট সাহাবী, বিশেষ করে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.),আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) , আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।
তাঁদের যুক্তি ছিল, খিলাফত কোনো রাজতন্ত্র বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি নয়।ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নেওয়া মানে ইসলামের গণতান্ত্রিক ও আদর্শিক খিলাফত ব্যবস্থাকে চিরতরে ধ্বংস করে একটি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। মূল বিরোধের কারণ ছিলো ,ইয়াজিদের ব্যক্তিগত চরিত্র এবং খলিফা হওয়ার অযোগ্যতা নিয়েও তৎকালীন মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। তারা মনে করতেন, ইয়াজিদ ইসলামের আদর্শ রক্ষা করতে সক্ষম নন। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং মদিনা থেকে মক্কার অভিমুখে রওনা হন।
মৃত্যুর সময়কাল :হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যু ছিল উমাইয়া খিলাফতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তিনি দীর্ঘ ২০ বছর খলিফা হিসেবে এবং তার আগে প্রায় ২০ বছর সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৬০ হিজরির রজব মাসে (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) সিরিয়ার দামেস্কে বার্ধক্য ও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৮ থেকে ৮০ বছর।হযরত মুয়াবিয়া (রা.) মহানবী (সা.)-এর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর কাছে নবীজি (সা.)-এর দেওয়া কিছু চুল, নখ এবং একটি চাদর সংরক্ষিত ছিল। তিনি অসিয়ত করেছিলেন যে:আমার মৃত্যুর পর যখন আমাকে কাফন পরানো হবে, তখন নবীজি (সা.)-এর সেই পবিত্র নখ ও চুলগুলো যেন আমার চোখ ও মুখের ওপর রাখা হয় এবং তাঁর দেওয়া চাদরটি যেন আমার গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়।তিনি আশা করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই স্মৃতিগুলোর বরকতে আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করবেন। তাঁর মৃত্যুর পর দামেস্কের বাবুস সাগির নামক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
পরবর্তী শাসকের শাসনকাল- ইয়াজিদের শাসনকাল (৬৮০–৬৮৩ খ্রিস্টাব্দ)
আরো জানতে ক্লিক করুন- মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন-

Comments
Post a Comment