"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)


খলিফা হারুন-অর-রশিদ: (৭৮৬–৮০৯ খ্রিস্টাব্দ)

খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬–৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন আব্বাসীয় বংশের পঞ্চম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী খলিফা। তাঁর শাসনামলকে ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়।

তিনি কেবল একজন শক্তিশালী শাসকই ছিলেন না, বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং জৌলুসের এক অনন্য প্রতীক ছিলেন। বিশ্ববিখ্যাত আরব্য রজনী গল্পের অনেক কাহিনী তাঁকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।

বিশ্বের বাণিজ্যিক কেন্দ্র: খলিফা হারুন-অর-রশিদের আমলের বাগদাদ ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক এবং সম্পদশালী শহর। সেই সময়ে বাগদাদ ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মিলনমেলা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের ব্যবসায়ীদের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

চীন থেকে আসা সিল্ক (রেশম) ও কাগজ, ভারত থেকে আসা মসলা ও নীল এবং আফ্রিকা থেকে আসা সোনা ও হাতির দাঁত—সবই বাগদাদের বাজারে কেনাবেচা হতো। দজলা ও ফোরাত নদী ব্যবহার করে বিশাল জাহাজগুলো পারস্য উপসাগর হয়ে সরাসরি বাগদাদের বন্দরে এসে ভিড়ত।বাগদাদের বাজারগুলো ছিল সুসংগঠিত। একেকটি পণ্যের জন্য আলাদা আলাদা বাজার ছিল। যেমন—সুগন্ধির বাজার, কাপড়ের বাজার এবং বইয়ের বাজার। বাগদাদের তৈরি কাপড় এবং কার্পেট সারা বিশ্বে এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, ইউরোপের রাজপরিবারগুলোও এসব পণ্য সংগ্রহ করত।হারুন-অর-রশিদের আমলে মুদ্রা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ছিল। ব্যবসায়ীরা নগদ টাকার বদলে 'সুক' (বর্তমান চেকের আদি রূপ) ব্যবহার করতেন। এক শহর থেকে সুক লিখে অন্য শহরে গিয়ে টাকা তোলা যেত, যা বিশ্ব বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। সরকারি কোষাগারে বা বায়তুল মালে তখন প্রতি বছর কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রা জমা হতো। 


জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ: হারুন-অর-রশিদের বাগদাদ কেবল বাণিজ্যের শহর ছিল না, এটি ছিল স্থাপত্য ও বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদের শহর। আরব্য রজনীর গল্পে আমরা যে প্রাসাদের বর্ণনা পাই, তা মূলত এই আমলের বাস্তব জৌলুসেরই প্রতিফলন। এটি ছিল হারুন-অর-রশিদের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাসাদ। দজলা নদীর তীরে নির্মিত এই বিশাল প্রাসাদে ছিল অসংখ্য কক্ষ, যেগুলো দামি মার্বেল পাথর, সোনা এবং রত্ন দিয়ে সাজানো হয়েছিল। এর বিশাল গম্বুজ এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ দর্শকদের মুগ্ধ করত। প্রাসাদের চারদিকে ছিল বিশাল সব কৃত্রিম বাগান, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা দুর্লভ গাছপালা লাগানো হতো। খলিফা হারুন পানি সরবরাহের জন্য বাগানে কৃত্রিম ফোয়ারা ও নালা তৈরি করেছিলেন, যা মরুভূমির উত্তাপের মধ্যেও রাজপ্রাসাদকে শীতল রাখত। যখন বিদেশি দূতরা খলিফার সাথে দেখা করতে আসতেন, তখন রাজকীয় জৌলুস দেখে তারা অবাক হয়ে যেতেন। প্রাসাদের মেঝেতে বিছানো থাকত রেশমি কার্পেট এবং দেয়ালে ঝোলানো থাকত মখমলের পর্দা। খলিফার সিংহাসনটি ছিল রত্নখচিত এবং তাঁর দেহরক্ষীদের পোশাকও ছিল অত্যন্ত দামি ও সুসজ্জিত। বাগদাদ তখন এতটাই সমৃদ্ধ ছিল যে তাকে বলা হতো পৃথিবীর নাভি বা শান্তির শহর। বিশ্বের সব সম্পদ এবং মেধা যেন এক বাগদাদেই এসে জমা হয়েছিল। হারুন-অর-রশিদের এই জৌলুসই মুসলিম ইতিহাসকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

জ্ঞানের ভাণ্ডার: হারুন-অর-রশিদ বাগদাদে একটি বিশাল লাইব্রেরি ও গবেষণাগার হিসেবে বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি কেবল একটি পাঠাগার ছিল না, বরং এটি ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয়। হারুন-অর-রশিদ তাঁর গোয়েন্দা এবং দূতদের নির্দেশ দিয়েছিলেন বিশ্বের যেখানেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বই পাওয়া যাবে, তা সংগ্রহ করে বাগদাদে নিয়ে আসার জন্য। বিশেষ করে রোমানদের সাথে যুদ্ধের সময় তিনি অনেক ক্ষেত্রে সন্ধির শর্ত হিসেবে স্বর্ণমুদ্রার বদলে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি বা বই দাবি করতেন। বাইতুল হিকমাহর মূল কাজ ছিল প্রাচীন গ্রিক, পারস্য (ইরানি), ভারতীয় (সংস্কৃত) এবং সিরিয়াক ভাষার বইগুলো আরবিতে অনুবাদ করা। এর ফলে প্লেটো, অ্যারিস্টটল এবং গ্যালেনের মতো মহান দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের জ্ঞান মুসলিম বিশ্বের নাগালে চলে আসে। এখান থেকেই চিকিৎসা শাস্ত্র, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং দর্শনের আধুনিক চর্চা শুরু হয়। হারুন-অর-রশিদের আমলেই বাগদাদে প্রথম বড় আকারে কাগজের কল স্থাপন করা হয়। এর ফলে হাতে লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে যায় এবং বাইতুল হিকমাহর জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।

বিদ্বানদের কদর: হারুন-অর-রশিদ বিশ্বাস করতেন যে, একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ হলো তার শিক্ষিত সমাজ। তিনি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মেধাবীদের সর্বোচ্চ সম্মান দান করতেন। হারুন-অর-রশিদ এবং তাঁর ছেলে আল-মামুনের আমলের একটি বিখ্যাত নিয়ম ছিল যে, কোনো লেখক বা অনুবাদক যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বই অনুবাদ বা রচনা করতেন, তবে সেই বইটির ওজনের সমান সোনা তাঁকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হতো। এই অভাবনীয় পুরস্কারের কারণে সারা বিশ্বের পণ্ডিতরা বাগদাদে এসে সমবেত হতেন। খলিফার দরবারে মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি, খ্রিস্টান এবং পারসিক পণ্ডিতরাও সমান মর্যাদা পেতেন। হারুন মনে করতেন জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নয়। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক থেকে শুরু করে প্রধান অনুবাদকদের অনেকেই ছিলেন অমুসলিম। এই উদারতার ফলে বাগদাদ একটি আন্তর্জাতিক মেধার মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। তাঁর সময়েই বিখ্যাত রসায়নবিদ জাবির ইবনে হাইয়ান এবং গণিতবিদদের পূর্বসূরিরা কাজ শুরু করেন। হারুন কেবল বিজ্ঞান নয়, সাহিত্যেরও সমঝদার ছিলেন। তাঁর দরবারে কবিদের জন্য আলাদা স্থান বরাদ্দ ছিল এবং শ্রেষ্ঠ কবিতার জন্য হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেওয়া হতো।


রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযান: খলিফা হারুন-অর-রশিদের শাসনকালের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং বীরত্বগাথামূলক অধ্যায় হলো রোমান (বাইজেন্টাইন) সম্রাট নাইসেফোরাসের বিরুদ্ধে তাঁর সামরিক অভিযান। এই ঘটনাটি মূলত একটি অত্যন্ত কড়া এবং ঐতিহাসিক চিঠির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। খলিফা হারুন-অর-রশিদের পিতা আল-মাহদীর সময় থেকেই রোমানরা আব্বাসীয় খিলাফতকে বার্ষিক কর বা জিজিয়া দিতে বাধ্য ছিল। কিন্তু রোমান সম্রাট নাইসেফোরাস ক্ষমতা দখল করার পর এই কর দিতে অস্বীকার করেন।

নাইসেফোরাস খলিফা হারুনকে অত্যন্ত অপমানজনক একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন-

"রোমান সম্রাজ্ঞী আইরিন আপনাকে যে কর দিতেন, তা মূলত আপনারই তাকে দেওয়া উচিত ছিল। কারণ তিনি ছিলেন একজন নারী আর আপনি ছিলেন পুরুষ। কিন্তু এখন আমি ক্ষমতায় এসেছি। সুতরাং, আপনি এখন পর্যন্ত যত অর্থ আমাদের কাছ থেকে কর হিসেবে নিয়েছেন, তা অবিলম্বে ফেরত পাঠান। অন্যথায় আমাদের মধ্যে তরবারিই ফয়সালা করবে।"

নাইসেফোরাসের এই ধৃষ্টতাপূর্ণ চিঠি পড়ে খলিফা হারুন-অর-রশিদ এতটাই রাগান্বিত হয়েছিলেন যে, উপস্থিত দরবারীরা ভয়ে কাঁপছিলেন। তিনি কোনো দীর্ঘ চিঠি না লিখে নাইসেফোরাসের চিঠির অপর পাশেই নিজের জবাব লিখে দেন।

হারুন লিখেছিলেন-

"বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আমিরুল মুমিনিন হারুন-অর-রশিদের পক্ষ থেকে রোমান কুত্তা নাইসেফোরাসের প্রতি— হে কাফেরের পুত্র! আমি তোর চিঠি পড়েছি। আমার জবাব তুই পড়ার আগে নিজের চোখে দেখতে পাবি (অর্থাৎ আমি সশরীরে আক্রমণ করতে আসছি)।"

চিঠি পাঠানোর পরপরই হারুন-অর-রশিদ কালক্ষেপণ না করে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে রোমানদের হৃদপিণ্ড এশিয়া মাইনরের দিকে রওনা হন। হারুন-অর-রশিদের বাহিনী রোমানদের একের পর এক দুর্গ গুঁড়িয়ে দেন। তিনি রোমানদের অন্যতম শক্তিশালী শহর হেরাক্লিয়া জয় করেন। হারুনের রণকৌশল এবং মুসলিম বাহিনীর তীব্র আক্রমণে রোমান সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

হারুন এমন সময়ে আক্রমণ করেছিলেন যখন প্রচণ্ড শীত ছিল। রোমানরা ভেবেছিল শীতের কারণে মুসলিমরা পিছিয়ে যাবে, কিন্তু হারুন তাঁর বাহিনীকে নিয়ে তুষারপাতের মধ্যেও যুদ্ধ চালিয়ে যান এবং রোমানদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের কাছাকাছি পৌঁছে যান।

নাইসেফোরাস নিজের খোদ রাজধানীর পতন আসন্ন দেখে সম্রাট নাইসেফোরাস আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন যে হারুন-অর-রশিদের সাথে যুদ্ধে জেতা অসম্ভব। নাইসেফোরাস অত্যন্ত বিনীতভাবে খলিফার কাছে ক্ষমা চান এবং পুনরায় কর দিতে রাজি হন। হারুন-অর-রশিদ পূর্বের চেয়েও দ্বিগুণ কর ধার্য করেন এবং নাইসেফোরাসকে বাধ্য করেন প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা জিজিয়া হিসেবে বাগদাদে পাঠাতে। এছাড়াও যুদ্ধে বন্দি হওয়া মুসলমানদের মুক্তি দেওয়ার শর্তে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

সম্রাট নাইসেফোরাস ভেবেছিলেন হারুন-অর-রশিদ কেবল একজন বিলাসপ্রিয় খলিফা। কিন্তু হারুনের এই দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপ প্রমাণ করেছিল যে তিনি ইসলামের সীমানা রক্ষায় কতটা আপসহীন ছিলেন। এই ঘটনার পর হারুন-অর-রশিদের নাম পুরো ইউরোপে ভয়ের ও সম্মানের সাথে উচ্চারিত হতো।



মক্কা চুক্তি : হারুন-অর-রশিদ ৮০২ খ্রিস্টাব্দে হজ্জ পালনের সময় পবিত্র কাবার দেয়ালে যে চুক্তিটি ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন (মক্কা চুক্তি), সেখানে তিন পুত্রের দায়িত্ব এভাবে ভাগ করা ছিল-

১. বড় ছেলে: আল-আমিন (কেন্দ্রীয় শাসন)

হারুন-অর-রশিদ আল-আমিনকে তাঁর প্রথম উত্তরাধিকারী এবং প্রধান খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন।

  • অঞ্চল: তাঁর শাসনে ছিল সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ইরাক, সিরিয়া, হিজাজ (মক্কা-মদিনা), মিশর এবং উত্তর আফ্রিকা।
  • রাজধানী: তাঁর কেন্দ্র ছিল রাজধানী বাগদাদ।
  • অবস্থান: আমিন ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত মায়ের সন্তান, তাই আরব অভিজাতরা তাঁকে সমর্থন করত।

২. মেজ ছেলে: আল-মামুন (পূর্বাঞ্চলীয় শাসন)

মামুনকে দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী এবং একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

  • অঞ্চল: তাঁর অধীনে ছিল বিশাল খোরাসান এবং পারস্যের (ইরান) পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো।
  • শর্ত: চুক্তিতে বলা ছিল যে মামুন খোরাসানের রাজস্ব (ট্যাক্স) সরাসরি বাগদাদে পাঠাতে বাধ্য থাকবেন না, বরং সেই অর্থ তিনি নিজের অঞ্চলের উন্নয়নে ব্যয় করবেন। তবে তিনি খলিফা আমিনের আনুগত্য স্বীকার করবেন।
  • অবস্থান: মামুনের মা ছিলেন পারসিক, তাই পারস্যের জনগণ ও সেনাবাহিনী তাঁর প্রধান শক্তি ছিল।

৩. ছোট ছেলে: আল-মুতামিন (সীমান্তবর্তী অঞ্চল)

মুতামিনকে তৃতীয় উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করা হয়।

  • অঞ্চল: তাঁকে দেওয়া হয়েছিল জাজিরা (উত্তর মেসোপটেমিয়া) এবং বাইজেন্টাইন বা রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো।
  • ভূমিকা: তাঁর মূল দায়িত্ব ছিল রোমানদের আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যের সীমান্ত রক্ষা করা।


বারমাকি পরিবারের উত্থান ও পতন: বারমাকিরা ছিলেন মূলত পারস্যের (বর্তমান ইরান) একটি অত্যন্ত শিক্ষিত ও অভিজাত পরিবার। হারুন-অর-রশিদের পিতা আল-মাহদীর সময় থেকেই ইয়াহিয়া ইবনে খালিদ বারমাকি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি ছিলেন হারুন-অর-রশিদের শিক্ষক ও মেন্টর। হারুনের বড় ভাই আল-হাদী যখন হারুনকে সরিয়ে নিজের ছেলেকে উত্তরাধিকারী করতে চেয়েছিলেন, তখন ইয়াহিয়া নিজের জীবন বাজি রেখে হারুনের অধিকার রক্ষা করেছিলেন। হারুন ক্ষমতায় বসার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ইয়াহিয়াকে প্রধান উজির নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে অসীম ক্ষমতা দান করেন। ইয়াহিয়ার দুই পুত্র—ফজল এবং জাফর ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। ফজল ছিলেন একজন দুর্দান্ত সেনাপতি ও প্রশাসক, আর জাফর ছিলেন হারুনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তাঁরা সাম্রাজ্যের অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামরিক ব্যবস্থাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

এক সময় পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, বারমাকিদের অনুমতি ছাড়া রাজপ্রাসাদে একটি পাতাও নড়ত না। বারমাকিরা অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। তাঁদের দরবারে কবি ও পণ্ডিতদের ভিড় লেগে থাকত। তাঁদের সম্পদ ও জৌলুস খলিফার প্রাসাদের জৌলুসকেও হার মানিয়েছিল। পারস্যের মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন নয়নমণি। তাঁদের প্রশাসনিক দক্ষতায় সাম্রাজ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধি এসেছিল, যা সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের জনপ্রিয় করে তুলেছিল।বারমাকিদের এই আকাশচুম্বী সাফল্যই তাঁদের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। হারুন-অর-রশিদ এক সময় উপলব্ধি করেন যে, তিনি কার্যত একজন নামমাত্র খলিফায় পরিণত হয়েছেন। রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বারমাকিরাই নিচ্ছেন। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে, বারমাকিরা যেকোনো সময় আব্বাসীয় বংশকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করতে পারে।

ইতিহাসে একটি রোমাঞ্চকর কাহিনী প্রচলিত আছে। হারুন তাঁর বোন আব্বাসা এবং তাঁর প্রিয় বন্ধু জাফর বারমাকিকে খুব পছন্দ করতেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁরা যেন সবসময় তাঁর মজলিসে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু ইসলামি আইন অনুযায়ী পরপুরুষের সাথে নারী এক মজলিসে থাকতে পারেন না, তাই হারুন শর্তসাপেক্ষে তাঁদের বিয়ে দেন। শর্ত ছিল তাঁরা স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকতে পারবেন না। কিন্তু তাঁরা সেই শর্ত ভঙ্গ করেন এবং তাঁদের সন্তান হয়। এটি জানাজানি হলে হারুন প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন। (যদিও অনেক ঐতিহাসিক একে নিছক গল্প মনে করেন)।

দরবারের অন্যান্য আরব নেতারা (যারা পারসিক বারমাকিদের হিংসা করত) খলিফার কানে প্রতিনিয়ত বিষ ঢালত যে, বারমাকিরা শিয়া মতবাদ প্রচার করছে এবং খিলাফত দখলের ষড়যন্ত্র করছে।

৮০৩ খ্রিস্টাব্দে হারুন-অর-রশিদ অত্যন্ত আকস্মিক ও নিষ্ঠুরভাবে বারমাকিদের ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। এক রাতে হারুন তাঁর দেহরক্ষীকে পাঠিয়ে তাঁর প্রিয় বন্ধু জাফর বারমাকিকে হত্যা করেন এবং তাঁর দেহ জনসম্মুখে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

প্রধান উজির ইয়াহিয়া এবং তাঁর অপর পুত্র ফজলসহ বারমাকি পরিবারের সকল সদস্যকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং তাঁদের যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

বৃদ্ধ বয়সে অপমানে ও কষ্টে ইয়াহিয়া কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন। হারুন আদেশ দিয়েছিলেন যে, রাজত্বে কেউ যেন বারমাকিদের নাম উচ্চারণ না করে।

বারমাকি পরিবারের পতন ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের জন্য একটি বড় ধাক্কা। তাদের সরিয়ে দেওয়ার পর হারুন-অর-রশিদ যোগ্য প্রশাসকের অভাবে ভোগেন এবং সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। অনেকে মনে করেন, বারমাকিদের প্রতি হারুনের এই নিষ্ঠুরতা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল।

সমাজব্যবস্থা ও সুশাসন: হারুন-অর-রশিদের আমল ছিল সাধারণ মানুষের জন্য একটি সুখময় সময়। হারুন-অর-রশিদের জীবনযাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর নাইট পেট্রোলিং বা নৈশকালীন পরিভ্রমণ। তিনি প্রায়ই সাধারণ মানুষের পোশাকে ছদ্মবেশ ধরে রাতের বেলা বাগদাদের পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রজাদের প্রকৃত দুঃখ-কষ্ট এবং অভাব-অভিযোগ নিজের চোখে দেখা। আরব্য রজনীর অনেক গল্পের ভিত্তি হলো তাঁর এই ছদ্মবেশী ভ্রমণ।

খলিফা তাঁর রাজকোষ থেকে অকাতরে দান করতেন। তিনি অসংখ্য হাসপাতাল (বিমারিস্তান), এতিমখানা এবং মুসাফিরখানা নির্মাণ করেছিলেন। অসুস্থদের বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। হজ্জ যাত্রীদের সুবিধার জন্য মক্কা-মদিনার পথে পানির কূপ ও সরাইখানা নির্মাণ করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান।

রাজপরিবারের নারীরাও জনকল্যাণে অংশ নিতেন। হারুনের স্ত্রী রানি জুবায়দা হজ্জ যাত্রীদের পানির কষ্ট দূর করার জন্য কয়েক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয়ে বিখ্যাত নহরে জুবায়দা (জুবায়দা খাল) খনন করেছিলেন, যা আজও ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির ফলে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছিল। মুদ্রাস্ফীতি কম ছিল এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম ছিল সহনীয়। সে সময় একজন সাধারণ শ্রমিকও সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারত।

হারুন-অর-রশিদ ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। তিনি বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখার চেষ্টা করতেন।তিনি প্রথম প্রধান বিচারপতি বা কাজী-উল-কুজ্জাত পদটি সৃষ্টি করেন এবং প্রখ্যাত ইমাম আবু ইউসুফকে (রহ.) এই পদে নিয়োগ দেন। এর ফলে বিচারব্যবস্থায় আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। খলিফার বিরুদ্ধেও কেউ অভিযোগ করলে তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হতো।



অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও মৃত্যু : খলিফা হারুন-অর-রশিদের শাসনকাল যেমন জৌলুস ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য বিখ্যাত ছিল, তেমনি বিশাল এই সাম্রাজ্যকে এক সুতোয় গেঁথে রাখা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর সময়ে বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্রোহ দেখা দিলেও তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সেগুলো মোকাবিলা করেন। বিশাল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নানা কারণে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল।

উত্তর আফ্রিকায় (বর্তমান তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়া) বারবার বিদ্রোহের কারণে শাসনকাজ কঠিন হয়ে পড়ছিল। হারুন সেখানে দমনের পরিবর্তে একটি চতুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ইব্রাহিম ইবনুল আঘলাবকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে আধা-স্বায়ত্ত্বশাসন দান করেন। এর বিনিময়ে আঘলাবিরা আব্বাসীয় খিলাফতকে বার্ষিক কর দিতে এবং খলিফার নামে খুতবা পাঠ করতে রাজি হয়। এর ফলে ঐ অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসে।

সিরিয়ার মুদারি এবং ইয়েমেনি গোত্রগুলোর মধ্যে পুরনো শত্রুতা নিয়ে সংঘাত শুরু হলে হারুন কঠোর হাতে তা দমন করেন এবং সেখানে শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করেন।

খলিফা হারুন-অর-রশিদের মৃত্যু এবং তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারের পরিকল্পনা আব্বাসীয় খিলাফতের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং পরিণামদর্শী অধ্যায়। তাঁর মৃত্যু যেমন আকস্মিক ছিল, তেমনি তাঁর উত্তরাধিকার বণ্টন ব্যবস্থা সাম্রাজ্যকে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। হারুন-অর-রশিদের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল নিরন্তর যুদ্ধ এবং বিদ্রোহ দমনের ক্লান্তিতে। পারস্যের খোরাসান অঞ্চলে রাফি ইবনুল লাইসের নেতৃত্বে একটি ভয়াবহ বিদ্রোহ দেখা দিলে খলিফা হারুন নিজেই তা দমনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর পুত্র আল-মামুনকে সাথে নিয়ে বিশাল বাহিনীসহ বাগদাদ থেকে খোরাসানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাত্রাপথে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর পেটে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল। অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি অগ্রসর হতে থাকেন, কিন্তু ইরানের তুস (বর্তমান মাশহাদ) নামক স্থানে পৌঁছালে তাঁর অবস্থা আরও অবনতি হয়। অবশেষে ২৪শে মার্চ, ৮০৯ খ্রিস্টাব্দে ৪৫ বছর বয়সে এই মহান খলিফা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে তুস শহরের একটি বাগানে দাফন করা হয়। আজও সেখানে তাঁর কবর রয়েছে (যা বর্তমান ইমাম রেজা কমপ্লেক্সের সন্নিকটে অবস্থিত)।

উত্তরাধিকার: হারুন-অর-রশিদ তাঁর জীবদ্দশাতেই সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি পরিকল্পনা করেছিলেন, যা ইতিহাসে মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত। তিনি ভেবেছিলেন এতে তাঁর সন্তানদের মধ্যে বিবাদ মিটবে, কিন্তু বাস্তবে এটিই ছিল গৃহযুদ্ধের মূল কারণ। তিনি তার তিন পুত্রকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন---

আল-আমিন: হারুন-অর-রশিদ বড় ছেলে আল-আমিনকে তাঁর প্রথম উত্তরাধিকারী এবং প্রধান খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন।তাঁর শাসনে ছিল সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ইরাক, সিরিয়া, হিজাজ (মক্কা-মদিনা), মিশর এবং উত্তর আফ্রিকা।তাঁর কেন্দ্র ছিল রাজধানী বাগদাদ। আল-আমিন ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত মায়ের সন্তান, তাই আরব অভিজাতরা তাঁকে সমর্থন করত।

আল-মামুন: মেজ পুত্র মামুনকে দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী এবং একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর অধীনে ছিল বিশাল খোরাসান এবং পারস্যের (ইরান) পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো।চুক্তিতে বলা ছিল যে মামুন খোরাসানের রাজস্ব (ট্যাক্স) সরাসরি বাগদাদে পাঠাতে বাধ্য থাকবেন না, বরং সেই অর্থ তিনি নিজের অঞ্চলের উন্নয়নে ব্যয় করবেন। তবে তিনি খলিফা আমিনের আনুগত্য স্বীকার করবেন।মামুনের মা ছিলেন পারসিক, তাই পারস্যের জনগণ ও সেনাবাহিনী তাঁর প্রধান শক্তি ছিল।

আল-মুতামিন: ছোট ছেলে মুতামিনকে তৃতীয় উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করা হয়। কিন্তু বর্তমানে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল জাজিরা (উত্তর মেসোপটেমিয়া) এবং বাইজেন্টাইন বা রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো।তাঁর মূল দায়িত্ব ছিল রোমানদের আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যের সীমান্ত রক্ষা করা।

খলিফা হারুন-অর-রশিদ তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর এই পরিকল্পনাটি ছিল মূলত একটি প্রশাসনিক ভাগ, পূর্ণ স্বাধীনতা নয়। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর ছেলেরা একে অপরকে সহযোগিতা করবে, কিন্তু বাস্তবে তা সাম্রাজ্যকে টুকরো করার পথ তৈরি করে দেয়।

যদিও হারুন-অর-রশিদ ভেবেছিলেন এই ভাগের ফলে ভাইয়েরা নিজেদের এলাকা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এবং ঝগড়া হবে না, কিন্তু ফলাফল হয়েছিল উল্টো-

দ্বৈত শাসন: একটি সাম্রাজ্যে দুই শাসক (বাগদাদে একজন ও খোরাসানে একজন) থাকার ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

আল আমিনের হঠকারিতা: খলিফা হওয়ার পর আমিন চাইছিলেন পুরো সাম্রাজ্যের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ। তিনি মামুনের স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ শুরু করেন এবং মামুনের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজের ছেলেকে খলিফা বানাতে চান।

আরব বনাম পারস্য দ্বন্দ্ব: এই প্রশাসনিক ভাগটি শেষ পর্যন্ত একটি জাতিগত যুদ্ধে রূপ নেয়—আরব সমর্থিত আমিনের বাহিনী বনাম পারসিক সমর্থিত মামুনের বাহিনী।

হারুন-অর-রশিদ ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে ভাগ করলেও, মূলত মক্কা চুক্তি আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ঐক্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল। এই ভাগের ফলেই সেই বিখ্যাত গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ।

খলিফা হারুন-অর-রশিদের দুই পুত্র—আল-আমিন এবং আল-মামুনের মধ্যেকার এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে চতুর্থ ফিতনা নামে পরিচিত। এটি কেবল দুই ভাইয়ের যুদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল আরব বনাম পারস্যের (ইরান) প্রভাব বিস্তারের এক মহাযুদ্ধ।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট:হারুন-অর- রশিদের মৃত্যুর পর মক্কা চুক্তি মুখ থুবড়ে পড়ে। বাগদাদে খলিফা হওয়ার পর আল-আমিন তাঁর ভাই মামুনের ওপর খবরদারি শুরু করেন। তিনি মামুনের নাম খুতবা থেকে বাদ দেন এবং নিজের নাবালক পুত্র মুসাকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। এটি ছিল কাবার সেই পবিত্র শপথের চরম লঙ্ঘন।

মামুন তখন খোরাসানে (পারস্য) ছিলেন। তিনি আমিনের এই সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকার করেন এবং নিজেকে স্বাধীন শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। আমিনের পেছনে ছিল আরব সেনাবাহিনী, আর মামুনের শক্তি ছিল পারস্যের দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা।

আল আমিন (৮১১ খ্রিস্টাব্দ) বড় সেনাবাহিনী নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি আলী ইবনে ঈসাকে ৫০ হাজার সৈন্য দিয়ে পাঠান মামুনকে পরাজিত করতে।

মামুনের সেনাপতি ছিলেন তাহির ইবনে হুসাইন। তিনি মাত্র ৫-৬ হাজার সৈন্য নিয়ে আমিনের বিশাল বাহিনীকে রাই-এর কাছে মোকাবিলা করেন।

যুদ্ধে তাহিরের রণকৌশলের কাছে আমিনের বিশাল বাহিনী হেরে যায় এবং সেনাপতি আলী ইবনে ঈসা নিহত হন। এই একটি যুদ্ধেই যুদ্ধের মোড় মামুনের দিকে ঘুরে যায় এবং আব্বাসীয় খেলাফতের আরব আধিপত্য নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

বাগদাদ অবরোধ (৮১২–৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)

যুদ্ধে জয়ের পর মামুনের বাহিনী এগোতে থাকে এবং অবশেষে খলিফা আল আমিনের শেষ আশ্রয়স্থল বাগদাদ অবরোধ করে। এই অবরোধ ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও ধ্বংসাত্মক অবরোধ।

প্রায় এক বছর ধরে বাগদাদ চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে ছিল। মামুনের সেনাপতি তাহির এবং হারসামা শহরের উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ চালান।

মামুনের বাহিনী মিনজানিক (পাথর নিক্ষেপকারী যন্ত্র) দিয়ে বাগদাদ শহরের ওপর অনবরত বিশাল বিশাল পাথর ছুড়তে থাকে। এতে হারুন-অর-রশিদের তিলে তিলে গড়া সেই স্বপ্নের বাগদাদ শহর, প্রাসাদ ও বাগানগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

শহরের ভেতরে খাবারের অভাব দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ ও সৈন্যরা খলিফা আল আমিনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। বাগদাদের রাজপথগুলো রক্তে রঞ্জিত হয়।

যখন পতন অনিবার্য, আল-আমিন বুঝতে পারেন তাঁর আর পালানোর পথ নেই। তিনি  তার বাবা হারুন-অর-রশিদের পুরনো বন্ধু সেনাপতি হারসামার কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন।

হারসামা তাঁকে নিরাপত্তা দিলেও মামুনের অন্য সেনাপতি তাহির ইবনে হুসাইন তা মানতে চাননি। ৮১৩ খ্রিস্টাব্দের এক রাতে আল-আমিন যখন নৌকায় করে নদী পার হচ্ছিলেন, তখন তাহিরের সৈন্যরা তাঁকে ধরে ফেলে। সেখানেই খলিফা আল-আমিনের শিরচ্ছেদ করা হয়। ইতিহাসে তিনি একমাত্র আব্বাসীয় খলিফা যাঁর নিজ ভাইয়ের সেনাপতির হাতে মৃত্যু হয়। আল-আমিনের ছিন্ন মস্তক তাঁর ভাই মামুনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।


Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)