আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শাহাদাতের পর (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) পর ইসলামের নেতৃত্ব ও শাসনভার নিয়ে একটি ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক নেতৃত্ব বা খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
তিনি ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে মদিনা থেকে পুরো ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল এটিই । তিনি মাত্র ২ বছর ৩ মাস (৬৩২-৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ) শাসন করেছিলেন, কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি ইসলামের ভিত্তি মজবুত করে যান।তৎকালীন পরিস্থিতি:
রাসূল (সা.)-এর শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে আরবের বিভিন্ন প্রান্তে তিন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়-
ভণ্ড নবীদের উত্থান: আরবের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি নিজেদের নবী দাবি করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে।
যাকাত দিতে অস্বীকার: অনেক গোত্র ঘোষণা করে যে, তারা নামাজ পড়বে কিন্তু মদিনার কেন্দ্রীয় সরকারকে যাকাত দেবে না। তাদের যুক্তি ছিল যাকাত কেবল নবীজিকে দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল।
ধর্মত্যাগ (রিদ্দা): কিছু গোত্র পুরোপুরি ইসলাম ত্যাগ করে তাদের পুরনো পৌত্তলিকতায় ফিরে যায়।
আবু বকর (রা.) রিদ্দার যুদ্ধের জন্য পুরো মুসলিম বাহিনীকে ১১টি দলে ভাগ করেন এবং প্রতিটি দলের জন্য একজন সেনাপতি নিযুক্ত করেন। প্রধান যুদ্ধ ছিল- ইয়ামামার যুদ্ধ
মুসাইলামা কাজ্জাব (ইয়ামামার যুদ্ধ): সে ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ভণ্ড নবী। তার কাছে প্রায় ৪০,০০০ সৈন্য ছিল। বনু হানিফা গোত্রের এই বিদ্রোহী নেতাকে দমনের জন্য আবু বকর (রা.) খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে ১৩,০০০ সাহাবী ও আনসার যোদ্ধা পাঠান। ইতিহাসে এটি ইয়ামামার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে মুসাইলামা নিহত হয় এবং বিদ্রোহ দমন হয়। কিন্তু এই যুদ্ধে মুসলিমরা জয়লাভ করলেও প্রায় ১,২০০ মুসলিম শহীদ হন। এর মধ্যে ৭০০ জন ছিলেন হাফেজে কুরআন। বিখ্যাত সাহাবী সালেহ (রা.) এবং ওমরের ভাই যায়েদ ইবনুল খাত্তাব (রা.) এই যুদ্ধে শহীদ হন। এত বিপুল সংখ্যক হাফেজের শাহাদাত দেখে হযরত ওমর (রা.) অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন যে, যদি এভাবে হাফেজরা শহীদ হতে থাকেন, তবে কুরআনের কিছু অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তিনি খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে পরামর্শ দেন হে খলিফা! আপনি পবিত্র কুরআনকে একটি গ্রন্থ আকারে সংকলন করার ব্যবস্থা করুন।শুরুতে আবু বকর (রা.) কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন কারণ নবীজি (সা.) এটি করেননি। কিন্তু ওমর (রা.) তাকে বোঝান যে এটি ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জরুরি। অবশেষে আবু বকর (রা.) রাজি হন এবং নবীজির প্রধান লেখক যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে কুরআন সংকলনের দায়িত্ব দেন।ইয়ামামার যুদ্ধের ফলেই আমরা আজকে যে গ্রন্থ আকারে পবিত্র কুরআন দেখি, তার সংকলন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ।
বিদ্রোহী :
তুলাইহা বিন খুয়াইলিদ, সে নিজেকে নবী দাবি করে বনু আসাদ গোত্রকে নিয়ে বিদ্রোহ করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) তাকে পরাজিত করেন এবং পরবর্তীতে তুলাইহা লজ্জিত হয়ে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করেন।
আসওয়াদ আনসি, সে ইয়েমেনে বিদ্রোহ করেছিল। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের মাত্র একদিন আগে সে নিহত হয়, কিন্তু তার অনুসারীদের আবু বকর (রা.)-এর সময়ে পুরোপুরি নির্মূল করা হয়।
সাজাহ, সে ছিল একজন নারী, যে নিজেকে নবী দাবি করেছিল এবং পরে মুসাইলামার সাথে জোট বেঁধেছিল। সেও পরাজিত হয়ে পলায়ন করে।
এছাড়া ,অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও যারা কেবল যাকাত দিচ্ছে না, তাদের যেন ছাড় দেওয়া হয়। এমনকি হযরত ওমর (রা.)-ও শুরুতে কিছুটা নমনীয় হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু আবু বকর (রা.) অত্যন্ত কঠোরভাবে ঘোষণা করেন।
আল্লাহর কসম! রাসূল (সা.)-এর যুগে যারা যাকাত হিসেবে একটি উটের রশিও দিত, আজ যদি তারা তা দিতে অস্বীকার করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করব।তার এই দৃঢ়তা ইসলামি রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষা করেছিল।
ফলে পুরো আরব উপদ্বীপ পুনরায় একটি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আসে।
আরবের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমনের পর মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, যা পরবর্তীতে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য জয়ের পথ প্রশস্ত করে।হযরত আবু বকর (রা.)-এর এই সাহসী পদক্ষেপের কারণেই তাঁকে ইসলামের ত্রাণকর্তা বলা হয়।
Comments
Post a Comment