মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি



আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪)

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শাহাদাতের পর (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) পর ইসলামের নেতৃত্ব ও শাসনভার নিয়ে একটি ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক নেতৃত্ব বা খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তিনি ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে মদিনা থেকে পুরো ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল এটিই । তিনি মাত্র ২ বছর ৩ মাস (৬৩২-৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ) শাসন করেছিলেন, কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি ইসলামের ভিত্তি মজবুত করে যান।

তৎকালীন পরিস্থিতি:

রাসূল (সা.)-এর শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে আরবের বিভিন্ন প্রান্তে তিন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়-

ভণ্ড নবীদের উত্থান: আরবের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি নিজেদের নবী দাবি করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে।

যাকাত দিতে অস্বীকার: অনেক গোত্র ঘোষণা করে যে, তারা নামাজ পড়বে কিন্তু মদিনার কেন্দ্রীয় সরকারকে যাকাত দেবে না। তাদের যুক্তি ছিল যাকাত কেবল নবীজিকে দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল।

ধর্মত্যাগ (রিদ্দা): কিছু গোত্র পুরোপুরি ইসলাম ত্যাগ করে তাদের পুরনো পৌত্তলিকতায় ফিরে যায়।

আবু বকর (রা.) রিদ্দার যুদ্ধের জন্য পুরো মুসলিম বাহিনীকে ১১টি দলে ভাগ করেন এবং প্রতিটি দলের জন্য একজন সেনাপতি নিযুক্ত করেন। প্রধান যুদ্ধ ছিল- ইয়ামামার যুদ্ধ

মুসাইলামা কাজ্জাব (ইয়ামামার যুদ্ধ): সে ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ভণ্ড নবী। তার কাছে প্রায় ৪০,০০০ সৈন্য ছিল। বনু হানিফা গোত্রের এই বিদ্রোহী নেতাকে দমনের জন্য আবু বকর (রা.) খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে ১৩,০০০ সাহাবী ও আনসার যোদ্ধা পাঠান। ইতিহাসে এটি ইয়ামামার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে মুসাইলামা নিহত হয় এবং বিদ্রোহ দমন হয়। কিন্তু এই যুদ্ধে মুসলিমরা জয়লাভ করলেও প্রায় ১,২০০ মুসলিম শহীদ হন। এর মধ্যে ৭০০ জন ছিলেন হাফেজে কুরআন। বিখ্যাত সাহাবী সালেহ (রা.) এবং ওমরের ভাই যায়েদ ইবনুল খাত্তাব (রা.) এই যুদ্ধে শহীদ হন। এত বিপুল সংখ্যক হাফেজের শাহাদাত দেখে হযরত ওমর (রা.) অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন যে, যদি এভাবে হাফেজরা শহীদ হতে থাকেন, তবে কুরআনের কিছু অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তিনি খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে পরামর্শ দেন হে খলিফা! আপনি পবিত্র কুরআনকে একটি গ্রন্থ আকারে সংকলন করার ব্যবস্থা করুন।শুরুতে আবু বকর (রা.) কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন কারণ নবীজি (সা.) এটি করেননি। কিন্তু ওমর (রা.) তাকে বোঝান যে এটি ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জরুরি। অবশেষে আবু বকর (রা.) রাজি হন এবং নবীজির প্রধান লেখক যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে কুরআন সংকলনের দায়িত্ব দেন।ইয়ামামার যুদ্ধের ফলেই আমরা আজকে যে গ্রন্থ আকারে পবিত্র কুরআন দেখি, তার সংকলন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ।

বিদ্রোহী :

তুলাইহা বিন খুয়াইলিদ, সে নিজেকে নবী দাবি করে বনু আসাদ গোত্রকে নিয়ে বিদ্রোহ করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) তাকে পরাজিত করেন এবং পরবর্তীতে তুলাইহা লজ্জিত হয়ে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

আসওয়াদ আনসি, সে ইয়েমেনে বিদ্রোহ করেছিল। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের মাত্র একদিন আগে সে নিহত হয়, কিন্তু তার অনুসারীদের আবু বকর (রা.)-এর সময়ে পুরোপুরি নির্মূল করা হয়।

সাজাহ, সে ছিল একজন নারী, যে নিজেকে নবী দাবি করেছিল এবং পরে মুসাইলামার সাথে জোট বেঁধেছিল। সেও পরাজিত হয়ে পলায়ন করে।

এছাড়া ,অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও যারা কেবল যাকাত দিচ্ছে না, তাদের যেন ছাড় দেওয়া হয়। এমনকি হযরত ওমর (রা.)-ও শুরুতে কিছুটা নমনীয় হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু আবু বকর (রা.) অত্যন্ত কঠোরভাবে ঘোষণা করেন।

আল্লাহর কসম! রাসূল (সা.)-এর যুগে যারা যাকাত হিসেবে একটি উটের রশিও দিত, আজ যদি তারা তা দিতে অস্বীকার করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করব।তার এই দৃঢ়তা ইসলামি রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষা করেছিল।

ফলে পুরো আরব উপদ্বীপ পুনরায় একটি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আসে।

আরবের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমনের পর মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, যা পরবর্তীতে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য জয়ের পথ প্রশস্ত করে।হযরত আবু বকর (রা.)-এর এই সাহসী পদক্ষেপের কারণেই তাঁকে ইসলামের ত্রাণকর্তা বলা হয়।

শাহাদাত ও সময়কাল:

১৩ হিজরির জামাদিউল আউয়াল মাসে তিনি প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন। এই অসুস্থতা প্রায় ১৫ দিন স্থায়ী ছিল।৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩ আগস্ট (১৩ হিজরি, ২১ জামাদিউল আউয়াল) সোমবার সন্ধ্যায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।তাঁকে মদিনার মসজিদে নববীতে মহানবী (সা.)-এর কবরের পাশেই দাফন করা হয়।হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর মৃত্যুর আগেই সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করেন।সবাই এই সিদ্ধান্তে একমত হন এবং তাঁর মৃত্যুর পর হযরত ওমর (রা.) অত্যন্ত সফলভাবে শাসনভার গ্রহণ করেন।

 

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা: (৬৩৪-৬৪৪)

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর মৃত্যুর পর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।তার শাসন ছিল ন্যায়বিচার, কঠোর শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের অনন্য সংমিশ্রণ।

সাম্রাজ্যের অভূতপূর্ব বিস্তার বিজয় ও শাসন:

 হযরত ওমর (রা.)-এর ১০ বছরের শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা আরবের বাইরে বহুদূরে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সেনাপতিদের দক্ষ পরিচালনায় তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি—পারস্য (ইরান) এবং রোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হয়। এর ফলে ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর এবং খোরাসান মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশেষ করে জেরুজালেম বিজয় ছিল তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা, যেখানে তিনি কোনো রক্তপাত ছাড়াই শহরটি জয় করেন এবং খ্রিস্টানদের জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা দেন।

রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্য বিজয়: রোমানরা ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল এবং শক্তিশালী বাহিনী। সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চল থেকে রোমানদের হটিয়ে দেওয়ার জন্য এই অভিযান চালানো হয়-

৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ, এটি ছিল রোমানদের সাথে মুসলমানদের চূড়ান্ত লড়াই। রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস প্রায় ২ লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী পাঠান, যার বিপরীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৬ থেকে ৪০ হাজার। এই যুদ্ধে মুসলমানদের প্রধান সেনাপতি ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। তাঁর অসাধারণ রণকৌশল এবং মুসলমানদের অটল বিশ্বাসের কাছে রোমানরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই এক যুদ্ধের মাধ্যমেই পুরো সিরিয়া ও জর্ডান অঞ্চলের ওপর রোমান কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যায়।

ইয়ারমুকের পর মুসলমানরা পবিত্র শহর জেরুজালেম ঘেরাও করে। সেখানকার ধর্মযাজক সোফ্রোনিয়াস শর্ত দেন যে, তিনি খলিফা উমর (রা.) ছাড়া আর কারও কাছে শহরের চাবি দেবেন না। খলিফা উমর (রা.) নিজে সাধারণ পোশাকে উটে চড়ে মদিনা থেকে জেরুজালেমে যান এবং কোনো রক্তপাত ছাড়াই শহরটি জয় করেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক সফর এবং খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা দেওয়ার ঘটনা আজ পর্যন্ত ইনসাফের বড় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমানরা রোমানদের হাত থেকে মিশরকে মুক্ত করেন। রোমানদের কঠোর কর এবং ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে মিশরের সাধারণ মানুষ মুসলমানদের সাদরে গ্রহণ করেছিল।

পারস্য (ইরান) বিজয় : পারস্য ছিল কয়েকশ বছরের পুরোনো এক বিশাল সাম্রাজ্য। তারা অহংকারী ছিল এবং মুসলমানদের তুচ্ছজ্ঞান করত। খলিফা ওমর (রা.)-এর সময়ে তাদের দম্ভ ধুলোয় মিশে যায়-

৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ, সেনাপতি সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে পারস্যের বিশাল বাহিনীর সাথে ইরাকের কাদেসিয়া নামক স্থানে লড়াই হয়। পারস্যের সেনাপতি রুস্তম বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করলেও মুসলমানদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পরাজিত হন এবং রুস্তম নিহত হন। এই বিজয় পারস্য সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ড কাঁপিয়ে দেয় এবং মুসলমানরা পারস্যের রাজধানী মাদায়েন জয় করেন।

৬৪২ খ্রিস্টাব্দ, কাদেসিয়ার পরাজয়ের পর পারস্য সম্রাট ইয়াজদগিরদ তাঁর শেষ শক্তি দিয়ে লড়াই করার চেষ্টা করেন। নিহাওয়ান্দে মুসলিম বাহিনীর কাছে তারা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধকে মুসলমানরা ফাতহুল ফুতুহ বা বিজয়সমূহের বিজয় নামে অভিহিত করেন। এর মাধ্যমে পারস্যের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা চিরতরে ভেঙে পড়ে।

উমর (রা.) পারস্য বিজয়ের পর সেখানকার কৃষকদের অধিকার ফিরিয়ে দেন, অত্যাচারী সামন্তপ্রথা বিলুপ্ত করেন এবং আরবী মুদ্রার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনিক সুবিধা বজায় রাখেন। এর ফলে খুব দ্রুত বর্তমান ইরান ও পারস্যের মানুষ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে।

ওমর (রা.)-এর কৌশল ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞা :

খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রায় ২২ লক্ষ বর্গমাইল এলাকায় বিস্তৃত হয়েছিল। রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ছিল বিশ্বের ইতিহাসে এক বড় ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, যা ইসলামের প্রচার ও প্রসারকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিল।ওমর (রা.) কেবল মদিনায় বসে নির্দেশ দিতেন না, বরং যুদ্ধের প্রতিটি ধাপ তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি আদেশ দিয়েছিলেন যে, বিজিত অঞ্চলের কোনো মন্দির, গির্জা বা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা যাবে না। যুদ্ধবন্দীদের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে। এই নৈতিকতার কারণেই বিশাল রোমান ও পারস্য অঞ্চলের মানুষ মুসলমানদের মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তিনি সৈন্যদের জন্য আলাদা বেতন, রেশন এবং সেনানিবাস (যেমন: কুফা ও বসরা শহর) তৈরি করেছিলেন। তাঁর সুশৃঙ্খল গোয়েন্দা বিভাগের কারণে তিনি হাজার মাইল দূরে থেকেও জানতেন যুদ্ধের ময়দানে কী ঘটছে।

তিনিই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রকে একটি আধুনিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করান। বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য তিনি একে বিভিন্ন প্রদেশে ভাগ করেন এবং প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে ওয়ালি বা গভর্নর নিয়োগ করেন। এছাড়া তিনি মহানবী (সা.)-এর হিজরতকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি হিজরি ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি প্রথম আহদাস বা পুলিশ বাহিনী এবং একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে আলাদা করেন এবং দক্ষ কাজী বা বিচারক নিয়োগ দেন, যারা খলিফার প্রভাবমুক্ত হয়ে রায় দিতে পারতেন।

হযরত ওমর (রা.) রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মাল-কে জনগণের আমানত হিসেবে দেখতেন। তিনি প্রথম সরকারিভাবে আদমশুমারি করান এবং প্রতিটি নাগরিকের (মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে) জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেন। অসহায় বৃদ্ধ, বিধবা এবং এতিমদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তিনি অসংখ্য রাস্তা, সেতু, মসজিদ এবং মুসাফিরখানা নির্মাণ করেন। দুর্ভিক্ষ ও সংকটের সময় তিনি নিজে পিঠে আটার বস্তা বয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিতেন।

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর কাছে আমির-ফকির, আপন-পর কোনো ভেদাভেদ ছিল না। এমনকি অপরাধ করলে তিনি নিজের ছেলেকেও শাস্তি দিতে দ্বিধা করেননি। তাঁর শাসনামলে বাঘ ও ছাগল এক ঘাটে জল খেত—এই প্রবাদটি মানুষের মুখে মুখে ছিল। এত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও তাঁর কোনো রাজপ্রাসাদ বা দেহরক্ষী ছিল না। তিনি সাধারণ মানুষের মতো তালি দেওয়া পোশাক পরতেন এবং মাটিতে ঘুমাতেন।

শাহাদাত ও সময়কাল:তিনি ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট ১০ বছর ৬ মাস ৪ দিন খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলকে ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়। ১০ হিজরির ২৩ জিলহজ মাসে ফজরের নামাজ পড়ানোর সময় আবু লুলু ফিরোজ নামে এক পারস্যের দাস তাঁকে বিষাক্ত খঞ্জর দিয়ে আক্রমণ করে। সে ওমরের পেটে ও পিঠে ছয়টি আঘাত করে। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।এর তিন দিন পর ১লা মহরম তিনি শাহাদাত বরণ করেন এবং তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী হযরত আয়েশা (রা.)-এর অনুমতি নিয়ে তাঁকে মসজিদে নববীতে মহানবী (সা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.)-এর পাশেই দাফন করা হয়।

 

উসমান ইবনে আফফান (রা.)ইসলামের তৃতীয় খলিফা: (৬৪৪-৬৫৬)

হযরত ওমর (রা.)-এর শাহাদাতের পর ইসলামের তৃতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)। তাঁর সময়েই মুসলিম বাহিনী প্রথমবারের মতো সমুদ্র জয় করে এবং তিনটি মহাদেশে ইসলামের পতাকা ওড়াতে সক্ষম হয়। তাঁর শাসনকাল ছিল ইসলামের ইতিহাসের দীর্ঘতম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শাসনকাল ও উল্লেখযোগ্য অর্জনসমূহ : হযরত উসমান (রা.)-এর শাসনামলকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ৬ বছর ছিল চরম শান্তি ও বিজয়ের, আর শেষ ৬ বছর কিছু অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল।

তাঁর সময়ে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের একাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তিনি আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান, ককেশাস অঞ্চল এবং উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া ও তিউনিসিয়া জয় করেন।

খলিফা উমর (রা.)-এর সময়ে মিশর বিজয় সম্পন্ন হলেও, উসমান (রা.)-এর আমলে ইসলামি বাহিনী আরও পশ্চিমে অগ্রসর হয়। সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া এবং তিউনিসিয়া (তৎকালীন ইফ্রিকিয়া) জয় করেন। বিশেষ করে 'সুবেতলার যুদ্ধে' রোমান গভর্নর গ্রেগরিকে পরাজিত করার মাধ্যমে এই বিশাল অঞ্চল মুসলমানদের অধীনে আসে। উত্তর আফ্রিকার এই বিজয়গুলোই পরবর্তীতে উমাইয়া আমলে স্পেন (ইউরোপ) জয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, উসমান (রা.)-এর আমলেই কিছু মুসলিম সেনাদল ইউরোপের স্পেনের উপকূলে প্রথম পদার্পণ করেছিল।

মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের দিকে উমর (রা.)-এর সময়ে শুরু হওয়া পারস্য বিজয়ের কাজ উসমান (রা.)-এর আমলে পূর্ণতা পায়। তিনি সাম্রাজ্যের সীমানাকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যান। তাঁর নির্দেশে মুসলিম বাহিনী বর্তমান আফগানিস্তান, বলখ, হেরাত এবং কাবুল জয় করে। এরপর তারা উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে আমু দরিয়া পার হয়ে তুর্কিস্তানের তুর্কি রাজাদের পরাজিত করে। এর ফলে মার্ভ ও নিসহাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো ইসলামি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুসলমানরা বর্তমান আজারবাইজান, আর্মেনিয়া এবং ককেশাস অঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে অভিযান চালায়। এর ফলে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে শুরু করে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত ইসলামের ছায়া বিস্তৃত হয়।

নৌবাহিনী গঠন ও ভূমধ্যসাগর বিজয়:সিরিয়ার তৎকালীন গভর্নর আমীর মুয়াবিয়া (রা.) উপলব্ধি করেন যে, রোমানদের শক্তিশালী নৌ-আক্রমণ থেকে উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা করতে হলে মুসলমানদের নিজস্ব জাহাজ প্রয়োজন। খলিফা উসমান (রা.) দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর কঠোর শর্তসাপেক্ষে নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি দেন।তার আমলে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল ইসলামি নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা। এর আগে মুসলমানরা কেবল স্থলের যুদ্ধে অভ্যস্ত ছিল। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নৌবাহিনী গঠিত করেন তিনি। ৬৪৯ খ্রি. নবগঠিত এই নৌবাহিনী নিয়ে মুসলমানরা ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ সাইপ্রাস অভিযান চালায়। এটি ছিল মুসলমানদের প্রথম সফল সামুদ্রিক যুদ্ধ। এই বিজয়ের ফলে রোমানদের একচ্ছত্র নৌ-আধিপত্য খর্ব হয় এবং ভূমধ্যসাগরে মুসলমানদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো পুরো মুসলিম বিশ্বে কুরআনের একটি অভিন্ন পাঠ বা সংস্করণ নির্ধারণ করা। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের উচ্চারণের ভিন্নতা দূর করতে তিনি মূল পাণ্ডুলিপি থেকে কপি করে সব প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। এ কারণে তাঁকে জামেউল কুরআন বা কুরআন একত্রকারী বলা হয়।

তিনি অত্যন্ত ধনী ও দানশীল ছিলেন (এজন্য তাঁকে গণি বলা হতো)। তিনি নিজ উদ্যোগে অসংখ্য খাল খনন, মসজিদ নির্মাণ এবং জনগণের পানির কষ্ট দূর করতে কূপ খনন করেন। তাঁর সময়ে আরবে অর্থনৈতিক জোয়ার এসেছিল।

শেষদিকের পরিস্থিতি:

 কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও মুনাফিকদের (যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা) অপপ্রচার।তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা (যদিও তিনি যোগ্যদেরই নিয়োগ দিয়েছিলেন)।মদিনার বাইরে থেকে আসা বিদ্রোহীদের নানা দাবি ও বিশৃঙ্খলা।

আত্মীয়দের নিয়োগ ও এর পেছনের যুক্তি -

 হযরত উসমান (রা.) তাঁর আমলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিজের বংশের (বনু উমাইয়া) লোকদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। যেমন-সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে মুয়াবিয়া (রা.) এবং মিশরের গভর্নর হিসেবে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারাহ। এর পেছনে তাঁর কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল-যাদের তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন, তারা আগে থেকেই প্রশাসনিক কাজে দক্ষ ছিলেন। যেমন, মুয়াবিয়া (রা.) হযরত ওমর (রা.)-এর আমল থেকেই সিরিয়ার দায়িত্বে ছিলেন।তিনি মনে করেছিলেন আত্মীয়দের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনা করা সহজ হবে এবং তারা তাঁর প্রতি বেশি অনুগত থাকবে।হযরত উসমান (রা.) অত্যন্ত দয়ালু ও নরম হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর আত্মীয়রা যেন জনকল্যাণে কাজ করার সুযোগ পায়।তবে এই বিষয়শাসনামলের টিকেই বিরোধীরা স্বজনপ্রীতি হিসেবে প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে শুরু করে।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার চক্রান্ত :

বিদ্রোহের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক এক ব্যক্তির। সে ছিল একজন ইহুদি, যে ছদ্মবেশে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সে আরবের বিভিন্ন প্রদেশে (বিশেষ করে মিশর, কুফা ও বসরায়) ঘুরে ঘুরে খলিফার বিরুদ্ধে বিষোদগার ছড়াতে থাকে। সে সাধারণ মানুষকে বোঝাত যে, উসমান (রা.) খিলাফতের অযোগ্য এবং তিনি নবীজির সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন (নাউযুবিল্লাহ)। তার এই অপপ্রচার একদল অশিক্ষিত ও আবেগপ্রবণ মানুষকে খলিফার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন:

হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামল ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি গভর্নরদের ওপর কড়া নজর রাখতেন কিন্তু,হযরত উসমান (রা.) ছিলেন তুলনায় অনেক উদার ও দয়ালু। এই সুযোগে কিছু অসাধু লোক ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এছাড়া সাম্রাজ্য বড় হওয়ার ফলে নতুন বিজিত অঞ্চলের মানুষেরা মদিনার কেন্দ্রীয় শাসনের ওপর অসন্তুষ্ট হতে শুরু করে।

বিদ্রোহের চরম পর্যায় ও শাহাদাত:

বিদ্রোহীরা মিশর ও কুফা থেকে এসে মদিনা ঘেরাও করে। তারা দাবি করে যে, খলিফাকে পদত্যাগ করতে হবে। কিন্তু হযরত উসমান (রা.) বলেছিলেন,আল্লাহ আমাকে যে পোশাক (খিলাফত) পরিয়েছেন, আমি নিজ থেকে তা খুলব না।তিনি চাইলেই সাহাবীদের নিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি চাননি তাঁর কারণে মদিনার পবিত্র মাটিতে কোনো মুসলমানের রক্ত ঝরুক। তিনি এমনকি সাহাবীদের যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন।

শাহাদাত (মৃত্যু : হযরত উসমান (রা.)-এর মৃত্যু ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বিদ্রোহীরা তাঁর বাড়ি দীর্ঘ ৪০ দিন অবরুদ্ধ করে রাখে এবং পানি পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। ৩৫ হিজরির ১৮ জিলহজ,একদল বিদ্রোহী তাঁর বাড়ির দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে।তিনি তখন পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সেই অবস্থাতেই বিদ্রোহীরা তাঁকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে শহীদ করে।তলোয়ারের আঘাতে তাঁর পবিত্র রক্ত কুরআনের সেই আয়াতের ওপর পড়েছিল— "ফাসাইয়াকফিকাহুমুল্লাহ" (তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট)।তাঁকে মদিনার জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮২ বছর।

হযরত উসমান (রা.) মোট ১২ বছর (৬৪৪ - ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ) খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে তাঁর শাসনকালই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ।

 

আলী (রা.) ইসলামের চতুর্থ খলিফা: (৬৫৬-৬৬১)

উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মদিনায় এক চরম অরাজকতা তৈরি হয়। বিদ্রোহীরা শহর দখল করে নেয়। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে সাহাবীদের অনুরোধে হযরত আলী (রা.) চতুর্থ খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।ইসলামের ইতিহাসে হযরত আলী (রা.)-এর শাসনকাল (৬৫৬-৬৬১ খ্রিস্টাব্দ) ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং ঘটনাবহুল সময়। হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর এক চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দায়িত্ব গ্রহণ ও তৎকালীন ভয়াবহ পরিস্থিতি :

হযরত উসমান (রা.)-এর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর মদিনায় কোনো কার্যকর সরকার ছিল না। বিদ্রোহীরা শহর দখল করে রেখেছিল। এমন এক অরাজক পরিস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরাম হযরত আলী (রা.)-কে খলিফা হওয়ার অনুরোধ করেন। শুরুতে তিনি রাজি না হলেও উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচার করা। কিন্তু হত্যাকারীরা বিদ্রোহী বাহিনীর সাথে মিশে থাকায় এবং তাদের শক্তি অনেক বেশি হওয়ায় আলী (রা.) তৎক্ষণাৎ বিচার শুরু করতে পারেননি। তিনি চাইলেন আগে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু অনেক সাহাবী চাইলেন আগে বিচার। এই মতভেদ থেকেই ফিতনার সূত্রপাত হয়।

প্রশাসনিক পরিবর্তন ও গভর্নরদের অপসারণ :

হযরত আলী (রা.) খলিফা হওয়ার পরপরই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আনার জন্য হযরত উসমান (রা.)-এর সময়ে নিযুক্ত অনেক গভর্নরকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শাসনব্যবস্থায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করা। কিন্তু সিরিয়ার শক্তিশালী গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এই আদেশ মানতে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন যে, যতক্ষণ উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচার না হবে, ততক্ষণ তিনি আলীর আনুগত্য করবেন না। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে একটি প্রদেশের বিরোধ চরমে পৌঁছায়।

উটের যুদ্ধ :এটি ছিল মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত প্রথম বড় যুদ্ধ। হযরত আয়েশা (রা.), তালহা (রা.) এবং জুবায়ের (রা.) উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে মক্কা থেকে বসরার দিকে রওনা হন। হযরত আলী (রা.) পরিস্থিতি শান্ত করতে তাদের মুখোমুখি হন। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার পথে ছিল, কিন্তু গভীর রাতে একদল তৃতীয় পক্ষ (যারা উসমানের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল) দুই বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে দেয়। ফলে ভুল বোঝাবুঝি থেকে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা.) একটি উটের পিঠে বসে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করছিলেন বলে একে উটের যুদ্ধ বলা হয়। যুদ্ধে আলী (রা.) বিজয়ী হন এবং তিনি অত্যন্ত সম্মানের সাথে হযরত আয়েশা (রা.)-কে মদিনায় পাঠিয়ে দেন।

সিফফিনের যুদ্ধ ও সালিশি ব্যবস্থা :হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে বিরোধ মেটাতে আলী (রা.) এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ফোরাত নদীর তীরে সিফফিন নামক স্থানে পৌঁছান। সেখানে দুই বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চলে। যখন আলী (রা.)-এর বাহিনী জয়ের খুব কাছে, তখন মুয়াবিয়া (রা.)-এর সৈন্যরা বর্শার মাথায় কুরআন বেঁধে শান্তি ও সালিশির আহ্বান জানায়। আলী (রা.) যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সালিশিতে রাজি হন। কিন্তু এই সালিশি প্রক্রিয়ার ফলাফল কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিভেদ তৈরি করে।

খারেজী সম্প্রদায়ের উত্থান ও গৃহযুদ্ধ :সিফফিনের যুদ্ধে সালিশি মেনে নেওয়ায় আলী (রা.)-এর বাহিনীর একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে দলত্যাগ করে। এদের বলা হয় খারেজী (দলত্যাগী)। তাদের দাবি ছিল, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ফয়সালা মানা যাবে না। তারা আলী (রা.) এবং মুয়াবিয়া (রা.)—উভয়কেই কাফের ঘোষণা করে (নাউযুবিল্লাহ) এবং সাধারণ মুসলমানদের হত্যা করতে শুরু করে। আলী (রা.) বাধ্য হয়ে তাদের বিরুদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধ করেন এবং তাদের দমন করেন। তবে কিছু খারেজী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, যারা পরে তাঁর ওপর হামলার পরিকল্পনা করে।

হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাত:৪০ হিজরির ১৭ বা ১৯ রমজান ৬৬১ খ্রিস্টাব্দ, কুফার মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ার সময় খারেজী ঘাতক আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম বিষাক্ত তলোয়ার দিয়ে হযরত আলী (রা.)-এর মাথায় আঘাত করে। এই ঘটনার তিন দিন পর ২১শে রমজান ইসলামের এই শ্রেষ্ঠ বীর এবং জ্ঞানের দরজা শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৬৩ বছর। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীন-এর গৌরবময় ৩০ বছরের শাসনের সমাপ্তি ঘটে।হযরত আলী (রা.)-এর ৫ বছরের শাসনকাল ছিল মূলত অভ্যন্তরীণ ফিতনা দমনের লড়াই। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ইসলামের ন্যায়বিচার এবং সাহসিকতার যে উদাহরণ রেখে গেছেন, তা চিরস্মরণীয়।

 

হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.): ( ৬৬১ খ্রিস্টাব্দ)

হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর ইসলামের ইতিহাসে এক অত্যন্ত সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়। তাঁর বড় ছেলে হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.) খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকাল সংক্ষিপ্ত হলেও মুসলিম উম্মাহকে এক বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে বাঁচানোর জন্য তাঁর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়।

খিলাফতে অভিষেক ও সময়কাল:হযরত আলী (রা.)-এর মৃত্যুর পর ৪০ হিজরিতে কুফাবাসী এবং তাঁর অনুসারীরা হযরত হাসান (রা.)-এর হাতে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসে পঞ্চম খলিফা হিসেবে গণ্য হন (যদিও অনেক ঐতিহাসিক তাঁকে খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্তর্ভুক্ত করেন)। তিনি মাত্র ৬ মাস খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন। এই অল্প সময়েই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে বিভেদ তৈরি হয়েছে, তা অস্ত্রের মাধ্যমে সমাধান করলে কেবল মুসলিমদের রক্তই ঝরবে।

হযরত হাসান (রা.) দায়িত্ব নেওয়ার পর সিরিয়ার গভর্নর আমীর মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর আনুগত্য করতে অস্বীকার করেন। মুয়াবিয়া (রা.) এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ইরাকের দিকে অগ্রসর হন। হাসান (রা.)-ও পাল্টা প্রতিরক্ষা হিসেবে একটি বাহিনী পাঠান। উভয় বাহিনী সামনা-সামনি হয় এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর নাতি হযরত হাসান (রা.) ছিলেন শান্তিকামী। তিনি জানতেন, এই যুদ্ধ শুরু হলে হাজার হাজার সাহাবী ও মুসলিম প্রাণ হারাবেন।

হযরত হাসান (রা.) ব্যক্তিগত ক্ষমতা বা পদের চেয়ে মুসলিমদের ঐক্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। ৪১ হিজরিতে (৬৬১ খ্রিস্টাব্দ) উভয় পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল-

1.       হযরত হাসান (রা.) জনকল্যাণ ও শান্তির স্বার্থে খিলাফতের দায়িত্ব হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে হস্তান্তর করবেন।

2.       মুয়াবিয়া (রা.) অবশ্যই পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।

3.       মুয়াবিয়া (রা.) নিজের ইচ্ছামতো কাউকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে পারবেন না। তাঁর মৃত্যুর পর খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহর (শুরা কমিটির) ওপর ন্যাস্ত থাকবে।

4.       হযরত আলী (রা.)-এর অনুসারী এবং সাধারণ মানুষের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। কারও ওপর প্রতিশোধ নেওয়া যাবে না।

5.       ফার বাইতুল মাল থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ এবং নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের রাজস্ব হযরত হাসান (রা.) ও তাঁর পরিবারের জন্য বরাদ্দ থাকবে।

হযরত হাসান (রা.) যেদিন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, সেই বছরটিকে ইসলামের ইতিহাসে আমুল জামা'আহ বা ঐক্যের বছর বলা হয়। কারণ, তাঁর এই মহান ত্যাগের ফলে পাঁচ বছরের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং পুরো মুসলিম বিশ্ব পুনরায় একজন নেতার অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়। এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিফলন। নবীজি (সা.) হাসানকে কোলে নিয়ে একবার বলেছিলেন:-

আমার এই সন্তান একজন নেতা (সাইয়্যিদ), আল্লাহ তার মাধ্যমে মুসলিমদের দুটি বড় দলের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন।

ক্ষমতা হস্তান্তরের পর হযরত হাসান (রা.) সপরিবারে মদিনায় চলে যান এবং সেখানে ইবাদত ও দ্বীনি কাজে আত্মনিয়োগ করেন। অন্যদিকে মুয়াবিয়া (রা.) দামেস্ক থেকে পুরো মুসলিম বিশ্ব শাসন করতে থাকেন।

হযরত হাসান (রা.)-এর শাহাদাত:হযরত হাসান (রা.)-এর শাহাদাত ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম একটি ট্র্যাজিক বা বেদনাদায়ক ঘটনা। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তিনি মদিনায় অত্যন্ত শান্তিতে এবং ইবাদত-বন্দেগিতে জীবন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত হাসান (রা.)-কে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পর্দার আড়ালে গভীর ষড়যন্ত্র চলছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর ছেলে ইয়াজিদকে মনোনীত করার পথে হাসান (রা.) ছিলেন একটি বড় বাধা। কারণ, হাসান (রা.)-এর সাথে মুয়াবিয়া (রা.)-এর চুক্তিতে ছিল যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর পর খিলাফত হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হাসান (রা.)-কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। হযরত হাসান (রা.)-এর স্ত্রী জাদা বিনতে আশআথ -কে এই ষড়যন্ত্রে প্ররোচিত করা হয়েছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, জাদাকে প্রচুর অর্থ এবং মুয়াবিয়া (রা.)-এর ছেলে ইয়াজিদের সাথে বিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এই জঘন্য কাজে রাজি করানো হয়। জাদা তাঁর নিজের স্বামীর খাবারে বা পানীয়তে মারাত্মক বিষ মিশিয়ে দেন।বিষপ্রয়োগের বিষয়টি একবারেই ঘটেনি; এর আগেও কয়েকবার তাঁকে বিষ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষবারের বিষটি ছিল অত্যন্ত তীব্র। বর্ণিত আছে যে, এই বিষের প্রভাবে তাঁর কলিজার অংশ বিশেষ টুকরো টুকরো হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে। দীর্ঘ দিন তিনি এই অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেন এবং অবশেষে ৫০ হিজরির ৫ই রবিউল আউয়াল (৬৭০ খ্রিস্টাব্দ) তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

যখন হাসান (রা.) মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখন তাঁর ছোট ভাই হযরত হুসাইন (রা.) তাঁর কাছে এসে জানতে চেয়েছিলেন— ভাই, আপনাকে কে বিষ দিয়েছে তার নাম বলুন, আমি তার বদলা নেব।উত্তরে ধৈর্যশীল এবং শান্তিকামী হযরত হাসান (রা.) বলেছিলেন-যদি আমার ধারণা সঠিক হয় (অর্থাৎ যাকে আমি সন্দেহ করছি), তবে আল্লাহর কাছে বিচার হবে সবচেয়ে কঠিন। আর যদি আমার ধারণা ভুল হয়, তবে আমি চাই না আমার কারণে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি পাক। তিনি তাঁর ভাইকে প্রতিশোধ নিতে নিষেধ করেছিলেন যাতে মুসলিমদের মধ্যে আবার রক্তপাত না হয়।

দাফন ও শেষ ইচ্ছা : হযরত হাসান (রা.)-এর ইচ্ছা ছিল তাঁকে তাঁর নানাজান মহানবী (সা.)-এর কবরের পাশে দাফন করা হোক। কিন্তু দাফনের সময় তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এবং কিছু গোত্রের বিরোধিতার ফলে সেখানে দাফন করা সম্ভব হয়নি। রক্তক্ষয় এড়াতে হযরত হুসাইন (রা.) তাঁর ভাইয়ের মরদেহ মদিনার জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে নিয়ে যান এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণতি:জাদা বিনতে আশআথ কে যে প্রলোভন দেখানো হয়েছিল, তা সফল হয়নি। পরবর্তীতে ইয়াজিদ তাকে বিয়ে করেনি এবং সে ঘৃণা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিল। মহানবী (সা.)-এর প্রিয় নাতির হত্যাকারীরা ইতিহাসে চিরদিনের জন্য ধিকৃত হয়ে আছে।

 

হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনকাল (৬৬১-৬৮০ খ্রিস্টাব্দ):

হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনকাল (৬৬১-৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। হযরত হাসান (রা.)-এর সাথে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ২০ বছর শাসন করেন। তাঁর শাসনকালকে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর হাত ধরেই ইসলামের ইতিহাসে উমাইয়া রাজবংশের সূচনা হয়। তিনি খিলাফতের প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী মদিনা থেকে সরিয়ে সিরিয়ার দামেস্কে স্থানান্তর করেন। দামেস্ক ছিল তৎকালীন সময়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রোমানদের কাছ থেকে বিজিত একটি উন্নত শহর। এই পরিবর্তনের ফলে আরব উপদ্বীপের বাইরে বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করা তাঁর জন্য সহজ হয়।

হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে বলা হয় মুসলিম নৌবাহিনীর জনক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে হলে সমুদ্রে শক্তিশালী হতে হবে। তাঁর শাসনামলে প্রায় ১,৭০০ যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা হয়। এই নৌবাহিনীর সাহায্যেই মুসলমানরা সাইপ্রাস, রোডস এবং ক্রিট দ্বীপ জয় করে। এমনকি তাঁর সময়েই প্রথমবার সমুদ্রপথে রোমানদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) ঘেরাও করা হয়েছিল।

দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য তিনি একটি সুশৃঙ্খল ডাক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। ঘোড়ার মাধ্যমে এক শহর থেকে অন্য শহরে দ্রুত চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।জালিয়াতি রোধ করার জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্র বা নির্দেশে বিশেষ সীল বা মোহার ব্যবহারের নিয়ম চালু করেন।তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের জন্য আলাদা আলাদা দপ্তর (যেমন অর্থ দপ্তর, রাজস্ব দপ্তর) গঠন করেন, যা রাষ্ট্র পরিচালনার কাজকে সহজ করে দেয়।

সীমান্ত রক্ষা ও সাম্রাজ্য বিস্তার:হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর ২০ বছরের শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার গভীরে পৌঁছে যায়। পশ্চিমে তাঁর বাহিনী উত্তর আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত এবং পূর্বে বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, মিশর, ইরাক, ইরান, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং উত্তর আফ্রিকার কিছু অংশ তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।রোমানদের সাথে লড়াইয়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং সীমান্তে নিয়মিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে মুসলিম ভূখণ্ডকে নিরাপদ রাখতেন।:

হযরত মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা হিলম (ধৈর্য ও সহনশীলতা)-এর জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি বলতেন:

"যেখানে আমার চাবুক কাজ করে, সেখানে আমি তলোয়ার ব্যবহার করি না। আর যেখানে আমার কথা দিয়ে কাজ হয়, সেখানে আমি চাবুক ব্যবহার করি না।"

তিনি বিরোধীদের সাথেও আলোচনার মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করতেন। দীর্ঘ পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধের পর তাঁর শাসনামলে সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরে এসেছিল।

উত্তরাধিকারী নির্বাচন ও চুক্তি লঙ্গন:মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনের শেষ পর্যায়ে তিনি একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন, চিন্তা করেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যদি কোনো নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারী না থাকে, তবে মুসলিম সাম্রাজ্য আবার গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে। এই আশঙ্কায় তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নেন। যা ইসলামের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে।

হযরত হাসান (রা.)-এর সাথে চুক্তির একটি প্রধান শর্ত ছিল যে, মুয়াবিয়া (রা.) নিজের ইচ্ছামতো কাউকে উত্তরাধিকারী করবেন না; বরং খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহর (শুরা কমিটির) ওপর থাকবে। ইয়াজিদকে মনোনীত করার মাধ্যমে এই চুক্তিটি সরাসরি লঙ্ঘিত হয়। তিনি তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলে ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করেনএবং মুয়াবিয়া (রা.) বেঁচে থাকতেই বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের কাছ থেকে ইয়াজিদের জন্য বায়াত বা আনুগত্যের শপথ আদায় করতে শুরু করেন। এর আগে খলিফা নির্বাচনের জন্য সাহাবীদের পরামর্শ বা জনগণের ভোট নেওয়া হতো, কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.)-এর এই সিদ্ধান্তের ফলে খিলাফত একটি রাজতন্ত্রের রূপ নেয়। অনেক বিশিষ্ট সাহাবী, বিশেষ করে  হযরত ইমাম হোসাইন (রা.),আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) , আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।

তাঁদের যুক্তি ছিল, খিলাফত কোনো রাজতন্ত্র বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি নয়।ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নেওয়া মানে ইসলামের গণতান্ত্রিক ও আদর্শিক খিলাফত ব্যবস্থাকে চিরতরে ধ্বংস করে একটি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। মূল বিরোধের কারণ ছিলো ,ইয়াজিদের ব্যক্তিগত চরিত্র এবং খলিফা হওয়ার অযোগ্যতা নিয়েও তৎকালীন মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। তারা মনে করতেন, ইয়াজিদ ইসলামের আদর্শ রক্ষা করতে সক্ষম নন। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং মদিনা থেকে মক্কার অভিমুখে রওনা হন।

মৃত্যুর সময়কাল :হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যু ছিল উমাইয়া খিলাফতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তিনি দীর্ঘ ২০ বছর খলিফা হিসেবে এবং তার আগে প্রায় ২০ বছর সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৬০ হিজরির রজব মাসে (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) সিরিয়ার দামেস্কে বার্ধক্য ও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৮ থেকে ৮০ বছর।হযরত মুয়াবিয়া (রা.) মহানবী (সা.)-এর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর কাছে নবীজি (সা.)-এর দেওয়া কিছু চুল, নখ এবং একটি চাদর সংরক্ষিত ছিল। তিনি অসিয়ত করেছিলেন যে:আমার মৃত্যুর পর যখন আমাকে কাফন পরানো হবে, তখন নবীজি (সা.)-এর সেই পবিত্র নখ ও চুলগুলো যেন আমার চোখ ও মুখের ওপর রাখা হয় এবং তাঁর দেওয়া চাদরটি যেন আমার গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়।তিনি আশা করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই স্মৃতিগুলোর বরকতে আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করবেন। তাঁর মৃত্যুর পর দামেস্কের বাবুস সাগির নামক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

 

ইয়াজিদের শাসনকাল (৬৮০–৬৮৩ খ্রিস্টাব্দ):

ইয়াজিদের শাসনকাল  ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার এবং বিতর্কিত একটি সময়।হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পরপরই ইয়াজিদ ক্ষমতা গ্রহণ করে। মুয়াবিয়া (রা.) মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদকে ডেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ ও অসিয়ত করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, ইয়াজিদের শাসনামলে কিছু বিশিষ্ট সাহাবী বিরোধিতা করতে পারেন। তিনি ইয়াজিদকে বলেছিলেন:

হযরত হুসাইন (রা.) সম্পর্কে:রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাতি হুসাইন ইবনে আলীর প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখবে। যদি সে তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং তুমি বিজয়ী হও, তবে তাকে ক্ষমা করে দিও। কারণ তার সাথে মহানবী (সা.)-এর রক্ত মিশে আছে।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) সম্পর্কে: সে হবে তোমার সবচেয়ে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী। সে শিকারি বাঘের মতো সুযোগ খুঁজবে। যদি সে তোমার নাগালের মধ্যে আসে, তবে তার সাথে কঠোর হয়ো।

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল ও জবরদস্তি : ইসলামের পূর্ববর্তী চার খলিফা নির্বাচিত হয়েছিলেন জনগণের সম্মতিতে। কিন্তু ইয়াজিদ ছিল প্রথম শাসক, যে বংশগতভাবে বা রাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা দখল করে। তার পিতা হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর সে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করে এবং জোরপূর্বক মানুষের কাছ থেকে আনুগত্য (বাইয়াত) আদায় করতে শুরু করে। সে জানত যে, হযরত হুসাইন (রা.) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে সমর্থন করবেন না। মুয়াবিয়া (রা.) ইয়াজিদকে হযরত হুসাইন (রা.)-এর প্রতি নমনীয় থাকার উপদেশ দিলেও ইয়াজিদ তা পালন করেনি। ইয়াজিদ ক্ষমতার দম্ভে মত্ত হয়ে মদিনার গভর্নরকে নির্দেশ দেয় যে—হয় হুসাইন (রা.) তাঁর আনুগত্য করবে, না হয় তাঁকে হত্যা করা হবে।এখান থেকেই শুরু হয় ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে শোকাবহ অধ্যায় কারবালার মহাবিপ্লব।

কারবালার পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড: ইয়াজিদের শাসনের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় হলো কারবালার যুদ্ধ। মহানবী (সা.)-এর নাতি হযরত হুসাইন (রা.) যখন ইয়াজিদের মতো একজন মদ্যপ, পাপাচারী এবং জালেম শাসকের আনুগত্য করতে অস্বীকার করেন, তখন ইয়াজিদ তাঁর বিরুদ্ধে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী পাঠায়। ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদের বাহিনী নবীজির পরিবারকে অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং যুদ্ধের তিন দিন আগে থেকেই ইয়াজিদের বাহিনী ফোরাত নদীর তীরে পাহারাদার বসিয়ে দেয়, যাতে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কাফেলা এক ফোঁটা পানিও না পায়। নারী ও শিশুদের বুকফাটা হাহাকার সত্ত্বেও ইয়াজিদ বাহিনী পানি দেয়নি।সময়টা তখন ১০ই মহরম, ৬১ হিজরি (১০ অক্টোবর, ৬৮০ খ্রিস্টাব্দ)। ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের নিয়ে (যাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭২ জন) কুফার দিকে যাচ্ছিলেন। কারবালা নামক স্থানে ইয়াজিদের ৪০০০ থেকে ৫০০০ সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী তাঁদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। ইয়াজিদের বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল উমর ইবনে সাদ এবং শিমার ইবনে জিলজুশান।

১০ই মহরম সকালে যুদ্ধ শুরু হয়। একপাশে ছিল ইয়াজিদের সুসজ্জিত বিশাল সেনাবাহিনী, আর অন্যপাশে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত ৭২ জন সঙ্গী। একে একে ইমামের ভাই, ভাতিজা, পুত্র এবং বিশ্বস্ত সঙ্গীরা বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। এমনকি তাঁর ৬ মাস বয়সী শিশুপুত্র আলী আসগরও ইয়াজিদ বাহিনীর তীরের আঘাতে শহীদ হন।

সবশেষে ইমাম হোসাইন (রা.) একাই লড়াই চালিয়ে যান। যোহরের নামাজের সময় তিনি যখন সিজদায় ছিলেন, তখন শিমার ইবনে জিলজুশানের নির্দেশে তাঁর ওপর চূড়ান্ত হামলা চালানো হয় এবং তাঁকে অত্যন্ত নির্মমভাবে শিরশ্ছেদ করে শহীদ করা হয়।

কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পক্ষের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে প্রায় সবাই শহীদ হয়েছিলেন। তবে কিছু নারী, শিশু এবং একজন অসুস্থ পুরুষ বেঁচে ছিলেন।ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বড় ছেলে হযরত জয়নুল আবেদীন (রহ.)। তিনি সেই সময় অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন এবং তাঁবুতে শুয়ে ছিলেন বলে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।

যুদ্ধের পর ইমামের পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের শিকলবদ্ধ করে অত্যন্ত অবমাননাকর অবস্থায় প্রথমে কুফায় এবং পরে দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়।

ইয়াজিদের দরবারে যখন শহীদদের মস্তকগুলো আনা হলো এবং ইয়াজিদ বিজয় উল্লাস করছিল, তখন হযরত জয়নব (রা.) অত্যন্ত সাহসের সাথে দাঁড়িয়ে এক তেজস্বী ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি ইয়াজিদের নিষ্ঠুরতা এবং অধর্মের মুখোশ খুলে দেন। তিনি ভরা মজলিসে ইয়াজিদকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,

"তুমি হয়তো আমাদের বন্দী করে নিজেকে শক্তিশালী ভাবছ, কিন্তু জেনে রেখো, সত্যের জয় হবেই এবং ইতিহাসে তুমি চিরকাল ঘৃণিত হয়ে থাকবে।"

অসুস্থ জয়নুল আবেদীনকেও ইয়াজিদের সামনে আনা হয়েছিল। তিনিও অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে ইয়াজিদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন এবং নিজের বংশের (আহলে বায়ত) পরিচয় তুলে ধরেন, যা শুনে দরবারের অনেকে অনুতপ্ত হয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন।

জয়নব (রা.)-এর ভাষণ এবং বন্দীদের দুর্দশা দেখে দামেস্কের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়। এমনকি ইয়াজিদের নিজের পরিবারের সদস্যরাও এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে ভর্ৎসনা করতে শুরু করে।পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং জনরোষের ভয়ে ইয়াজিদ সুর নরম করতে বাধ্য হয়। সে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর হত্যার দায় নিজের ওপর না নিয়ে কুফার গভর্নর ইবনে জিয়াদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত ইয়াজিদ আহলে বায়তের সদস্যদের মুক্তি দেয় এবং সসম্মানে মদিনায় পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

কারবালায় ইমাম হোসাইন (রা.) সশরীরে পরাজিত হলেও এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো মুসলিম বিশ্বে শোক ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। মক্কা ও মদিনায় বিদ্রোহ শুরু হয়।কারবালার এই রক্তারক্তি ইয়াজিদের শাসনকে কলঙ্কিত করে।ইয়াজিদের দরবারে হযরত জয়নব (রা.)-এর সেই ভাষণ ইয়াজিদের নৈতিক পরাজয় নিশ্চিত করেছিল। এই ঘটনার পরই পুরো মুসলিম বিশ্বে উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। এই যুদ্ধই উমাইয়া বংশের পতনের বীজ বপন করে দেয়।

হাররার যুদ্ধ :এই যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী এবং বেদনাদায়ক একটি ঘটনা। ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে (৬৩ হিজরি) মদিনার উপকণ্ঠে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার বাহিনী এবং মদিনাবাসীদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কারবালার শোকাবহ ঘটনার পর মদিনার মানুষের মধ্যে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। মদিনার একটি প্রতিনিধি দল দামেস্কে ইয়াজিদের দরবার সফর করে ফিরে এসে জানায় যে, ইয়াজিদের জীবনযাপন এবং শাসনপদ্ধতি ইসলামি আদর্শের পরিপন্থী। এরপর-

*মদিনাবাসীরা ইয়াজিদের আনুগত্য (বায়াত) অস্বীকার করে।

*তারা ইয়াজিদের নিযুক্ত গভর্নরকে মদিনা থেকে বের করে দেয়।

*আবদুল্লাহ ইবনে হানজালা (রা.)-এর নেতৃত্বে মদিনার আনসার ও মুহাজিররা একত্রিত হন।

মদিনার বিদ্রোহ দমনের জন্য ইয়াজিদ মুসলিম ইবনে উকবা নামক এক নিষ্ঠুর সেনাপতির নেতৃত্বে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী পাঠায়। ইয়াজিদ নির্দেশ দিয়েছিল, মদিনাবাসীকে তিন দিন সময় দিতে; যদি তারা আনুগত্য না করে, তবে যেন যুদ্ধ করা হয়।

মদিনার পূর্ব দিকে অবস্থিত লাভা-গঠিত পাথুরে এলাকাকে বলা হয় হাররা। মদিনাবাসীরা শহর রক্ষার জন্য খন্দক বা গর্ত খনন করেছিলেন। কিন্তু ইয়াজিদ বাহিনী এক বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় শহরের অন্য দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।ইয়াজিদের বাহিনী ছিল সুশিক্ষিত এবং সংখ্যায় অনেক বেশি। ফলে অসম যুদ্ধে মদিনাবাসীরা পরাজিত হন। যুদ্ধের পর যা ঘটেছিল তা ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায়-

1.       ইয়াজিদ তার বাহিনীকে অনুমতি দিয়েছিল যে, জয়ের পর তিন দিন মদিনা শহর তাদের জন্য বৈধ (হালাল)। এই সময়ে মদিনায় ব্যাপক লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ এবং অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়।

2.       এই যুদ্ধে কয়েকশ সাহাবী এবং হাজারো তাবেয়ী শহীদ হন। আবদুল্লাহ ইবনে হানজালা (রা.) সহ মদিনার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ প্রাণ হারান।

3.       বলা হয়, সেই তিন দিন আতঙ্কে মসজিদে নববীতে আজান ও জামাত পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেবল পাগল ও অসহায়রা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল।

কারবালার পর হযরত জয়নুল আবেদীন (রহ.) রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন এবং এই বিদ্রোহে অংশ নেননি। তাই ইয়াজিদের বাহিনী তাঁর এবং তাঁর পরিবারের কোনো ক্ষতি করেনি। এমনকি তিনি অনেক অসহায় পরিবারকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

হাররার এই ঘটনা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে মুসলিম উম্মাহর ঘৃণা আরও বাড়িয়ে দেয়। এটি উমাইয়া শাসনের নৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি নড়বড়ে করে দেয়।

মদিনা তছনছ করার পর মুসলিম ইবনে উকবা মক্কার দিকে রওনা হয় আবদুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়ের (রা.)-কে দমন করতে। কিন্তু পথিমধ্যেই ওই সেনাপতির মৃত্যু হয়।

মদিনার পতনের পর, ইয়াজিদের বিরোধিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় মক্কা। সেখানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়ের (রা.) নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেছিলেন। মদিনা জয় করে আসা সেনাপতি মুসলিম ইবনে উকবা পথিমধ্যে মারা গেলে, ইয়াজিদের নির্দেশে হুসাইন ইবনে নুমায়র বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং মক্কা ঘেরাও করেন। এই অবরোধ প্রায় ৬৪ দিন স্থায়ী হয়েছিল।

ইয়াজিদের সৈন্যরা মক্কার চারপাশের পাহাড়ে অবস্থান নেয় এবং তারা মক্কা শহর লক্ষ্য করে মানজানিক (এক ধরণের বড় পাথর ছোড়ার যন্ত্র বা Catapult) ব্যবহার করে অনবরত পাথর ও অগ্নিপিণ্ড নিক্ষেপ করতে থাকে। অবরোধ যখন চরম পর্যায়ে এবং ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর বাহিনী প্রায় কোণঠাসা, ঠিক তখনই মক্কায় একটি খবর এসে পৌঁছায় যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেটি ছিল ইয়াজিদের মৃত্যু সংবাদ। সিরিয়া থেকে আসা এই খবর শুনে সেনাপতি হুসাইন ইবনে নুমায়র বুঝতে পারেন যে, এখন আর যুদ্ধের কোনো বৈধ ভিত্তি নেই। কারণ যার আদেশে তারা লড়াই করছিল, সেই ইয়াজিদই আর বেঁচে নেই। তিনি অবরোধ তুলে নিয়ে সিরিয়ায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এই অবরোধের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অংশ ছিল পবিত্র কাবা শরীফের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। মানজানিক থেকে ছোড়া অগ্নিপিণ্ডের আঘাতে কাবা শরীফের গিলাফে আগুন ধরে যায় এবং তা পুড়ে যায়। কাবার পবিত্র কাঠামো বা দেয়াল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এমনকি কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত জান্নাতী পাথর হাজরে আসওয়াদ তাপে ফেটে তিন টুকরো হয়ে গিয়েছিল।মক্কা অবরোধ ছিল ক্ষমতার জন্য ইসলামের পবিত্রতম স্থানের ওপর আঘাতের একটি কলঙ্কিত উদাহরণ। ইয়াজিদের আকস্মিক মৃত্যু না হলে মক্কার ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।

ইয়াজিদের আকস্মিক মৃত্যু :ইয়াজিদের  আকস্মিক মৃত্যু যেন রহস্যময়। তার মৃত্যুর সঠিক কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন তিনি শিকারে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান, আবার কেউ বলেন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।ইয়াজিদের রাজনৈতিক পতনের চেয়েও বড় ছিল তার নৈতিক পতন। কারবালা, মদিনার হাররা যুদ্ধ এবং মক্কা অবরোধের কারণে তিনি মুসলিম ইতিহাসে একজন ঘৃণিত শাসক হিসেবে চিহ্নিত হন। আজও কারবালার কথা উঠলে ইয়াজিদের নাম অত্যন্ত অসম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়।

 

দ্বিতীয় মুয়াবিয়া : (৬৮৩ খ্রি.৩-৪ মাস)ইয়াজিদের মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় মুয়াবিয়া দামেস্কে ক্ষমতা লাভ করেন। তবে তিনি তার পিতার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি মাত্র তিন চার মাস ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ও নরম মনের মানুষ ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, তার পিতা ও দাদা যে পদ্ধতিতে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন তা সঠিক ছিল না এবং তিনি এই রক্তপাতের উত্তরাধিকার বহন করতে চান না। এরপর তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগ করেন এবং এর কিছুদিন পরই রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

খিলাফতের বিভক্তি : (৬৮৩-৬৮৫ খ্রি.)দ্বিতীয় মুয়াবিয়ার পদত্যাগের পর মুসলিম বিশ্ব কার্যত দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়-

1.মক্কায় আবদুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়ের (রা.): ইয়াজিদের মৃত্যুর পর পুরো আরব বিশ্ব, মিশর এবং ইরাকের মানুষ তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নেয়। ইতিহাসে তাকে অনেক সময় এই সময়ের বৈধ খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়।

2.সিরিয়ায় উমাইয়াদের নতুন শাখা দ্বিতীয় মুয়াবিয়ার কোনো সন্তান বা ভাই না থাকায় উমাইয়াদের সুফিয়ানি শাখার পতন ঘটে। তখন উমাইয়াদের অন্য একটি বয়স্ক শাখা থেকে মারওয়ান ইবনে হাকামকে খলিফা নির্বাচিত করা হয়। এর মাধ্যমেই উমাইয়া খিলাফতের মারওয়ানি শাখার সূচনা হয়।

আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান : (৬৮৫–৭০৫ খ্রি.)

মারওয়ান ইবনে হাকাম মাত্র এক বছরের মতো বেঁচে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান ক্ষমতায় বসেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক।আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানকে উমাইয়া খিলাফতের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ইয়াজিদের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য যখন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে সব বিদ্রোহ দমন করে এক শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন। আবদুল মালেকের শাসনের শুরুর দিকে মুসলিম সাম্রাজ্য একাধিক ভাগে বিভক্ত ছিল। মক্কায় আবদুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়ের (রা.)-এর শাসন চলছিল এবং ইরাকে মুখতার আল-সাকাফির প্রভাব ছিল। আবদুল মালেক তাঁর দক্ষ সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে ব্যবহার করে অত্যন্ত কঠোরভাবে এই বিদ্রোহগুলো দমন করেন। ৬৯২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি পুরো মুসলিম জাহানকে পুনরায় দামেস্কের একক শাসনের অধীনে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এই এককেন্দ্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার কারণেই তাঁকে উমাইয়াদের প্রকৃত রক্ষক বলা হয়।

প্রথম ইসলামি মুদ্রা প্রবর্তন:আবদুল মালেকের সবচেয়ে বড় সংস্কার ছিল নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা। তাঁর আগে মুসলিম সাম্রাজ্যে রোমান (বাইজেন্টাইন) এবং পারস্যের (সাসানীয়) মুদ্রা প্রচলিত ছিল। তিনি ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) এবং দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) চালু করেন। এই মুদ্রাগুলোতে কোনো ছবি বা প্রতীকের বদলে পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং ইসলামি বাণী খোদাই করা হয়েছিল। এর ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয় এবং বিজাতীয় মুদ্রার ওপর নির্ভরতা শেষ হয়।

আরবি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান:তাঁর শাসনের আগে খিলাফতের প্রশাসনিক কাজগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রিক, ফারসি বা কিবতি ভাষায় সম্পন্ন হতো। আবদুল মালেক আদেশ জারি করেন যে, পুরো সাম্রাজ্যের সমস্ত দাপ্তরিক কাজ এবং রেকর্ড শুধুমাত্র আরবি ভাষায় সংরক্ষণ করতে হবে। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে আরবি ভাষা কেবল ধর্মের ভাষা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান, প্রশাসন এবং শিক্ষার ভাষায় পরিণত হয়। এটি বিভিন্ন জাতির মুসলমানদের মধ্যে ভাষাগত ঐক্য তৈরি করেছিল।

স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময়: জেরুজালেমে অবস্থিত বিখ্যাত কুব্বাত আস-সাখরা বা ডোম অফ দ্য রক আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলেই (৬৯১ খ্রিস্টাব্দে) নির্মিত হয়। এটি ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম প্রাচীন ও সুন্দর নিদর্শন। তিনি চেয়েছিলেন মুসলিম স্থাপত্যের এমন একটি নিদর্শন তৈরি করতে যা তৎকালীন বড় বড় গির্জা বা রোমান প্রাসাদের জৌলুসকেও ছাড়িয়ে যাবে। আজও এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রশাসনিক ও ডাক ব্যবস্থার উন্নয়ন-তিনি পুরো সাম্রাজ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ও ডাক ব্যবস্থা (বরিদুল মালেক) গড়ে তোলেন। ঘোড়ার মাধ্যমে দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য বিভিন্ন স্থানে বিশ্রামাগার ও ঘোড়া পরিবর্তনের স্টেশন তৈরি করেন। এর ফলে দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে বিদ্রোহ বা জরুরি খবর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানী দামেস্কে পৌঁছে যেত। এটি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।

কুরআন শরিফে হরকত বা নুকতা প্রদান:অনেকের মতে, তাঁর শাসনামলেই (এবং তাঁর সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের তত্ত্বাবধানে) কুরআন শরিফের লিপিতে নুকতা (বিন্দু) এবং হরকত (জের-জবর-পেশ) ব্যাপকভাবে সংযোজন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল অনারব মুসলমানরা যাতে কোনো ভুল ছাড়াই সঠিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে। এটি ইসলামি শিক্ষা প্রসারে এক অমর অবদান।

আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান ২১ বছর (৬৮৫–৭০৫ খ্রি.) শাসন করেন। তাঁর সময় থেকেই উমাইয়া সাম্রাজ্য একটি সুশৃঙ্খল আরব সাম্রাজ্যে রূপ নেয়। আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক (ওয়ালিদ ১) খলিফা হিসেবে ক্ষমতায় বসেন।

আবদুল মালেক তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর পুত্রদের শাসনের জন্য তৈরি করেছিলেন। তিনি তাঁর বড় ছেলে ওয়ালিদকে প্রথম উত্তরাধিকারী এবং মেজো ছেলে সুলাইমানকে দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করে যান। এর ফলে তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষমতা নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা বা যুদ্ধ হয়নি।

খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক: (৭০৫–৭১৫ খ্রি.)

খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক (ওয়ালিদ ১) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের সবচেয়ে সফল এবং প্রভাবশালী শাসকদের একজন। তাঁর ১০ বছরের শাসনকালকে ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বা সম্প্রসারণের শ্রেষ্ঠ সময় বলা হয়। তাঁর পিতা আবদুল মালেক সাম্রাজ্যে যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছিলেন, ওয়ালিদ তার ওপর ভিত্তি করে এক বিশাল বৈশ্বিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

অভূতপূর্ব ভৌগোলিক বিস্তার (তিন মহাদেশে ইসলাম):

ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের আমলেই মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা সবদিকে সবচেয়ে বেশি প্রসারিত হয়েছিল। তাঁর দক্ষ সেনাপতিদের মাধ্যমে তিনি একই সাথে তিনটি ভিন্ন দিকে বিজয় অভিযান পরিচালনা করেন-

ইউরোপ বিজয়: (৭১১ খ্রিস্টাব্দ)এটি ছিল মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক সামরিক অভিযান। সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ৭,০০০ সৈন্য নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দিয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন।তারিক বিন জিয়াদের বীরত্ব ছিল প্রবাদপ্রতিম। স্পেনের উপকূলে অবতরণ করার পর তিনি তাঁর সৈন্যদের পিছু হটার সব পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নিজের জাহাজগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর বাহিনীকে বলেছিলেন,

সামনে শত্রু আর পেছনে সমুদ্র, পালানোর কোনো পথ নেই। এখন বিজয় অথবা শাহাদাত—এই আমাদের পথ।

৭১১ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের রাজা রডারিকের বিশাল বাহিনীর (প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য) সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়। অসম যুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তারিক বিন জিয়াদের রণকৌশল এবং ঈমানি শক্তির কাছে রডারিক পরাজিত ও নিহত হন। এই বিজয়ের পর একের পর এক কর্ডোভা, টলেডো ও সেভিল মুসলিমদের অধীনে আসে। এর মাধ্যমে ইউরোপে দীর্ঘ ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক স্বর্ণযুগ শুরু হয়।

ভারত অভিযান: (৭১১ - ৭১২ খ্রিস্টাব্দ) সিন্ধু ও মুলতান বিজয়

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রবেশের প্রধান কৃতিত্ব কিশোর সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম-এর। এই অভিযানের মূল কারণ ছিল সিন্ধুর রাজা দাহিরের আশ্রিত জলদস্যুদের মাধ্যমে মুসলিম বণিকদের জাহাজ লুণ্ঠন এবং বন্দীদের মুক্তি দিতে দাহিরের অস্বীকার। মাত্র ১৭ বছর বয়সে মুহাম্মদ বিন কাসিম ৬,০০০ অশ্বারোহী এবং অত্যাধুনিক মানজানিক (পাথর নিক্ষেপকারী যন্ত্র) নিয়ে সিন্ধু অভিমুখে যাত্রা করেন।৭১২ খ্রিস্টাব্দে রাওয়ার নামক স্থানে রাজা দাহিরের বিশাল সৈন্যবাহিনী এবং হস্তিবাহিনীর মুখোমুখি হন কাসিম। কাসিম অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে দাহিরের হাতির পিঠে থাকা হাওদায় অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন এবং দাহির নিহত হন। সিন্ধু জয়ের পর তিনি মুলতান পর্যন্ত অধিকার করেন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল তাঁর ইনসাফপূর্ণ শাসন। তিনি স্থানীয় হিন্দুদের ওপর কোনো ধর্মীয় জবরদস্তি করেননি এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন, যার ফলে অনেকেই স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

 

মধ্য এশিয়া বিজয়: (৭০৫ - ৭১৫ খ্রিস্টাব্দ) মাওয়ারাননহর বা ট্রান্সঅক্সিয়ানা অভিযান

মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ মরুভূমি ও পার্বত্য অঞ্চল বিজয় করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। এই অসাধ্য সাধন করেন উমাইয়াদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জেনারেল কুতাইবা বিন মুসলিম।

প্রধান শহরগুলোর বিজয়: কুতাইবা বিন মুসলিম ধাপে ধাপে বর্তমান উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কিরগিজস্তানের অঞ্চলগুলো জয় করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল বুখারা, সমরকন্দ এবং খোয়ারিজম বিজয়। এই শহরগুলো ছিল তৎকালীন সিল্ক রোডের (রেশম পথ) প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র।

চীনা সীমান্তের দিকে যাত্রা: কুতাইবা বিজয়ী বেশে অগ্রসর হয়ে বর্তমান চীনের কাশগড় পর্যন্ত পৌঁছে যান। বলা হয়, চীনের সম্রাট মুসলিম বাহিনীর শক্তিতে ভীত হয়ে একটি শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হন এবং জিজিয়া কর দিতে রাজি হন।

কুতাইবার এই বিজয়ের ফলে মধ্য এশিয়ার তুর্কি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের প্রসার ঘটে। বুখারা ও সমরকন্দ পরবর্তীতে বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয় (যেখান থেকে পরবর্তীতে ইমাম বুখারীর মতো মহান মনীষীরা উঠে আসেন)।

এই তিনটি বিজয় ছিল খলিফা ওয়ালিদের দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং তাঁর সেনাপতিদের অবিশ্বাস্য সাহসিকতার ফল। এক দশকের মধ্যেই মুসলিম সাম্রাজ্য পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে পূর্বে ভারতের সিন্ধু নদ এবং উত্তরে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের শাসনামলে উমাইয়া খিলাফত তার ভৌগোলিক বিস্তৃতির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিল। সেই সময় বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৩০টিরও বেশি আধুনিক দেশ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তাঁর শাসনের অধীনে ছিল।

এশিয়া মহাদেশ (মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া):

আরব উপদ্বীপ: বর্তমান সৌদি আরব, ইয়েমেন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইন।

মধ্যপ্রাচ্য: সিরিয়া (সাম্রাজ্যের কেন্দ্র), লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং ইরাক।

পারস্য অঞ্চল: বর্তমান ইরান এবং আফগানিস্তানের সম্পূর্ণ অংশ।

ভারতীয় উপমহাদেশ: বর্তমান পাকিস্তান (সিন্ধু ও মুলতান অঞ্চল) এবং ভারতের রাজস্থান ও গুজরাটের কিছু সীমান্ত এলাকা।

মধ্য এশিয়া: বর্তমান উজবেকিস্তান (সমরকন্দ ও বুখারা), তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান এবং কাজাখস্তানের দক্ষিণাঞ্চল। এমনকি চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত তাঁর প্রভাব ছিল।

আফ্রিকা মহাদেশ (উত্তর আফ্রিকা):

মিশর: এটি ছিল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র।

মাগরেব অঞ্চল: বর্তমান লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া এবং মরক্কো। এই অঞ্চলগুলো জয় করার পরই মুসলিমরা ইউরোপে প্রবেশের পথ খুঁজে পায়।

ইউরোপ মহাদেশ:আইবেরীয় উপদ্বীপ বর্তমান স্পেন এবং পর্তুগালের প্রায় ৯০% এলাকা তাঁর অধীনে চলে আসে (যা তখন আন্দালুসিয়া নামে পরিচিত ছিল)।

অন্যান্য: ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন দ্বীপ যেমন সাইপ্রাস এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের কিছু সীমান্ত এলাকাও তাঁর শাসনের আওতায় আসতে শুরু করেছিল।

 

গুরুত্বপূর্ণ শহরসমূহ (সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র):

তাঁর শাসনামলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ শহরগুলো উমাইয়াদের অধীনে ছিল-

দামেস্ক: সাম্রাজ্যের রাজধানী (বর্তমান সিরিয়া)।

মক্কা ও মদিনা: ইসলামের পবিত্রতম দুই শহর।

জেরুজালেম: যেখানে তিনি কুব্বাত আস-সাখরা নির্মাণ সম্পন্ন করেছিলেন।

কায়রো (ফুস্তাত): উত্তর আফ্রিকার প্রশাসনিক কেন্দ্র।

সমরকন্দ ও বুখারা: মধ্য এশিয়ার বাণিজ্য ও শিক্ষার কেন্দ্র।

কর্ডোভা: স্পেনের প্রশাসনিক কেন্দ্র।

 

 

স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ ও উমাইয়া মসজিদ নির্মাণ:

ওয়ালিদ স্থাপত্যকলার প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে অমর কীর্তি হলো সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে উমাইয়া জামে মসজিদ (The Great Mosque of Damascus) নির্মাণ। এটি তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ও বৃহত্তম স্থাপত্য ছিল। তিনি এই মসজিদ তৈরিতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, মার্বেল পাথর এবং মোজাইক ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়াও তিনি মদিনায় মসজিদে নববীর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটান এবং মদিনার গভর্নরের (উমর ইবনে আবদুল আজিজ) মাধ্যমে সেখানে মেহরাব ও মিনারের নকশায় নতুনত্ব আনেন।

জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও আধুনিক সেবামূলক ব্যবস্থা :

ওয়ালিদ কেবল একজন বিজেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দরদী শাসক। তিনিই প্রথম ইসলামি বিশ্বে সুসংগঠিত জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা চালু করেন।তিনি অন্ধ, পঙ্গু এবং কুষ্ঠরোগীদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রত্যেক অন্ধ ব্যক্তির সহায়তার জন্য একজন করে পথপ্রদর্শক এবং পঙ্গু ব্যক্তিদের জন্য একজন করে সেবক সরকারি খরচে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।তিনিই মুসলিম ইতিহাসে প্রথম বিশেষায়িত হাসপাতাল বা মারিস্তান নির্মাণ করেন যেখানে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও খাবার দেওয়া হতো। সাম্রাজ্যের অর্থনীতি মজবুত করার জন্য তিনি ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন করেন। কাফেলা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে তিনি দীর্ঘ পথগুলোতে নতুন রাস্তা নির্মাণ করেন এবং রাস্তার মোড়ে মোড়ে কূপ খনন করেন যাতে পথিকদের পানির কষ্ট না হয়।অনুর্বর জমিকে চাষযোগ্য করার জন্য তিনি অসংখ্য খাল ও সেচনালা খনন করেন। এর ফলে কৃষিতে বিপ্লব ঘটে এবং সাম্রাজ্যের রাজস্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাঁর পিতা আবদুল মালেক বিদ্রোহ দমন করে যে কঠোর শাসন শুরু করেছিলেন, ওয়ালিদ তাকে নমনীয়তা এবং দক্ষতার মাধ্যমে ধরে রাখেন। তাঁর শাসনামলে সাম্রাজ্যের ভেতরে বড় ধরণের কোনো গৃহযুদ্ধ বা বিদ্রোহ হয়নি। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মতো দক্ষ (যদিও কঠোর) প্রশাসকদের মাধ্যমে তিনি ইরাক ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলেন। শান্তি বজায় থাকায় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল।

উত্তরাধিকার ও মৃত্যু :৭১৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর ভাই সুলাইমান বিন আবদুল মালেককে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যান। যদিও ওয়ালিদ তাঁর নিজের ছেলেকে খলিফা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিবারের চাপে তিনি তাঁর পিতার করা চুক্তি (সুলাইমানকে উত্তরাধিকারী করা) মেনে নিতে বাধ্য হন।খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের সময়কাল ছিল মুসলমানদের সামরিক শক্তি, স্থাপত্যশৈলী এবং জনকল্যাণের এক অনন্য সংমিশ্রণ। তাঁর আমলেই ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

 

সুলাইমান বিন আবদুল মালেক : (৭১৫–৭১৭ খ্রিস্টাব্দ)

খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই সুলাইমান বিন আবদুল মালেক ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খিলাফতের সিংহাসনে বসেন। যদিও তাঁর শাসনকাল ছিল মাত্র ২ বছর ৮ মাস,কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি ইতিহাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়ে গেছেন।

সুলাইমান বিন আবদুল মালেকের শাসনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) জয় করা। তিনি তাঁর ভাই মাসলামা বিন আবদুল মালেকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য এবং ১,৮০০ জাহাজের এক বিশাল বাহিনী পাঠান।এই অবরোধ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। কিন্তু প্রচণ্ড শীত, খাদ্য সংকট এবং বাইজান্টাইনদের গ্রিক ফায়ার (এক ধরণের অগ্নিনির্বাপক অস্ত্র যা পানিতেও জ্বলে)-এর কারণে মুসলিম বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। সুলাইমানের মৃত্যুর পর এই অভিযান স্থগিত করা হয়। এটি ছিল উমাইয়াদের অন্যতম বড় সামরিক বিপর্যয়।

সুলাইমানের শাসনের একটি অন্ধকার দিক ছিল তাঁর পূর্বসূরি ওয়ালিদের প্রিয় সেনাপতিদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ।-

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রভাব: সুলাইমানের সাথে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল। হাজ্জাজ মারা গেলেও সুলাইমান তাঁর পরিবারের ওপর অত্যাচার করেন।

বিজয়ী বীরদের পতন: তিনি সিন্ধু বিজয়ী মুহাম্মদ বিন কাসিম, মধ্য এশিয়া বিজয়ী কুতাইবা বিন মুসলিম এবং স্পেন বিজয়ী মুসা বিন নুসাইর-এর মতো সফল সেনাপতিদের পদচ্যুত করেন এবং তাঁদের সাথে অত্যন্ত অমর্যাদাকর আচরণ করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের ফলে সাম্রাজ্যের সামরিক গতি থমকে যায়।

তবে, সুলাইমানের একটি প্রশংসনীয় কাজ ছিল বন্দীদের মুক্তি দেওয়া। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সময়ে রাজনৈতিক কারণে অনেক মানুষকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। সুলাইমান ক্ষমতায় এসেই ইরাকের কারাগারগুলো উন্মুক্ত করে দেন এবং হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে মুক্তি দেন। এই কারণে মক্কার অনেক আলেম তাঁকে মিফতাহুল খায়ের বা কল্যাণের চাবিকাঠি উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

সুলাইমানের শাসনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং প্রভাববিস্তারি সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগের উত্তরাধিকারী নির্বাচন।

উমর ইবনে আবদুল আজিজের মনোনয়ন: সুলাইমান তাঁর নিজের সন্তানদের খলিফা না করে তাঁর চাচাতো ভাই এবং পরহেজগার ব্যক্তিত্ব হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-কে খলিফা মনোনীত করেন।

পরামর্শদাতার ভূমিকা: বিখ্যাত আলেম রাজা ইবনে হাইওয়াহর পরামর্শে তিনি এই কাজ করেছিলেন। এর ফলে উমাইয়া বংশে আবার ইনসাফ ও ন্যায়বিচার ফিরে আসে। অনেকে মনে করেন, এই একটি সিদ্ধান্তের কারণেই সুলাইমানের পূর্বের অনেক ভুল ঢাকা পড়ে যায়।

মৃত্যু: সুলাইমান বিন আবদুল মালেক অত্যন্ত সৌখিন এবং ভোজনরসিক মানুষ ছিলেন। বলা হয়, তিনি একাই প্রচুর খাবার খেতে পারতেন। তিনি খুব সুন্দর সুতির কাপড় ও জমকালো পোশাক পরতে পছন্দ করতেন। ৭১৭ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার উত্তর দিকে দাবিক নামক স্থানে কনস্টান্টিনোপল অভিযানের তদারকি করার সময় তিনি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

 

উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর ক্ষমতা গ্রহণ (৭১৭–৭২০ খ্রিস্টাব্দ)

সুলাইমান বিন আবদুল মালেক যখন সিরিয়ার দাবিক নামক স্থানে মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখন তাঁর উপদেষ্টা রাজা ইবনে হাইওয়াহ তাঁকে পরামর্শ দেন যে, উমাইয়া রাজবংশের টিকে থাকার জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একজন পরহেজগার শাসক প্রয়োজন। সুলাইমান এই পরামর্শ গ্রহণ করে একটি সিলমোহরকৃত পত্রে উমর ইবনে আবদুল আজিজের নাম লিখে যান।

সুলাইমানের জানাজা শেষ হওয়ার পরপরই সেই পত্রটি জনগণের সামনে পড়া হয়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) খলিফা হওয়ার খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে যান এবং তিনি প্রথমে এই বিশাল দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। তিনি উপস্থিত জনতাকে বলেন, আমি তোমাদের ওপর খলিফা হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা পোষণ করি না, তোমরা চাইলে অন্য কাউকে বেছে নিতে পারো। কিন্তু জনতা সমস্বরে তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে তিনি শেষ পর্যন্ত খিলাফতের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।

বিলাসিতা বর্জন ও শাসনকাল: ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি রাজকীয় বিলাসিতা পুরোপুরি ত্যাগ করেন। খলিফা হওয়ার পর, তিনি রাজকীয় প্রথা অনুযায়ী দামি ঘোড়া এবং দেহরক্ষী নিতে অস্বীকার করেন। তিনি নিজের সাধারণ গাধায় চড়ে মসজিদে যান । তিনি উমাইয়া রাজপরিবারের সেই আমলাতান্ত্রিক ও ভোগবাদী ধারাকে পরিবর্তন করে খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেন।

*উমাইয়া বংশের আগের খলিফারা এবং তাঁদের আত্মীয়রা সাধারণ মানুষের জমি ও সম্পদ জোরপূর্বক দখল করে রেখেছিলেন। উমর ইবনে আবদুল আজিজ ক্ষমতায় এসেই রাজপরিবারের সেই বিশেষ সুবিধাগুলো বন্ধ করে দেন।তিনি রাজপরিবারের সদস্যদের হাত থেকে অবৈধভাবে দখল করা জমি কেড়ে নিয়ে প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দেন। এমনকি উমাইয়া বংশের পূর্ববর্তী খলিফাদের নামীয় অন্যায় সুযোগ-সুবিধাও তিনি বাতিল করেন।

*তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মতো কঠোর শাসকদের দ্বারা নিযুক্ত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেন এবং প্রতিটি গভর্নরকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করেন।

* তাঁর মাত্র আড়াই বছরের শাসনামলে অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই উন্নত হয়েছিল যে, ইতিহাসে বলা হয়— আরবে যাকাত নেওয়ার মতো কোনো গরিব মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না।

আগের শাসনামলে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য যারা নতুন মুসলমান হতো , তাদের ওপরও জিজিয়া কর বসানো হতো। উমর ইবনে আবদুল আজিজ এই অন্যায্য প্রথা কঠোরভাবে বন্ধ করেন। জিজিয়া কর বাতিল করার ফলে অমুসলিমরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। যখন রাজস্ব কর্মকর্তারা অভিযোগ করলেন যে এতে সরকারি আয় কমে যাচ্ছে, তখন তিনি ঐতিহাসিক এক উত্তর দিয়েছিলেন: মহান আল্লাহ মুহাম্মদ (সা.)-কে সত্যের দাওয়াত দিয়ে পাঠিয়েছেন, কর আদায়কারী হিসেবে নয়।

তিনি অমুসলিমদের গির্জা এবং উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং তাদের ওপর কোনো প্রকার জুলুম করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন।তাঁর ইনসাফপূর্ণ শাসনের ফলে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অভাবনীয় বরকত আসে। তিনি দুর্নীতি বন্ধ করে বায়তুল মালের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তাঁর আড়াই বছরের শাসনের শেষ দিকে মানুষ যাকাতের টাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত, কিন্তু সেই টাকা নেওয়ার মতো একজন গরিব মানুষও পুরো সাম্রাজ্যে খুঁজে পাওয়া যেত না।সেই সময় তিনি এ ও ঘোষণা করেছিলেন যে, কোনো নাগরিক যদি নিজের ঋণ পরিশোধ করতে না পারে, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার ঋণ শোধ করে দেওয়া হবে।

হাদিস সংকলনের উদ্যোগ: ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো পবিত্র হাদিস শরীফ সংকলনের সরকারি নির্দেশ। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, আলেমদের মৃত্যু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণীসমূহ হারিয়ে যেতে পারে। তাঁর নির্দেশেই ইমাম জুহরী (রহ.)-এর মতো আলেমগণ আনুষ্ঠানিকভাবে হাদিস সংগ্রহের কাজ শুরু করেন, যা আজ আমাদের কাছে সহীহ হাদিস পৌঁছানোর পথ প্রশস্ত করেছে।

 

মৃত্যু : উমর ইবনে আবদুল আজিজের ইনসাফপূর্ণ শাসন উমাইয়া রাজপরিবারের অনেক সদস্যের স্বার্থে আঘাত হেনেছিল, কারণ তাঁরা আর আগের মতো বিলাসিতা করতে পারছিলেন না। ফলে ষড়যন্ত্র করে তাঁরই এক ভৃত্য বা গোলামকে দিয়ে খাবারের সাথে বিষ প্রয়োগ করা হয়। ৭২০ খ্রিস্টাব্দে ৩৯ বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

তাঁর মৃত্যুর পর সুলাইমান বিন আবদুল মালেকের আগের ওসিয়ত অনুযায়ী ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক (দ্বিতীয় ইয়াজিদ) ক্ষমতায় বসেন। তিনি ক্ষমতায় এসে উমর ইবনে আবদুল আজিজের অনেক মানবিক সংস্কার বাতিল করে দেন এবং পুনরায় উমাইয়াদের পুরনো ধারার শাসনে ফিরে যান।

 

ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক (৭২০–৭২৪ খ্রিস্টাব্দ):

হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর মৃত্যুর পর ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক (ইয়াজিদ ২) ক্ষমতায় বসেন। তাঁর শাসনকাল (৭২০–৭২৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিল উমাইয়া ইতিহাসের এক বিপরীতমুখী অধ্যায়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ যে ইনসাফ ও মিতব্যয়িতার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, দ্বিতীয় ইয়াজিদ ক্ষমতায় এসে তা প্রায় পুরোপুরি পাল্টে ফেলেন।

সংস্কার বাতিল ও শাসনকাল: ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক ক্ষমতায় বসার পর উমাইয়া রাজপরিবারের চাপের মুখে পড়েন। রাজপরিবারের সদস্যরা উমর ইবনে আবদুল আজিজের কঠোর ন্যায়বিচারের কারণে তাঁদের সুযোগ-সুবিধা হারিয়েছিলেন।

* ইয়াজিদ ২ ক্ষমতায় এসেই উমর (রহ.)-এর প্রবর্তিত সাধারণ জীবনযাপনের রীতি ত্যাগ করে পুনরায় রাজকীয় বিলাসিতায় ফিরে যান। তিনি বায়তুল মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) অর্থ নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যয় করতে শুরু করেন।

* উমর (রহ.) নবদীক্ষিত মুসলমানদের ওপর থেকে যে জিজিয়া কর তুলে নিয়েছিলেন, ইয়াজিদ তা পুনরায় চালু করেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয় এবং অনেকে ইসলামি শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন।

*ইয়াজিদ ২ মুদারি গোত্রের প্রতি অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন এবং শাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কেবল তাদেরই নিয়োগ দিতে শুরু করেন। এর ফলে ইয়ামানি গোত্রীয় মুসলমানরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

* এই গোত্রীয় বৈষম্য সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তিতে ফাটল ধরায়। সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে উমাইয়াদের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দেয়।

বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও সামরিক স্থবিরতা: উমর ইবনে আবদুল আজিজ যুদ্ধের চেয়ে শান্তিতে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু ইয়াজিদের আমলে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হলেও তা সফল হয়নি-

* ককেশাস অঞ্চলে খাজার তুর্কিরা মুসলিম সীমান্তগুলোতে আক্রমণ শুরু করে। ইয়াজিদের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় এবং সেনাবাহিনীতে গোত্রীয় কোন্দল থাকায় এই আক্রমণগুলো প্রতিহত করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল।

* খলিফা ওয়ালিদ বা সুলাইমানের আমলে সাম্রাজ্য যেভাবে এগিয়েছিল, ইয়াজিদের আমলে তা থেমে যায় এবং কিছু কিছু এলাকা মুসলিমদের হাতছাড়া হতে শুরু করে।

আব্বাসীয় আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি: ইয়াজিদ ২-এর এই বিশৃঙ্খল এবং বৈষম্যমূলক শাসনের সুযোগ নেয় আব্বাসীয়রা। তারা গোপনে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করতে থাকে যে, উমাইয়া রাজবংশ নবীজির (সা.) পরিবারের ওপর জুলুম করছে এবং তারা ইসলামের সঠিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। এই সময়েই আব্বাসীয়দের 'গোপন দাওয়াত' বা বিপ্লবের ভিত্তি মজবুত হয়, যা শেষ পর্যন্ত উমাইয়া সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।

মৃত্যু: ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক তাঁর ব্যক্তিগত শৌখিনতা এবং আমোদ-প্রমোদের জন্য ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তাঁর দুই প্রিয় দাসী— হাব্বাহ এবং সালামাহর প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন। কথিত আছে, তিনি তাঁর শাসনের অধিকাংশ সময় গান-বাজনা এবং এই দাসীদের সঙ্গেই কাটিয়ে দিতেন। ফলে রাষ্ট্রীয় কাজে চরম অবহেলা দেখা দেয়।

তাঁর প্রিয় দাসী হাব্বাহর মৃত্যুর পর তিনি এতটাই শোকাতুর হয়ে পড়েন যে, এর মাত্র কয়েক দিন পরই ৭২৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিজেও মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই খামখেয়ালি স্বভাবের কারণে খিলাফতের মর্যাদা অনেকটা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল।

 

খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালেক (৭২৪–৭৪৩ খ্রিস্টাব্দ):

খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালেক (৭২৪–৭৪৩ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন উমাইয়া বংশের দশম খলিফা এবং এই বংশের শেষ মহান ও শক্তিশালী শাসক। তাঁর ২০ বছরের দীর্ঘ শাসনামল ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল।ইয়াজিদ ২-এর বিশৃঙ্খল শাসনের পর হিশাম যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন সাম্রাজ্য চতুর্দিক থেকে সংকটে ঘেরা ছিল। তিনি তাঁর ২০ বছরের দীর্ঘ শাসনামলে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম, মিতব্যয়িতা এবং বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভেঙে পড়া উমাইয়া সাম্রাজ্যকে পুনরায় স্থিতিশীল করেন।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও কঠোর মিতব্যয়িতা : খলিফা হিশাম যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মাল প্রায় শূন্য ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে শক্তিশালী অর্থনীতির কোনো বিকল্প নেই। তিনি রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ একবারে বন্ধ করে দেন। তিনি নিজে অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখতেন। তাঁর এই মিতব্যয়িতার কারণে অনেকে তাঁকে কঠোর বা কৃপণ বলতেন, কিন্তু মূলত তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং জনকল্যাণের জন্য অর্থ সঞ্চয় করতেন।

তিনি ভূমি জরিপ করেন এবং কর আদায় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনেন। তাঁর সময়ে কৃষির উন্নতির জন্য সিরিয়া ও ইরাক অঞ্চলে অসংখ্য নতুন খাল খনন করা হয়। তিনি মরুভূমির মাঝে 'রুসাফা' নামক একটি আধুনিক শহর ও কৃষি খামার গড়ে তোলেন, যা সাম্রাজ্যের খাদ্য ও অর্থ উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।

ফ্রান্সে অভিযান ও তুরসের যুদ্ধ(৭৩২ খ্রিস্টাব্দ):হিশামের শাসনামলেই ইউরোপে মুসলিম সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয়। এই ঘটনাটি ইতিহাসে ব্যাটল অফ ট্যুরস (শহীদদের রাজপথ) নামে পরিচিত। স্পেনের গভর্নর ও বীর সেনাপতি আবদুর রহমান আল-গাফেকি এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ফ্রান্সের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তাঁরা বর্দো শহর জয় করে রাজধানী প্যারিসের কাছে 'তুরস' পর্যন্ত পৌঁছে যান। এটি ছিল ইউরোপে মুসলমানদের বিজয়ের সর্বোচ্চ সীমা। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি সেনাপতি চার্লস মার্টেলের বাহিনীর সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আবদুর রহমান আল-গাফেকি শহীদ হন। তীব্র শীত এবং রসদ সংকটের কারণে মুসলিম বাহিনী পিছু হটে স্পেনে ফিরে আসে। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এই যুদ্ধে মুসলমানরা জয়ী হলে আজ পুরো ইউরোপের ইতিহাস অন্যরকম হতো।

উত্তর আফ্রিকা ও বার্বার বিদ্রোহ দমন: হিশামের শাসনামলে উত্তর আফ্রিকার বার্বার মুসলমানরা উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে এক বিশাল বিদ্রোহ শুরু করে। এটি তাঁর শাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। স্থানীয় উমাইয়া কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং অনারব মুসলমানদের (বার্বার) ওপর অন্যায্য কর আরোপের কারণে এই বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। বার্বাররা খারেজি মতবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বিদ্রোহ দমনে প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনী ব্যর্থ হলেও হিশাম দমে যাননি। তিনি সিরিয়া থেকে তাঁর শ্রেষ্ঠ সেনাদল পাঠান। কয়েক বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর তিনি উত্তর আফ্রিকায় পুনরায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াই: সাম্রাজ্যের উত্তর ও পূর্ব সীমান্তে খাজার তুর্কি এবং অন্যান্য তুর্কি জাতিগোষ্ঠীরা বারবার আক্রমণ চালাচ্ছিল। হিশাম অত্যন্ত ধৈর্য ও কৌশলের সাথে এই সীমান্তগুলো রক্ষা করেন। খাজার তুর্কিরা ককেশাস পর্বত পার হয়ে মুসলিম ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে হিশাম তাঁর ভাই মাসলামা বিন আবদুল মালেককে বিশাল বাহিনী দিয়ে পাঠান। দীর্ঘ কয়েক বছরের যুদ্ধে খাজারদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত পিছু হটিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমান উজবেকিস্তান ও তুর্কিস্তান অঞ্চলে তুর্কিদের বিদ্রোহ দমন করতে হিশামকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। তাঁর দক্ষ সেনাপতিরা সমরকন্দ ও বুখারা অঞ্চলে উমাইয়া কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হন।

স্থাপত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা: হিশাম কেবল যুদ্ধবিগ্রহ নয়, বরং সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশেও বড় অবদান রেখে গেছেন। তাঁর সময়েই গ্রিক, ফারসি এবং ভারতীয় বিজ্ঞান ও দর্শনের গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদ করার কাজ গতি পায়। এটি পরবর্তী আব্বাসীয় আমলের 'স্বর্ণযুগের' ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তিনি সিরিয়ায় 'কাসর আল-হায়র' (পূর্ব ও পশ্চিম) নামক দুটি বিখ্যাত প্রাসাদ ও দুর্গ নির্মাণ করেন। এই স্থাপনাগুলোতে উমাইয়া স্থাপত্যের জৌলুস এবং শিল্পকলা ফুটে উঠেছে। এছাড়াও তিনি হাজ্জ যাত্রীদের সুবিধার্থে মক্কার পথে অসংখ্য সরাইখানা ও কূপ খনন করেছিলেন।

আব্বাসীয় আন্দোলনের উত্থান ও মৃত্যু:  হিশাম যখন সাম্রাজ্যের বাইরে শত্রুদের সাথে লড়াই করতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন সাম্রাজ্যের ভেতরে আব্বাসীয়রা গোপনে তাদের প্রচার শুরু করে। তারা মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে উমাইয়াদের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্র করতে থাকে। হিশাম তাঁর তীক্ষ্ণ গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অনেক বিদ্রোহ দমন করেছিলেন।৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে দীর্ঘ ২০ বছর সফলভাবে শাসন করার পর হিশাম মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর উমাইয়া বংশে আর কোনো যোগ্য শাসক ছিল না, যার ফলে উমাইয়া সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হয়  এবং মাত্র ৭ বছরের মধ্যে (৭৫০ খ্রিস্টাব্দে) পুরো সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

 

৭৪৩ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ:হিশাম বিন আবদুল মালেকের মৃত্যুর পর উমাইয়া সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই মাত্র ৭ বছরের মধ্যে উমাইয়াদের ১৩২ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এই সময়কালটি ছিল বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র এবং রক্তের ইতিহাসে ঘেরা-

ওয়ালিদ বিন ইয়াজিদ (ওয়ালিদ ২): খলিফা হিশাম ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও হিসাবী, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর যারা ক্ষমতায় বসেন তারা ছিলেন চরম বিলাসী এবং অদূরদর্শী। হিশামের পর তাঁর ভাতিজা ওয়ালিদ ২ ক্ষমতায় বসেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার চেয়ে আনন্দ-ফুর্তি, মদ্যপান আর শিকারে বেশি মত্ত থাকতেন। তাঁর এই চরিত্রে রাজপরিবারের অন্য সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মাত্র এক বছরের মাথায় তাঁরই চাচাতো ভাই তাঁকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেন।

ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই: এরপর শুরু হয় উমাইয়াদের নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। একেক জন খলিফা আসেন আর কয়েক মাসের মধ্যেই অন্যজন তাঁকে সরিয়ে দেন। এই অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের ফলে উমাইয়াদের যে শক্তিশালী 'সিরীয় সেনাবাহিনী' ছিল, তা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় এবং তাদের সামরিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে পড়ে।

আব্বাসীয়দের গোপন দাওয়াত ও কালো পতাকার উত্থান: উমাইয়া রাজপরিবার যখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করছিল, তখন আব্বাসীয়রা (রাসুলুল্লাহ সা.-এর চাচা আব্বাসের বংশধর) অত্যন্ত গোপনে তাদের জাল বিস্তার করছিল। আব্বাসীয়রা ইরানের খোরাসান অঞ্চলে আবু মুসলিম খোরাসানি নামক এক তুখোড় যোদ্ধা ও সংগঠককে নিয়োগ দেয়। তিনি সাধারণ মানুষকে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলেন। তিনি প্রচার করেন যে, উমাইয়া শাসকরা নবীজির পরিবারের ওপর জুলুম করেছে এবং তারা প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে। ৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে আবু মুসলিম খোরাসানি কালো পতাকা উত্তোলন করে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি দ্রুত খোরাসান ও পারস্যের বড় বড় শহরগুলো দখল করে নেন। উমাইয়াদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে সাধারণ আরব ও অনারব (মাওয়ালি) মুসলমানরা দলে দলে যোগ দেয়।

শেষ খলিফা মারওয়ান ২ এবং চূড়ান্ত পরাজয়: বিশৃঙ্খলা যখন তুঙ্গে, তখন উমাইয়াদের শেষ আশার আলো হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ (মারওয়ান ২)। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী যোদ্ধা এবং অভিজ্ঞ জেনারেল। তিনি ক্ষমতা নিয়ে বিদ্রোহ দমনের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে পুরো পারস্য ও ইরাক উমাইয়াদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ইরাকের জাব নদীর তীরে আব্বাসীয় ও উমাইয়াদের মধ্যে ইতিহাসের অন্যতম বড় চূড়ান্ত যুদ্ধ হয়। আব্বাসীয়দের সুশৃঙ্খল বাহিনীর সামনে মারওয়ানের বিশাল কিন্তু ক্লান্ত বাহিনী টিকতে পারেনি। যুদ্ধে উমাইয়াদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। যুদ্ধের পর মারওয়ান ২ পালিয়ে মিশরে আশ্রয় নেন। সেখানে বুসীর নামক স্থানে আব্বাসীয় সৈন্যরা তাঁকে খুঁজে বের করে এবং হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুর সাথেই দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়।

উমাইয়াদের ওপর আব্বাসীয়দের অমানবিক প্রতিশোধ: আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় এসেই উমাইয়াদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য এক নারকীয় তান্ডব চালায়। তারা উমাইয়া বংশের ছোট-বড় কাউকেই রেহাই দেয়নি। আব্বাসীয় সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন আলী উমাইয়া রাজবংশের প্রায় ৮০ জন সদস্যকে এক ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানান। সেখানে খাবার খাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ তিনি তাঁর সৈন্যদের নির্দেশ দেন এবং উপস্থিত সব উমাইয়াকে পিটিয়ে ও তলোয়ার দিয়ে হত্যা করা হয়। এমনকি সেই লাশের ওপর কাপড় বিছিয়ে আব্বাসীয়রা বিজয় উৎসব পালন করে খাবার খেয়েছিল। তাদের ঘৃণা এতটাই তীব্র ছিল যে, তারা উমাইয়া খলিফাদের (যেমন: মুয়াবিয়া, আবদুল মালেক, হিশাম) কবর খুঁড়ে তাঁদের কঙ্কাল বের করে পুড়িয়ে ফেলে বা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। শুধুমাত্র ন্যায়পরায়ণ খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের কবর তারা অক্ষত রেখেছিল।

স্পেনে উমাইয়ার পুনর্জন্ম: যখন পুরো উমাইয়া বংশকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছিল, তখন খলিফা হিশামের নাতি আবদুর রহমান (যিনি আবদুর রহমান আদ-দাখিল নামে পরিচিত) একাই বেঁচে যান। তিনি আব্বাসীয়দের হাত থেকে বাঁচতে নদী সাঁতরে, মরুভূমি পার হয়ে এবং নিজের পরিচয় লুকিয়ে সিরিয়া থেকে উত্তর আফ্রিকা পৌঁছান। দীর্ঘ ৬ বছরের বিপদসংকুল যাত্রা শেষে তিনি স্পেনে প্রবেশ করেন এবং সেখানে পুনরায় উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

 

 


Comments

Popular posts from this blog

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)