কুড়িগ্রাম জেলা পরিচিতিঃ

 


কুড়িগ্রাম জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী সীমান্ত জেলা।কুড়িগ্রাম জেলাকে নদীমাতৃক বাংলাদেশের 'নদ-নদীর প্রবেশদ্বার' বলা হয়। ভারতের হিমালয় এবং পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা প্রধান নদীগুলো এই জেলা দিয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

কুড়িগ্রামের জীবনযাত্রা সংস্কৃতি এবং অর্থনীতি পুরোপুরি এই নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা:কুড়িগ্রাম জেলা রংপুর বিভাগের অন্তর্গত। এর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত

উত্তরে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলা।

দক্ষিণে, গাইবান্ধা জেলা।

পূর্বে ,ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্য (ধুবড়ী জেলা)।

পশ্চিমে, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলা।

কুড়িগ্রাম জেলার মোট আয়তন প্রায় ২,২৩৬.৯৪ থেকে ২,২৯৬ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা প্রায় ২,৩২৯,১৬০ জন এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার চরাঞ্চল।

কুড়িগ্রাম জেলা ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত

১. কুড়িগ্রাম সদর

২. উলিপুর (সবচেয়ে বড় উপজেলা)

৩. চিলমারী

 ৪. নাগেশ্বরী

৫. ভুরুঙ্গামারী

৬. রাজারহাট

 ৭. ফুলবাড়ী

 ৮. রৌমারী

৯. চর রাজিবপুর

কুড়িগ্রামের মানচিত্র মূলত নদী দিয়ে আঁকা। নদীগুলো হলো:

 ব্রহ্মপুত্র: কুড়িগ্রামের প্রধানতম নদ (চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর)।

ধরলা: কুড়িগ্রাম শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত (ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম সদর)।

তিস্তা: কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট সীমান্তের নদী (রাজারহাট, উলিপুর)।

 দুধকুমার: ভুরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরীর প্রধান নদী।

ফুলকুমার: দুধকুমারের একটি শাখা নদী (নাগেশ্বরী)।

বুড়িতিস্তা: উলিপুর ও চিলমারী অঞ্চলের নদী।

জিঞ্জিরাম: রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী।

সোনাভরি: এটিও রৌমারী অঞ্চলের একটি নদী।

গঙ্গাধর: এটি দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগকারী একটি নদী (নাগেশ্বরী)।

নীলকমল: রৌমারী ও রাজিবপুর অঞ্চলের নদী।

গিরাই: উলিপুর ও চিলমারী এলাকার নদী।

কালজানি: এটি ভারতের সীমান্ত হয়ে নাগেশ্বরীতে প্রবেশ করেছে।

গদাধর: ভুরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরী সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত।

শংকোষ: ভুরুঙ্গামারী সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছে।

জালশিরা: নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী অঞ্চলের ছোট নদী।

বোয়ালমারী: এটিও কুড়িগ্রামের একটি স্থানীয় নদী।

হলহলিয়া নদী: এটি কুড়িগ্রামের উলিপুর ও চিলমারী অঞ্চলের একটি ছোট নদী।

 বানিয়ানি নদী: কুড়িগ্রামের রৌমারী এলাকায় এই নদীটির অবস্থান।

কোতয়ালী নদী: কুড়িগ্রামের সদর ও সংলগ্ন এলাকার একটি ছোট নদী।

 ভেলাকুপি নদী: এটি মূলত নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী অঞ্চলের একটি সীমান্ত নদী।

 মালদহ নদী: এটিও উত্তর কুড়িগ্রামের (নাগেশ্বরী) একটি নদী।

 সিংহরা নদী: উলিপুর ও চিলমারী এলাকার একটি স্থানীয় নদী।

কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদে অসংখ্য চর' রয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। এই চরাঞ্চলের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠোর কিন্তু বৈচিত্র্যময়।

মূলত কুড়িগ্রাম একটি কৃষিপ্রধান জেলা। ধান, পাট, গম, তামাক এবং আলু কুড়িগ্রাম জেলার প্রধান ফসল ।বর্তমানে চরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে ভুট্টা ও মিষ্টি কুমড়া চাষ হচ্ছে, যা জেলার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিচ্ছে। নদ-নদী ও বিল থেকে প্রচুর পরিমাণে দেশি মাছ আহরণ করা হয়।এছাড়া চিলমারী বন্দর একসময় ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান নদীবন্দর।বর্তমানে এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ চলছে।

 

কুড়িগ্রামে বেশ কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রয়েছে:

1.চিলমারী বন্দর: ব্রহ্মপুত্রের বিশালতা দেখার সেরা জায়গা।চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত চিলমারী বন্দর একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর, যা দীর্ঘ ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে  ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বন্দরটি বর্তমানে পণ্য পরিবহন, যাত্রীবাহী নৌ চলাচল এবং একটি ভাসমান তেল ডিপোর জন্য পরিচিত।

2.শাহী মসজিদ (রাজারহাট): মীর ইসমাইল হাশেমী (র.)-এর স্মৃতিবিজড়িত মোগল স্থাপত্য। রাজারহাট উপজেলার ব্যাপারীপাড়ায় অবস্থিত একটি মসজিদ । এটি মুঘল আমলে নির্মিত হয়েছিল । বাংলাদেশি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটিকে একটি সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে মনোনীত করেছে।

3.ভিতরবন্দ জমিদার বাড়ি: নাগেশ্বরী উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন রাজপ্রাসাদ। নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ভিতরবন্দ গ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হলো ভিতরবন্দ জমিদার বাড়ি। এটি জেলা সদর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইংরেজ আমলের শুরুর দিকে এই স্থানটি ভিতরবন্দ পরগনার সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যা কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

4.নাউডাঙ্গা জমিদার বাড়ি: ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি ও বংশের প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশদের কাছ থেকে বাহাদুর খেতাবপ্রাপ্ত প্রমদরঞ্জন বক্সী। 

5.ধরলা সেতু: কুড়িগ্রাম শহরের প্রবেশপথে আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন।বিকেল বেলা প্রাণবন্ত সময় কাটানো, কিংবা সূর্যাস্ত দেখার জন্য অনেক দর্শনার্থীর ভিড় জমে।

6.সোনাহাট স্থলবন্দর: ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় অবস্থিত সোনাহাট স্থলবন্দর একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমদানিনির্ভর স্থলবন্দর। ২০১৮ সালের জুন থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা এই বন্দর দিয়ে মূলত ভারত থেকে পাথর ও কয়লা আমদানি করা হয় । এটি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সেভেন সিস্টার্স' বা উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুয়ার ।

7. টুপামারী পুকুর: উলিপুর উপজেলার দূর্গাপুর ইউনিয়নে অবস্থিত জিয়া পুকুর বর্তমান নাম দৃষ্টিনন্দন পুকুর নামে পরিচিত। প্রায় ২৫ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং শৌখিন মৎস্য শিকারিদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ।

8.মুন্সী বাড়ী: কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরে অবস্থিত মুন্সী বাড়ী একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী সামন্ততান্ত্রিক জমিদার বাড়ি । যা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই বাড়িটি ওই অঞ্চলের গৌরবময় অতীত ও সংস্কৃতির নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত।

কুড়িগ্রাম হলো ভাওয়াইয়া গানের উর্বর ভূমি। আব্বাসউদ্দীন আহমদের সেই বিখ্যাত গান— ওকি গাড়িয়াল ভাই— এই চিলমারী বন্দরকেই তুলে ধরে।

এখানকার শীতল পাটি এবং বাঁশ-বেতের কাজ বেশ জনপ্রিয়।ব্রহ্মপুত্র নদ কুড়িগ্রামকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এবং নদী পার হয়ে সেখানে যেতে হয়। এই দুর্গমতা সত্ত্বেও এই অঞ্চলগুলো সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রতি বছর বন্যা ও নদী ভাঙনের শিকার হয়, যা এখানকার মানুষের দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ। তবে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে চরাঞ্চলের উন্নয়ন এবং সোনাহাট স্থলবন্দরের প্রসারের ফলে জেলাটি দ্রুত উন্নতির দিকে এগোচ্ছে।

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)