খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালেক (৭২৪–৭৪৩ খ্রিস্টাব্দ) ও পরবর্তী ৭ বছরের মধ্যে উমাইয়া সাম্রাজ্যের পতন

 


খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালেক (৭২৪–৭৪৩ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন উমাইয়া বংশের দশম খলিফা এবং এই বংশের শেষ মহান ও শক্তিশালী শাসক। তাঁর ২০ বছরের দীর্ঘ শাসনামল ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল।ইয়াজিদ ২-এর বিশৃঙ্খল শাসনের পর হিশাম যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন সাম্রাজ্য চতুর্দিক থেকে সংকটে ঘেরা ছিল। তিনি তাঁর ২০ বছরের দীর্ঘ শাসনামলে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম, মিতব্যয়িতা এবং বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভেঙে পড়া উমাইয়া সাম্রাজ্যকে পুনরায় স্থিতিশীল করেন।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও কঠোর মিতব্যয়িতা : খলিফা হিশাম যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মাল প্রায় শূন্য ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে শক্তিশালী অর্থনীতির কোনো বিকল্প নেই। তিনি রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ একবারে বন্ধ করে দেন। তিনি নিজে অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখতেন। তাঁর এই মিতব্যয়িতার কারণে অনেকে তাঁকে কঠোর বা কৃপণ বলতেন, কিন্তু মূলত তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং জনকল্যাণের জন্য অর্থ সঞ্চয় করতেন।

তিনি ভূমি জরিপ করেন এবং কর আদায় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনেন। তাঁর সময়ে কৃষির উন্নতির জন্য সিরিয়া ও ইরাক অঞ্চলে অসংখ্য নতুন খাল খনন করা হয়। তিনি মরুভূমির মাঝে 'রুসাফা' নামক একটি আধুনিক শহর ও কৃষি খামার গড়ে তোলেন, যা সাম্রাজ্যের খাদ্য ও অর্থ উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।



ফ্রান্সে অভিযান ও তুরসের যুদ্ধ(৭৩২ খ্রিস্টাব্দ):হিশামের শাসনামলেই ইউরোপে মুসলিম সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয়। এই ঘটনাটি ইতিহাসে ব্যাটল অফ ট্যুরস (শহীদদের রাজপথ) নামে পরিচিত। স্পেনের গভর্নর ও বীর সেনাপতি আবদুর রহমান আল-গাফেকি এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ফ্রান্সের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তাঁরা বর্দো শহর জয় করে রাজধানী প্যারিসের কাছে 'তুরস' পর্যন্ত পৌঁছে যান। এটি ছিল ইউরোপে মুসলমানদের বিজয়ের সর্বোচ্চ সীমা। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি সেনাপতি চার্লস মার্টেলের বাহিনীর সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আবদুর রহমান আল-গাফেকি শহীদ হন। তীব্র শীত এবং রসদ সংকটের কারণে মুসলিম বাহিনী পিছু হটে স্পেনে ফিরে আসে। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এই যুদ্ধে মুসলমানরা জয়ী হলে আজ পুরো ইউরোপের ইতিহাস অন্যরকম হতো।



উত্তর আফ্রিকা ও বার্বার বিদ্রোহ দমন: হিশামের শাসনামলে উত্তর আফ্রিকার বার্বার মুসলমানরা উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে এক বিশাল বিদ্রোহ শুরু করে। এটি তাঁর শাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। স্থানীয় উমাইয়া কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং অনারব মুসলমানদের (বার্বার) ওপর অন্যায্য কর আরোপের কারণে এই বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। বার্বাররা খারেজি মতবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বিদ্রোহ দমনে প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনী ব্যর্থ হলেও হিশাম দমে যাননি। তিনি সিরিয়া থেকে তাঁর শ্রেষ্ঠ সেনাদল পাঠান। কয়েক বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর তিনি উত্তর আফ্রিকায় পুনরায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।



ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াই: সাম্রাজ্যের উত্তর ও পূর্ব সীমান্তে খাজার তুর্কি এবং অন্যান্য তুর্কি জাতিগোষ্ঠীরা বারবার আক্রমণ চালাচ্ছিল। হিশাম অত্যন্ত ধৈর্য ও কৌশলের সাথে এই সীমান্তগুলো রক্ষা করেন। খাজার তুর্কিরা ককেশাস পর্বত পার হয়ে মুসলিম ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে হিশাম তাঁর ভাই মাসলামা বিন আবদুল মালেককে বিশাল বাহিনী দিয়ে পাঠান। দীর্ঘ কয়েক বছরের যুদ্ধে খাজারদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত পিছু হটিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমান উজবেকিস্তান ও তুর্কিস্তান অঞ্চলে তুর্কিদের বিদ্রোহ দমন করতে হিশামকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। তাঁর দক্ষ সেনাপতিরা সমরকন্দ ও বুখারা অঞ্চলে উমাইয়া কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হন।

স্থাপত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা: হিশাম কেবল যুদ্ধবিগ্রহ নয়, বরং সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশেও বড় অবদান রেখে গেছেন। তাঁর সময়েই গ্রিক, ফারসি এবং ভারতীয় বিজ্ঞান ও দর্শনের গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদ করার কাজ গতি পায়। এটি পরবর্তী আব্বাসীয় আমলের 'স্বর্ণযুগের' ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তিনি সিরিয়ায় 'কাসর আল-হায়র' (পূর্ব ও পশ্চিম) নামক দুটি বিখ্যাত প্রাসাদ ও দুর্গ নির্মাণ করেন। এই স্থাপনাগুলোতে উমাইয়া স্থাপত্যের জৌলুস এবং শিল্পকলা ফুটে উঠেছে। এছাড়াও তিনি হাজ্জ যাত্রীদের সুবিধার্থে মক্কার পথে অসংখ্য সরাইখানা ও কূপ খনন করেছিলেন।

আব্বাসীয় আন্দোলনের উত্থান ও মৃত্যু:  হিশাম যখন সাম্রাজ্যের বাইরে শত্রুদের সাথে লড়াই করতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন সাম্রাজ্যের ভেতরে আব্বাসীয়রা গোপনে তাদের প্রচার শুরু করে। তারা মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে উমাইয়াদের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্র করতে থাকে। হিশাম তাঁর তীক্ষ্ণ গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অনেক বিদ্রোহ দমন করেছিলেন।৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে দীর্ঘ ২০ বছর সফলভাবে শাসন করার পর হিশাম মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর উমাইয়া বংশে আর কোনো যোগ্য শাসক ছিল না, যার ফলে উমাইয়া সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হয়  এবং মাত্র ৭ বছরের মধ্যে (৭৫০ খ্রিস্টাব্দে) পুরো সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।


৭৪৩ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ:হিশাম বিন আবদুল মালেকের মৃত্যুর পর উমাইয়া সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই মাত্র ৭ বছরের মধ্যে উমাইয়াদের ১৩২ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এই সময়কালটি ছিল বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র এবং রক্তের ইতিহাসে ঘেরা-

ওয়ালিদ বিন ইয়াজিদ (ওয়ালিদ ২): খলিফা হিশাম ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও হিসাবী, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর যারা ক্ষমতায় বসেন তারা ছিলেন চরম বিলাসী এবং অদূরদর্শী। হিশামের পর তাঁর ভাতিজা ওয়ালিদ ২ ক্ষমতায় বসেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার চেয়ে আনন্দ-ফুর্তি, মদ্যপান আর শিকারে বেশি মত্ত থাকতেন। তাঁর এই চরিত্রে রাজপরিবারের অন্য সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মাত্র এক বছরের মাথায় তাঁরই চাচাতো ভাই তাঁকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেন।

ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই: এরপর শুরু হয় উমাইয়াদের নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। একেক জন খলিফা আসেন আর কয়েক মাসের মধ্যেই অন্যজন তাঁকে সরিয়ে দেন। এই অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের ফলে উমাইয়াদের যে শক্তিশালী 'সিরীয় সেনাবাহিনী' ছিল, তা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় এবং তাদের সামরিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে পড়ে।

আব্বাসীয়দের গোপন দাওয়াত ও কালো পতাকার উত্থান: উমাইয়া রাজপরিবার যখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করছিল, তখন আব্বাসীয়রা (রাসুলুল্লাহ সা.-এর চাচা আব্বাসের বংশধর) অত্যন্ত গোপনে তাদের জাল বিস্তার করছিল। আব্বাসীয়রা ইরানের খোরাসান অঞ্চলে আবু মুসলিম খোরাসানি নামক এক তুখোড় যোদ্ধা ও সংগঠককে নিয়োগ দেয়। তিনি সাধারণ মানুষকে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলেন। তিনি প্রচার করেন যে, উমাইয়া শাসকরা নবীজির পরিবারের ওপর জুলুম করেছে এবং তারা প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে। ৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে আবু মুসলিম খোরাসানি কালো পতাকা উত্তোলন করে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি দ্রুত খোরাসান ও পারস্যের বড় বড় শহরগুলো দখল করে নেন। উমাইয়াদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে সাধারণ আরব ও অনারব (মাওয়ালি) মুসলমানরা দলে দলে যোগ দেয়।

শেষ খলিফা মারওয়ান ২ এবং চূড়ান্ত পরাজয়: বিশৃঙ্খলা যখন তুঙ্গে, তখন উমাইয়াদের শেষ আশার আলো হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ (মারওয়ান ২)। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী যোদ্ধা এবং অভিজ্ঞ জেনারেল। তিনি ক্ষমতা নিয়ে বিদ্রোহ দমনের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে পুরো পারস্য ও ইরাক উমাইয়াদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ইরাকের জাব নদীর তীরে আব্বাসীয় ও উমাইয়াদের মধ্যে ইতিহাসের অন্যতম বড় চূড়ান্ত যুদ্ধ হয়। আব্বাসীয়দের সুশৃঙ্খল বাহিনীর সামনে মারওয়ানের বিশাল কিন্তু ক্লান্ত বাহিনী টিকতে পারেনি। যুদ্ধে উমাইয়াদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। যুদ্ধের পর মারওয়ান ২ পালিয়ে মিশরে আশ্রয় নেন। সেখানে বুসীর নামক স্থানে আব্বাসীয় সৈন্যরা তাঁকে খুঁজে বের করে এবং হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুর সাথেই দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়।

উমাইয়াদের ওপর আব্বাসীয়দের অমানবিক প্রতিশোধ: আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় এসেই উমাইয়াদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য এক নারকীয় তান্ডব চালায়। তারা উমাইয়া বংশের ছোট-বড় কাউকেই রেহাই দেয়নি। আব্বাসীয় সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন আলী উমাইয়া রাজবংশের প্রায় ৮০ জন সদস্যকে এক ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানান। সেখানে খাবার খাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ তিনি তাঁর সৈন্যদের নির্দেশ দেন এবং উপস্থিত সব উমাইয়াকে পিটিয়ে ও তলোয়ার দিয়ে হত্যা করা হয়। এমনকি সেই লাশের ওপর কাপড় বিছিয়ে আব্বাসীয়রা বিজয় উৎসব পালন করে খাবার খেয়েছিল। তাদের ঘৃণা এতটাই তীব্র ছিল যে, তারা উমাইয়া খলিফাদের (যেমন: মুয়াবিয়া, আবদুল মালেক, হিশাম) কবর খুঁড়ে তাঁদের কঙ্কাল বের করে পুড়িয়ে ফেলে বা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। শুধুমাত্র ন্যায়পরায়ণ খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের কবর তারা অক্ষত রেখেছিল।

স্পেনে উমাইয়ার পুনর্জন্ম: যখন পুরো উমাইয়া বংশকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছিল, তখন খলিফা হিশামের নাতি আবদুর রহমান (যিনি আবদুর রহমান আদ-দাখিল নামে পরিচিত) একাই বেঁচে যান। তিনি আব্বাসীয়দের হাত থেকে বাঁচতে নদী সাঁতরে, মরুভূমি পার হয়ে এবং নিজের পরিচয় লুকিয়ে সিরিয়া থেকে উত্তর আফ্রিকা পৌঁছান। দীর্ঘ ৬ বছরের বিপদসংকুল যাত্রা শেষে তিনি স্পেনে প্রবেশ করেন এবং সেখানে পুনরায় উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।


আরো জানতে ক্লিক করুন- মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)