খলিফা আল-মুস্তাইন বিল্লাহ (৮৬২–৮৬৬ খ্রি.)
খলিফা আলমুস্তাইন বিল্লাহ কোনো উত্তরাধিকার সূত্রে বা জনগণের ইচ্ছায় ক্ষমতায় আসেননি। তাঁর ক্ষমতায় আসা ছিল পুরোপুরি তুর্কি সেনাপতিদের একটি রাজনৈতিক চাল এবং ষড়যন্ত্রের ফল।৮৬২ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আল -মুনতাসির মাত্র ৬ মাস শাসনের পর হঠাৎ মারা যান। তাঁর কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ছিল না যে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে। মুনতাসিরের মৃত্যুর পর প্রভাবশালী তুর্কি সেনাপতি বোগা আল-শারাবি, ওয়াসিফ এবং আতামিশ এক গোপন বৈঠকে বসেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একজনকে খলিফা বানানো, যে তাঁদের হাতের পুতুল হয়ে থাকবে এবং যাঁর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন। মৃত খলিফা মুনতাসিরের ভাইদের (মুতাজ এবং মুয়াইয়াদ) তুর্কিরা বিশ্বাস করত না। কারণ তুর্কিরাই তাদের বাবা আল-মুতাওয়াক্কিলকে হত্যা করেছিল। তুর্কিরা ভয় পাচ্ছিল যে মুতাজ ক্ষমতায় বসলে তাঁর বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেবেন।তুর্কিরা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাঁরা আল-মুতাওয়াক্কিলের বংশধরদের কাউকে ক্ষমতায় বসাবে না।
পরিবর্তে তাঁরা খলিফা আল-মুতাসিমের নাতি এবং আল-মুতাওয়াক্কিলের ভাতিজা আহমদ ইবনে মুহাম্মদকে (যিনি পরে আল-মুস্তাইন নাম নেন) বেছে নেয়।তাঁকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো- তিনি ছিলেন শান্ত স্বভাবের এবং রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। তুর্কিরা ভেবেছিল তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা সবথেকে সহজ হবে।
ক্ষমতা দখল ও বিদ্রোহ: ৮৬২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে তুর্কিরা আল-মুস্তাইনকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু এই ঘোষণা সাধারণ মানুষ এবং বাগদাদের সৈন্যরা মেনে নিতে পারেনি।
বাগদাদ এবং সামাররার সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় আরব সৈন্যরা খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। তাঁর পুত্র আল-মুতাজ ছিলেন জনগণের চোখের মণি। যখন তুর্কিরা আল-মুতাওয়াক্কিলের বংশধরদের বাদ দিয়ে আল-মুস্তাইনকে খলিফা ঘোষণা করল, তখন জনগণ বুঝতে পারল যে এটি একটি গভীর ষড়যন্ত্র।
বাগদাদের একদল সৈন্য এবং সাধারণ মানুষ রাজপ্রাসাদের সামনে জড়ো হয়ে বিদ্রোহ করে। তারা চিৎকার করে বলতে থাকে— আমরা মুতাওয়াক্কিলের বংশধর ছাড়া কাউকে খলিফা মানি না!
উত্তেজিত জনতা সামাররা ও বাগদাদের কিছু সরকারি অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র লুট করে এবং তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।
৮৬২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের মাঝামাঝি এক সকালে হাজার হাজার বিদ্রোহী জনতা এবং কিছু অ-তুর্কি সৈন্য সামাররার রাজপ্রাসাদ জাওসাক আল-খাকানি ঘেরাও করে। জনতা প্রাসাদের ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। তারা তুর্কি সেনাপতি বোগা এবং ওয়াসিফকে 'খলিফা হত্যাকারী' হিসেবে গালি দিতে থাকে। শুরুতে তুর্কিরা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিল, কারণ তারা এত বড় গণ-অভ্যুত্থান আশা করেনি। কিন্তু তারা জানত, ক্ষমতা ছাড়লে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত। যখন বিদ্রোহীরা পিছু হটছিল না, তখন তুর্কি সেনাপতি বোগা আল-শারাবি তাঁর দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী বাহিনীকে নির্দেশ দেন সরাসরি জনতার ওপর হামলা চালাতে।
তুর্কি সৈন্যরা ধারালো তলোয়ার নিয়ে নিরস্ত্র এবং আধা-সশস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাস্তার ওপর শত শত মানুষের লাশ পড়ে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে, সেদিন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৫০০ থেকে ১০০০ জন মানুষ নিহত হয়েছিল।
তুর্কিরা কেবল বিদ্রোহীদের হত্যাই করেনি, বরং যারা পালিয়ে যাচ্ছিল তাদের পেছনে ধাওয়া করে করে হত্যা করে। পুরো সামাররা শহর লাশের স্তূপে পরিণত হয়।
জোরপূর্বক আনুগত্যের শপথ : জনতাকে রক্তক্ষয়ী পন্থায় শান্ত করার পর তুর্কিরা এক অদ্ভুত নাটক সাজায়। তারা শহরের প্রধান আলেম, বিচারক এবং প্রভাবশালী নেতাদের ধরে নিয়ে আসে। তাদের সামনে খলিফা আল-মুস্তাইনকে বসিয়ে রাখা হয়।
তুর্কি সৈন্যরা খোলা তলোয়ার নিয়ে নেতাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের বলা হয়— হয় আল-মুস্তাইনের হাতে আনুগত্যের শপথ নাও, না হয় এখনই মাথা হারাবে। প্রাণভয়ে সবাই আল-মুস্তাইনকে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়।
রাজকোষ লুণ্ঠন ও তুর্কিদের তুষ্ট করা: খলিফা হওয়ার পর আল-মুস্তাইনের প্রথম কাজ ছিল তুর্কি সেনাপতিদের তুষ্ট করা। তিনি সিংহাসনে আরোহণের পরপরই তিনি রাজকোষের সিংহভাগ অর্থ তুর্কি সেনাপতি বোগা, ওয়াসিফ এবং তাঁদের অনুগত সৈন্যদের কয়েক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেন। এর ফলে তাঁর শাসন শুরুই হয় আর্থিক দুর্বলতা মধ্য দিয়ে।
খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের রেখে যাওয়া মূল্যবান রত্নভাণ্ডার এবং দামি আসবাবপত্রও তুর্কিদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব ট্যাক্স কালেকশন সেন্টার এবং গভর্নর পদগুলো তুর্কিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে খলিফার হাতে দৈনন্দিন খরচ চালানোর মতো টাকাও অবশিষ্ট ছিল না।
তুর্কি সেনাপতিদের নিয়ন্ত্রণ ও বিবাদ: তৎকালীন আব্বাসীয় খেলাফতে তুর্কি রক্ষীবাহিনীর প্রভাব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে খলিফারা তাদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। তুর্কি সেনাপতিদের নিজেদের মধ্যে (বিশেষ করে বোগা আল-শারাবি এবং ওয়াসিফ) দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছালে খলিফা নিজেকে অত্যন্ত অনিরাপদ মনে করতে শুরু করেন। সামাররায় অবস্থানকালে তুর্কি সেনারা খলিফার প্রাসাদে হামলা চালায় এবং তাকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। তারা খলিফার পরিবর্তে তাদের পছন্দের কাউকে ক্ষমতায় বসাতে চাইছিল। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আল-মুস্তাইন বুঝতে পারেন যে সামাররায় থাকা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু বা বন্দিত্ব।
৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে সামাররায় তুর্কিদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চাপে অতিষ্ঠ হয়ে আল-মুস্তাইন গোপনে বাগদাদে পালিয়ে যান।বাগদাদ ছিল খেলাফতের পুরনো রাজধানী এবং সেখানে তুর্কিদের তুলনায় স্থানীয় আরব ও পারস্য বংশোদ্ভূত বনু হাশিমদের প্রভাব বেশি ছিল। খলিফা আশা করেছিলেন বাগদাদে গেলে তিনি তুর্কিদের শ্বাসরুদ্ধকর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হতে পারবেন ও বাগদাদের জনসাধারণের এবং তাহিরীয় বংশীয় গভর্নরদের সামরিক সমর্থন পাবেন। আল-মুস্তাইন চেয়েছিলেন তুর্কি জেনারেলদের প্রভাব কাটিয়ে স্বাধীনভাবে শাসনকাজ পরিচালনা করতে। তিনি ভেবেছিলেন সামাররা (যা মূলত তুর্কিদের সামরিক ঘাঁটি ছিল) ত্যাগ করলে তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা ফিরে পাবেন।
আল-মুস্তাইন গোপনে বাগদাদে পালিয়ে যাওয়ায় সামাররার তুর্কিরা এতে ক্ষিপ্ত হয় এবং তারা আল-মুতাওয়াক্কিলের পুত্র আল-মুতাজকে নতুন খলিফা ঘোষণা করে।সামাররার তুর্কি বাহিনী এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বাগদাদ ঘেরাও করে। প্রায় এক বছর ধরে চলা এই অবরোধে বাগদাদে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। নিরুপায় হয়ে এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব করতে ৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে আল-মুস্তাইন একটি চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতা ত্যাগে রাজি হন।
ঘাতকের হাতে শিরচ্ছেদ: চুক্তি অনুযায়ী আল-মুস্তাইনকে মদিনায় সসম্মানে থাকতে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন খলিফা আল-মুতাজ এবং তুর্কিরা তাঁকে জীবিত রাখা নিরাপদ মনে করেনি। যখন তাঁকে মদিনার পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন কাতিসিয়া নামক স্থানে তাঁকে আটকে দেওয়া হয়। তুর্কি ঘাতক আহমেদ ইবনে তুলুন (যিনি পরে মিশরের বিখ্যাত তুলুনিদ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন) তাঁকে হত্যার নির্দেশ পান। আল-মুস্তাইন তখন কুরআন
তেলাওয়াত করছিলেন।ঘাতক তলোয়ারের এক আঘাতে তাঁর শিরচ্ছেদ করে।ঐতিহাসিকদের মতে, আল-মুস্তাইনের কাটা মাথাটি একটি থলিতে ভরে সামাররায় খলিফা আল-মুতাজের দরবারে পাঠানো হয়। আল-মুতাজ তখন দাবার ছকে মগ্ন ছিলেন। তিনি মাথাটি একপাশে সরিয়ে রেখে খেলা শেষ করেন এবং এরপর সেটি দাফন করার আদেশ দেন।
(মন্তব্য) খলিফা আল-মুস্তাইন বিল্লাহর চার বছরের শাসন ও তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পুতুল খিলাফতের এক ক্লাসিক ট্র্যাজেডি। যে পবিত্র খিলাফতের ভিত্তি ছিল জনগণের রায় ও ন্যায়বিচার, তুর্কি রক্ষীবাহিনীর উত্থানের পর তা কেবল ষড়যন্ত্র আর তরবারির জোরে নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করে। আল-মুস্তাইন খলিফা হয়েছিলেন জনগণের ইচ্ছায় নয়, বরং তুর্কি জেনারেলদের হাতের পুতুল হিসেবে।
বাস্তবতা হলো, চাটুকার বা স্বার্থান্বেষী মহলের কাঁধে ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। রাজকোষ লুণ্ঠন করে তুর্কিদের তুষ্ট করার যে আত্মঘাতী নীতি তিনি নিয়েছিলেন, তা খিলাফতকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। পরবর্তীতে স্বাধীনভাবে শাসন করার জন্য সামাররা থেকে তাঁর বাগদাদে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল একটি সাহসী কিন্তু অনেক দেরিতে নেওয়া পদক্ষেপ।
ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডি ফুটে ওঠে তাঁর মৃত্যুর দৃশ্যে। যে খলিফা পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় ঘাতকের হাতে প্রাণ হারালেন, তাঁর কাটা মাথা দেখে পরবর্তী খলিফা আল-মুতাজের দাবা খেলায় মগ্ন থাকা—শাসক গোষ্ঠীর চরম অমানবিকতা ও ক্ষমতার লালসাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, যখন কোনো রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বা রক্ষীবাহিনী মূল ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে, তখন খলিফাদের জীবন ও সম্মান দাবার ঘুঁটির মতোই সস্তা হয়ে যায়।

Comments
Post a Comment