উসমান ইবনে আফফান (রা.)ইসলামের তৃতীয় খলিফা: (৬৪৪-৬৫৬ খ্রি.)
হযরত ওমর (রা.) এর শাহাদাতের পর ইসলামের তৃতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) তাঁর সময়েই মুসলিম বাহিনী প্রথমবারের মতো সমুদ্র জয় করে এবং তিনটি মহাদেশে ইসলামের পতাকা ওড়াতে সক্ষম হয়। তাঁর শাসনকাল ছিল ইসলামের ইতিহাসের দীর্ঘতম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শাসনকাল ও উল্লেখযোগ্য অর্জনসমূহ : হযরত উসমান (রা.)-এর শাসনামলকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ৬ বছর ছিল চরম শান্তি ও বিজয়ের, আর শেষ ৬ বছর কিছু অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল।
তাঁর সময়ে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের একাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তিনি আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান, ককেশাস অঞ্চল এবং উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া ও তিউনিসিয়া জয় করেন।
খলিফা উমর (রা.)-এর সময়ে মিশর বিজয় সম্পন্ন হলেও, উসমান (রা.)-এর আমলে ইসলামি বাহিনী আরও পশ্চিমে অগ্রসর হয়। সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া এবং তিউনিসিয়া (তৎকালীন ইফ্রিকিয়া) জয় করেন। বিশেষ করে 'সুবেতলার যুদ্ধে' রোমান গভর্নর গ্রেগরিকে পরাজিত করার মাধ্যমে এই বিশাল অঞ্চল মুসলমানদের অধীনে আসে। উত্তর আফ্রিকার এই বিজয়গুলোই পরবর্তীতে উমাইয়া আমলে স্পেন (ইউরোপ) জয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, উসমান (রা.)-এর আমলেই কিছু মুসলিম সেনাদল ইউরোপের স্পেনের উপকূলে প্রথম পদার্পণ করেছিল।
মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের দিকে উমর (রা.)-এর সময়ে শুরু হওয়া পারস্য বিজয়ের কাজ উসমান (রা.)-এর আমলে পূর্ণতা পায়। তিনি সাম্রাজ্যের সীমানাকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যান। তাঁর নির্দেশে মুসলিম বাহিনী বর্তমান আফগানিস্তান, বলখ, হেরাত এবং কাবুল জয় করে। এরপর তারা উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে আমু দরিয়া পার হয়ে তুর্কিস্তানের তুর্কি রাজাদের পরাজিত করে। এর ফলে মার্ভ ও নিসহাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো ইসলামি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুসলমানরা বর্তমান আজারবাইজান, আর্মেনিয়া এবং ককেশাস অঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে অভিযান চালায়। এর ফলে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে শুরু করে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত ইসলামের ছায়া বিস্তৃত হয়।
নৌবাহিনী গঠন ও ভূমধ্যসাগর বিজয়:সিরিয়ার তৎকালীন গভর্নর আমীর মুয়াবিয়া (রা.) উপলব্ধি করেন যে, রোমানদের শক্তিশালী নৌ-আক্রমণ থেকে উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা করতে হলে মুসলমানদের নিজস্ব জাহাজ প্রয়োজন। খলিফা উসমান (রা.) দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর কঠোর শর্তসাপেক্ষে নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি দেন।তার আমলে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল ইসলামি নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা। এর আগে মুসলমানরা কেবল স্থলের যুদ্ধে অভ্যস্ত ছিল। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নৌবাহিনী গঠিত করেন তিনি। ৬৪৯ খ্রি. নবগঠিত এই নৌবাহিনী নিয়ে মুসলমানরা ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ সাইপ্রাস অভিযান চালায়। এটি ছিল মুসলমানদের প্রথম সফল সামুদ্রিক যুদ্ধ। এই বিজয়ের ফলে রোমানদের একচ্ছত্র নৌ-আধিপত্য খর্ব হয় এবং ভূমধ্যসাগরে মুসলমানদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো পুরো মুসলিম বিশ্বে কুরআনের একটি অভিন্ন পাঠ বা সংস্করণ নির্ধারণ করা। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের উচ্চারণের ভিন্নতা দূর করতে তিনি মূল পাণ্ডুলিপি থেকে কপি করে সব প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। এ কারণে তাঁকে জামেউল কুরআন বা কুরআন একত্রকারী বলা হয়।
তিনি অত্যন্ত ধনী ও দানশীল ছিলেন (এজন্য তাঁকে গণি বলা হতো)। তিনি নিজ উদ্যোগে অসংখ্য খাল খনন, মসজিদ নির্মাণ এবং জনগণের পানির কষ্ট দূর করতে কূপ খনন করেন। তাঁর সময়ে আরবে অর্থনৈতিক জোয়ার এসেছিল।
শেষদিকের পরিস্থিতি:
কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও মুনাফিকদের (যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা) অপপ্রচার।তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা (যদিও তিনি যোগ্যদেরই নিয়োগ দিয়েছিলেন)।মদিনার বাইরে থেকে আসা বিদ্রোহীদের নানা দাবি ও বিশৃঙ্খলা।
আত্মীয়দের নিয়োগ ও এর পেছনের যুক্তি -
হযরত উসমান (রা.) তাঁর আমলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিজের বংশের (বনু উমাইয়া) লোকদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। যেমন-সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে মুয়াবিয়া (রা.) এবং মিশরের গভর্নর হিসেবে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারাহ। এর পেছনে তাঁর কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল-যাদের তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন, তারা আগে থেকেই প্রশাসনিক কাজে দক্ষ ছিলেন। যেমন, মুয়াবিয়া (রা.) হযরত ওমর (রা.)-এর আমল থেকেই সিরিয়ার দায়িত্বে ছিলেন।তিনি মনে করেছিলেন আত্মীয়দের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনা করা সহজ হবে এবং তারা তাঁর প্রতি বেশি অনুগত থাকবে।হযরত উসমান (রা.) অত্যন্ত দয়ালু ও নরম হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর আত্মীয়রা যেন জনকল্যাণে কাজ করার সুযোগ পায়।তবে এই বিষয়শাসনামলের টিকেই বিরোধীরা স্বজনপ্রীতি হিসেবে প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে শুরু করে।
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার চক্রান্ত :
বিদ্রোহের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক এক ব্যক্তির। সে ছিল একজন ইহুদি, যে ছদ্মবেশে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সে আরবের বিভিন্ন প্রদেশে (বিশেষ করে মিশর, কুফা ও বসরায়) ঘুরে ঘুরে খলিফার বিরুদ্ধে বিষোদগার ছড়াতে থাকে। সে সাধারণ মানুষকে বোঝাত যে, উসমান (রা.) খিলাফতের অযোগ্য এবং তিনি নবীজির সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন (নাউযুবিল্লাহ)। তার এই অপপ্রচার একদল অশিক্ষিত ও আবেগপ্রবণ মানুষকে খলিফার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে।
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন:
হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামল ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি গভর্নরদের ওপর কড়া নজর রাখতেন কিন্তু,হযরত উসমান (রা.) ছিলেন তুলনায় অনেক উদার ও দয়ালু। এই সুযোগে কিছু অসাধু লোক ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এছাড়া সাম্রাজ্য বড় হওয়ার ফলে নতুন বিজিত অঞ্চলের মানুষেরা মদিনার কেন্দ্রীয় শাসনের ওপর অসন্তুষ্ট হতে শুরু করে।
বিদ্রোহের চরম পর্যায় ও শাহাদাত:
বিদ্রোহীরা মিশর ও কুফা থেকে এসে মদিনা ঘেরাও করে। তারা দাবি করে যে, খলিফাকে পদত্যাগ করতে হবে। কিন্তু হযরত উসমান (রা.) বলেছিলেন,আল্লাহ আমাকে যে পোশাক (খিলাফত) পরিয়েছেন, আমি নিজ থেকে তা খুলব না।তিনি চাইলেই সাহাবীদের নিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি চাননি তাঁর কারণে মদিনার পবিত্র মাটিতে কোনো মুসলমানের রক্ত ঝরুক। তিনি এমনকি সাহাবীদের যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন।
শাহাদাত (মৃত্যু : হযরত উসমান (রা.)-এর মৃত্যু ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বিদ্রোহীরা তাঁর বাড়ি দীর্ঘ ৪০ দিন অবরুদ্ধ করে রাখে এবং পানি পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। ৩৫ হিজরির ১৮ জিলহজ,একদল বিদ্রোহী তাঁর বাড়ির দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে।তিনি তখন পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সেই অবস্থাতেই বিদ্রোহীরা তাঁকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে শহীদ করে।তলোয়ারের আঘাতে তাঁর পবিত্র রক্ত কুরআনের সেই আয়াতের ওপর পড়েছিল— "ফাসাইয়াকফিকাহুমুল্লাহ" (তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট)।তাঁকে মদিনার জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮২ বছর।
Comments
Post a Comment