উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মদিনায় এক চরম অরাজকতা তৈরি হয়। বিদ্রোহীরা শহর দখল করে নেয়। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে সাহাবীদের অনুরোধে হযরত আলী (রা.) চতুর্থ খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।ইসলামের ইতিহাসে হযরত আলী (রা.)-এর শাসনকাল (৬৫৬-৬৬১ খ্রিস্টাব্দ) ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং ঘটনাবহুল সময়। হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর এক চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণ ও তৎকালীন ভয়াবহ পরিস্থিতি :
হযরত উসমান (রা.)-এর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর মদিনায় কোনো কার্যকর সরকার ছিল না। বিদ্রোহীরা শহর দখল করে রেখেছিল। এমন এক অরাজক পরিস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরাম হযরত আলী (রা.)-কে খলিফা হওয়ার অনুরোধ করেন। শুরুতে তিনি রাজি না হলেও উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচার করা। কিন্তু হত্যাকারীরা বিদ্রোহী বাহিনীর সাথে মিশে থাকায় এবং তাদের শক্তি অনেক বেশি হওয়ায় আলী (রা.) তৎক্ষণাৎ বিচার শুরু করতে পারেননি। তিনি চাইলেন আগে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু অনেক সাহাবী চাইলেন আগে বিচার। এই মতভেদ থেকেই ফিতনার সূত্রপাত হয়।
প্রশাসনিক পরিবর্তন ও গভর্নরদের অপসারণ :
হযরত আলী (রা.) খলিফা হওয়ার পরপরই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আনার জন্য হযরত উসমান (রা.)-এর সময়ে নিযুক্ত অনেক গভর্নরকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শাসনব্যবস্থায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করা। কিন্তু সিরিয়ার শক্তিশালী গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এই আদেশ মানতে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন যে, যতক্ষণ উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচার না হবে, ততক্ষণ তিনি আলীর আনুগত্য করবেন না। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে একটি প্রদেশের বিরোধ চরমে পৌঁছায়।
উটের যুদ্ধ :এটি ছিল মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত প্রথম বড় যুদ্ধ। হযরত আয়েশা (রা.), তালহা (রা.) এবং জুবায়ের (রা.) উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে মক্কা থেকে বসরার দিকে রওনা হন। হযরত আলী (রা.) পরিস্থিতি শান্ত করতে তাদের মুখোমুখি হন। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার পথে ছিল, কিন্তু গভীর রাতে একদল তৃতীয় পক্ষ (যারা উসমানের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল) দুই বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে দেয়। ফলে ভুল বোঝাবুঝি থেকে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা.) একটি উটের পিঠে বসে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করছিলেন বলে একে উটের যুদ্ধ বলা হয়। যুদ্ধে আলী (রা.) বিজয়ী হন এবং তিনি অত্যন্ত সম্মানের সাথে হযরত আয়েশা (রা.)-কে মদিনায় পাঠিয়ে দেন।
সিফফিনের যুদ্ধ ও সালিশি ব্যবস্থা :হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে বিরোধ মেটাতে আলী (রা.) এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ফোরাত নদীর তীরে সিফফিন নামক স্থানে পৌঁছান। সেখানে দুই বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চলে। যখন আলী (রা.)-এর বাহিনী জয়ের খুব কাছে, তখন মুয়াবিয়া (রা.)-এর সৈন্যরা বর্শার মাথায় কুরআন বেঁধে শান্তি ও সালিশির আহ্বান জানায়। আলী (রা.) যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সালিশিতে রাজি হন। কিন্তু এই সালিশি প্রক্রিয়ার ফলাফল কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিভেদ তৈরি করে।
খারেজী সম্প্রদায়ের উত্থান ও গৃহযুদ্ধ :সিফফিনের যুদ্ধে সালিশি মেনে নেওয়ায় আলী (রা.)-এর বাহিনীর একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে দলত্যাগ করে। এদের বলা হয় খারেজী (দলত্যাগী)। তাদের দাবি ছিল, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ফয়সালা মানা যাবে না। তারা আলী (রা.) এবং মুয়াবিয়া (রা.)—উভয়কেই কাফের ঘোষণা করে (নাউযুবিল্লাহ) এবং সাধারণ মুসলমানদের হত্যা করতে শুরু করে। আলী (রা.) বাধ্য হয়ে তাদের বিরুদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধ করেন এবং তাদের দমন করেন। তবে কিছু খারেজী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, যারা পরে তাঁর ওপর হামলার পরিকল্পনা করে।
হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাত:৪০ হিজরির ১৭ বা ১৯ রমজান ৬৬১ খ্রিস্টাব্দ, কুফার মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ার সময় খারেজী ঘাতক আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম বিষাক্ত তলোয়ার দিয়ে হযরত আলী (রা.)-এর মাথায় আঘাত করে। এই ঘটনার তিন দিন পর ২১শে রমজান ইসলামের এই শ্রেষ্ঠ বীর এবং জ্ঞানের দরজা শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৬৩ বছর। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীন-এর গৌরবময় ৩০ বছরের শাসনের সমাপ্তি ঘটে।হযরত আলী (রা.)-এর ৫ বছরের শাসনকাল ছিল মূলত অভ্যন্তরীণ ফিতনা দমনের লড়াই। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ইসলামের ন্যায়বিচার এবং সাহসিকতার যে উদাহরণ রেখে গেছেন, তা চিরস্মরণীয়।
Comments
Post a Comment