হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.): ( ৬৬১ খ্রি.)
হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর ইসলামের ইতিহাসে এক অত্যন্ত সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়। তাঁর বড় ছেলে হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.) খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকাল সংক্ষিপ্ত হলেও মুসলিম উম্মাহকে এক বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে বাঁচানোর জন্য তাঁর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়।
খিলাফতে অভিষেক ও সময়কাল:হযরত আলী (রা.)-এর মৃত্যুর পর ৪০ হিজরিতে কুফাবাসী এবং তাঁর অনুসারীরা হযরত হাসান (রা.)-এর হাতে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসে পঞ্চম খলিফা হিসেবে গণ্য হন (যদিও অনেক ঐতিহাসিক তাঁকে খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্তর্ভুক্ত করেন)। তিনি মাত্র ৬ মাস খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন। এই অল্প সময়েই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে বিভেদ তৈরি হয়েছে, তা অস্ত্রের মাধ্যমে সমাধান করলে কেবল মুসলিমদের রক্তই ঝরবে।
হযরত হাসান (রা.) দায়িত্ব নেওয়ার পর সিরিয়ার গভর্নর আমীর মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর আনুগত্য করতে অস্বীকার করেন। মুয়াবিয়া (রা.) এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ইরাকের দিকে অগ্রসর হন। হাসান (রা.)-ও পাল্টা প্রতিরক্ষা হিসেবে একটি বাহিনী পাঠান। উভয় বাহিনী সামনা-সামনি হয় এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর নাতি হযরত হাসান (রা.) ছিলেন শান্তিকামী। তিনি জানতেন, এই যুদ্ধ শুরু হলে হাজার হাজার সাহাবী ও মুসলিম প্রাণ হারাবেন।
হযরত হাসান (রা.) ব্যক্তিগত ক্ষমতা বা পদের চেয়ে মুসলিমদের ঐক্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। ৪১ হিজরিতে (৬৬১ খ্রিস্টাব্দ) উভয় পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল-
1. হযরত হাসান (রা.) জনকল্যাণ ও শান্তির স্বার্থে খিলাফতের দায়িত্ব হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে হস্তান্তর করবেন।
2. মুয়াবিয়া (রা.) অবশ্যই পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
3. মুয়াবিয়া (রা.) নিজের ইচ্ছামতো কাউকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে পারবেন না। তাঁর মৃত্যুর পর খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহর (শুরা কমিটির) ওপর ন্যাস্ত থাকবে।
4. হযরত আলী (রা.)-এর অনুসারী এবং সাধারণ মানুষের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। কারও ওপর প্রতিশোধ নেওয়া যাবে না।
5. ফার বাইতুল মাল থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ এবং নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের রাজস্ব হযরত হাসান (রা.) ও তাঁর পরিবারের জন্য বরাদ্দ থাকবে।
হযরত হাসান (রা.) যেদিন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, সেই বছরটিকে ইসলামের ইতিহাসে আমুল জামা'আহ বা ঐক্যের বছর বলা হয়। কারণ, তাঁর এই মহান ত্যাগের ফলে পাঁচ বছরের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং পুরো মুসলিম বিশ্ব পুনরায় একজন নেতার অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়। এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিফলন। নবীজি (সা.) হাসানকে কোলে নিয়ে একবার বলেছিলেন:-
আমার এই সন্তান একজন নেতা (সাইয়্যিদ), আল্লাহ তার মাধ্যমে মুসলিমদের দুটি বড় দলের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন।
ক্ষমতা হস্তান্তরের পর হযরত হাসান (রা.) সপরিবারে মদিনায় চলে যান এবং সেখানে ইবাদত ও দ্বীনি কাজে আত্মনিয়োগ করেন। অন্যদিকে মুয়াবিয়া (রা.) দামেস্ক থেকে পুরো মুসলিম বিশ্ব শাসন করতে থাকেন।
হযরত হাসান (রা.)-এর শাহাদাত:হযরত হাসান (রা.)-এর শাহাদাত ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম একটি ট্র্যাজিক বা বেদনাদায়ক ঘটনা। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তিনি মদিনায় অত্যন্ত শান্তিতে এবং ইবাদত-বন্দেগিতে জীবন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত হাসান (রা.)-কে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পর্দার আড়ালে গভীর ষড়যন্ত্র চলছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর ছেলে ইয়াজিদকে মনোনীত করার পথে হাসান (রা.) ছিলেন একটি বড় বাধা। কারণ, হাসান (রা.)-এর সাথে মুয়াবিয়া (রা.)-এর চুক্তিতে ছিল যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর পর খিলাফত হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হাসান (রা.)-কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। হযরত হাসান (রা.)-এর স্ত্রী জাদা বিনতে আশআথ -কে এই ষড়যন্ত্রে প্ররোচিত করা হয়েছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, জাদাকে প্রচুর অর্থ এবং মুয়াবিয়া (রা.)-এর ছেলে ইয়াজিদের সাথে বিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এই জঘন্য কাজে রাজি করানো হয়। জাদা তাঁর নিজের স্বামীর খাবারে বা পানীয়তে মারাত্মক বিষ মিশিয়ে দেন।বিষপ্রয়োগের বিষয়টি একবারেই ঘটেনি; এর আগেও কয়েকবার তাঁকে বিষ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষবারের বিষটি ছিল অত্যন্ত তীব্র। বর্ণিত আছে যে, এই বিষের প্রভাবে তাঁর কলিজার অংশ বিশেষ টুকরো টুকরো হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে। দীর্ঘ দিন তিনি এই অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেন এবং অবশেষে ৫০ হিজরির ৫ই রবিউল আউয়াল (৬৭০ খ্রিস্টাব্দ) তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
যখন হাসান (রা.) মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখন তাঁর ছোট ভাই হযরত হুসাইন (রা.) তাঁর কাছে এসে জানতে চেয়েছিলেন— ভাই, আপনাকে কে বিষ দিয়েছে তার নাম বলুন, আমি তার বদলা নেব।উত্তরে ধৈর্যশীল এবং শান্তিকামী হযরত হাসান (রা.) বলেছিলেন-যদি আমার ধারণা সঠিক হয় (অর্থাৎ যাকে আমি সন্দেহ করছি), তবে আল্লাহর কাছে বিচার হবে সবচেয়ে কঠিন। আর যদি আমার ধারণা ভুল হয়, তবে আমি চাই না আমার কারণে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি পাক। তিনি তাঁর ভাইকে প্রতিশোধ নিতে নিষেধ করেছিলেন যাতে মুসলিমদের মধ্যে আবার রক্তপাত না হয়।
Comments
Post a Comment