ক্ষমতার শেষ প্রদীপ: আর-রাজি বিল্লাহ: (৯৩৪–৯৪০ খ্রি.)
খলিফা আল-কাহিরকে অন্ধ করে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, তুর্কিরা আল-মুক্তাদিরের পুত্র আর-রাজি বিল্লাহ-কে খিলাফতের বিংশতম খলিফা হিসেবে সিংহাসনে বসায়। ঐতিহাসিকরা তাঁকে আব্বাসীয়দের শেষ প্রকৃত খলিফা বলে মনে করেন, কারণ তাঁর পর থেকে খলিফার শাসন করার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
শাসনকাল ও সীমানা সংকোচন: আর-রাজির শাসনামলে আব্বাসীয় মানচিত্র এতটাই সংকুচিত হয়েছিল যে, খলিফার আদেশ বাগদাদ শহরের বাইরে খুব কমই কার্যকর হতো। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে তখন শক্তিশালী রাজবংশগুলো স্বাধীনভাবে শাসন করছিল-
1. মিশর ও সিরিয়া: ইখশিদীয় রাজবংশ সেখানে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
2. পারস্য ও ইরান: বুয়াইদ এবং জিয়ারীয়রা সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে পড়ে।
3. উত্তর আফ্রিকা: ফাতেমীয় খিলাফত একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়, যারা আব্বাসীয়দের ধর্মীয় বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করে।
4. মসুল ও মেসোপটেমিয়া: হামদানী রাজবংশ নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে।
খলিফা আর-রাজি কার্যত বাগদাদ এবং তার পার্শ্ববর্তী ওয়াসেত ও বসরা এলাকার ওপর নামমাত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। রাজস্ব
আদায়ের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার কারণে খিলাফতের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে ।
1. যেহেতু বেশিরভাগ প্রদেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল, তাই বাগদাদে কেন্দ্রীয় কর আসা বন্ধ হয়ে যায়।
2. সৈন্যদের নিয়মিত বেতন দেওয়ার মতো অর্থ রাজকোষে ছিল না। ফলে তারা প্রায়ই বিদ্রোহ করত এবং রাজপ্রাসাদ ঘেরাও করত।
3. কর্মচারীদের বেতন এবং প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় খলিফাকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে জরুরি খরচ মেটাতে হয়েছে।
ক্ষমতার হস্তান্তর:
আর্থিক ও সামরিক এই বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে আর-রাজি ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে একটি ঐতিহাসিক কিন্তু আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর সেনাপতি ইবনে রাইককে আমির
আল-উমারা (প্রধান সেনাপতি বা আমীরদের আমীর) উপাধি দেন। এই পদের ফলে খলিফার সমস্ত নির্বাহী ক্ষমতা, সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আমীরের হাতে চলে যায়। খলিফা কেবল জুমার খুতবায় নিজের নাম পাঠ করা এবং মুদ্রায় নাম রাখার মতো আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পড়েন। খলিফার নিজের পকেট খরচ বা প্রাসাদের হিসাবও এই আমীরুল উমারা'র অনুমোদনে চলত।
আর-রাজির শাসনের কিছু অনন্য দিক:
1.
তিনিই ছিলেন শেষ আব্বাসীয় খলিফা যিনি জুমার খুতবা নিজে পড়তেন এবং যাঁর খুতবা মানুষ মনোযোগ দিয়ে শুনত।
2.
তাঁর আগে খলিফারা কাব্যচর্চা ও সাহিত্য করতেন। আর-রাজি ছিলেন এই ধারার শেষ খলিফা যাঁর নিজের রচিত দেওয়ান বা কাব্যসংকলন ছিল।
3.
তিনিই শেষবারের মতো আমলাদের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর উত্তরসূরিদের সেই সুযোগও আর ছিল না।
শাসনকালের প্রধান বিপর্যয়সমূহ
-মৃত্যু ও উত্তরাধিকার:
1. কারমাতিয়রা তখনো হজ কাফেলা এবং ইরাকের বিভিন্ন শহরে লুটতরাজ চালাচ্ছিল, কিন্তু খলিফা বা তাঁর আমীরুল উমারা তাদের থামাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন।
2. রোমানরা একের পর এক সীমান্ত শহর দখল করে নিচ্ছিল, যা খিলাফতের দুর্বলতাকে পুরো বিশ্বের সামনে তুলে ধরে।
৯৪০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৩০ বছর বয়সে খলিফা আর-রাজি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু ছিল একটি যুগের অবসান। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই আল-মুত্তাকি লিল্লাহ (৯৪০–৯৪৪ খ্রি.) খলিফা হন। কিন্তু আল-মুত্তাকির অবস্থা ছিল আরও করুণ। তিনি ছিলেন বিভিন্ন সেনাপতির হাতের ফুটবল।
আরো জানতে ক্লিক করুন: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

Comments
Post a Comment