আল-কাহির বিল্লাহ: (৯৩২–৯৩৪ খ্রি.) আব্বাসীয় খিলাফতের এক বিষাদময় ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়

 



খলিফা আল-মুক্তাদিরের সেই করুণ মৃত্যুর পর তাঁর ভাই আল-কাহির বিল্লাহ (৯৩২–৯৩৪ খ্রি.) আব্বাসীয় খিলাফতের ঊনবিংশতম খলিফা হিসেবে ক্ষমতায় বসেন। তিনি ছিলেন একাধারে অত্যন্ত নিষ্ঠুর, সাহসী এবং খামখেয়ালি একজন শাসক। খলিফা আল-মুক্তাদিরকে হত্যার পর সেনাপতি মুনিস আল-মুজাফফর এবং অন্য তুর্কি কর্মকর্তারা আল-মুক্তাদিরের ভাই জাফরকে বেছে নেন,

যিনি আল-কাহির বিল্লাহ (আল্লাহর ইচ্ছায় বিজয়ী) নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তুর্কিরা ভেবেছিল আল-কাহিরও তাঁর ভাইয়ের মতো তাঁদের হাতের পুতুল হয়ে থাকবেন। কিন্তু আল-কাহির ছিলেন ধূর্ত এবং প্রতিশোধপরায়ণ।

মুনিসের পতন: আব্বাসীয় খিলাফতের ইতিহাসে মুনিস আল-মুজাফফর ছিলেন এক কিংবদন্তি অথচ বিতর্কিত চরিত্র। প্রায় তিন দশক ধরে পর্দার আড়াল থেকে সাম্রাজ্য চালানো এই কিংমেকার সেনাপতির পতন ছিল অত্যন্ত নাটকীয় এবং রক্তক্ষয়ী। তিনি খলিফা আল-মুক্তাদিরকে সিংহাসনচ্যুত ও হত্যা করে তাঁর ভাই আল-কাহিরকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। মুনিস ভেবেছিলেন আল-কাহির তাঁর হাতের পুতুল হয়ে থাকবেন। কিন্তু আল-কাহির ছিলেন প্রচণ্ড জেদি এবং স্বাধীনচেতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মুনিস বেঁচে থাকলে তাঁর নিজের জীবন ও ক্ষমতা—দুই-ই হুমকির মুখে।

আল-কাহির জানতেন সরাসরি যুদ্ধে মুনিসকে হারানো অসম্ভব। তাই তিনি কূটনীতির আশ্রয় নেন। তিনি মুনিস, তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী উজির ইবনে মুকলা এবং সেনাপতি ইয়ালবাককে আলোচনার অছিলায় রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান।মুনিস ও তাঁর সঙ্গীরা খলিফাকে দুর্বল মনে করে কোনো সতর্কতা ছাড়াই প্রাসাদে প্রবেশ করেন। কিন্তু তারা জানতেন না যে, খলিফা আগেই তাঁর অনুগত সাজাজি রক্ষীবাহিনীকে প্রাসাদের ভেতরে ওঁত পেতে থাকার নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন।

মুনিস ও ইয়ালবাক প্রাসাদে ঢোকামাত্রই খলিফার গুপ্তঘাতকরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের বন্দি করা হয়। আল-কাহির মুনিসকে তাঁর ভাই আল-মুক্তাদিরের হত্যার জন্য দায়ী করেন।৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে খলিফার নির্দেশে মুনিস আল-মুজাফফরকে হত্যা করা হয়। আল-কাহির এই হত্যার মাধ্যমে একটি কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। মুনিসের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং তাঁর মরদেহ টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে অনেক ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন।

শাসনকাল: মুনিসকে সরানোর পর আল-কাহির একক ক্ষমতা হাতে নেন, কিন্তু তাঁর শাসন ছিল সাধারণ মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম।মুনিসের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আল-কাহিরের অনুকূলে আসার বদলে আরও জটিল হয়ে ওঠে।মুনিসকে হত্যার মাধ্যমে আল-মুক্তাদিরের রক্তের বদলা নেওয়া হলেও, এটি সেনাসদস্যদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে।মুনিসকে সরানোর পর আল-কাহির অত্যন্ত নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেন। তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদের ওপরও নির্যাতন শুরু করেন।প্রয়াত খলিফা আল-মুক্তাদিরের মা শাগাব-কে  (সৎ মা) তিনি বন্দি করেন এবং তাঁর সমস্ত সম্পদ হস্তগত করার জন্য তাঁকে ঝুলিয়ে রেখে শারীরিক নির্যাতন করেন।তিনি আল-মুক্তাদিরের সন্তানদের (নিজের ভাতিজা) এবং নিজের অন্য ভাইদের শত্রু মনে করতেন। অনেককে তিনি প্রাসাদের ভেতরেই অনাহারে ও অন্ধ ঘরে আটকে রেখেছিলেন।

মুনিসের পতনের পর তাঁর অনুগত সেনাপতি এবং কর্মকর্তাদের ওপরও আল-কাহির খড়গহস্ত হন ।মুনিসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইয়ালবাক এবং তাঁর পুত্রকে হত্যা করা হয়।মুনিসের অনুগত বাহিনীর (মালিকি ও সাজাজি বাহিনী) ক্ষমতা খর্ব করতে তিনি ব্যাপক ধরপাকড় চালান।

আল-কাহির কেবল নিজের পরিবার নয়, সাধারণ জনগণের কাছেও অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সবসময় নিজের সাথে একটি ছোট কুঠার রাখতেন, যা দিয়ে তিনি যেকোনো সময় কাউকে আঘাত বা হত্যা করতে দ্বিধা করতেন না। আল-কাহির প্রকাশ্যে মদ পান করতেন এবং ইসলামি বিধানের তোয়াক্কা করতেন না। তাঁর খামখেয়ালি আচরণের কারণে উজির ও আমলারা সবসময় প্রাণভয়ে থাকতেন।

তাঁর নিষ্ঠুরতা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তুর্কি রক্ষীবাহিনী এবং প্রাসাদের কর্মকর্তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে সৈন্যরা রাজপ্রাসাদ ঘেরাও করে তাঁকে বন্দি করে। তারা তাঁকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বলে, কিন্তু তিনি অস্বীকার করেন।শাস্তি হিসেবে এবং যাতে তিনি আর কোনোদিন খলিফা হতে না পারেন, সেজন্য তুর্কিরা তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে তাঁর দুই চোখ অন্ধ করে দেয়। খিলাফতের ইতিহাসে তিনি ছিলেন প্রথম খলিফা যাঁকে অন্ধ করা হয়েছিল।

পরবর্তী জীবন ও মৃত্যু: আল-কাহিরের জীবনের শেষ অংশটি ছিল আরও মর্মান্তিক। ক্ষমতা হারানোর পর তিনি দীর্ঘ ১১ বছর বেঁচে ছিলেন।প্রচলিত আছে যে, অন্ধ অবস্থায় তিনি বাগদাদের বড় মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে হাত পাততেন এবং বলতেন— আমাকে ভিক্ষা দাও, আমি একসময় তোমাদের খলিফা ছিলাম। এটি ছিল চরম ক্ষমতার দাপট থেকে এক অবিশ্বাস্য পতন।  অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, আল-কাহিরের মসজিদের সামনে ভিক্ষা করাটা কেবল অভাবের কারণে ছিল না, বরং এটি ছিল এক ধরণের রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা নিজের করুণ দশা বিশ্বকে দেখানোর একটি কৌশল। তিনি এর মাধ্যমে তৎকালীন শাসক ও তুর্কিদের নিষ্ঠুরতাকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।৯৫০ খ্রিস্টাব্দে অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

 

 আরো জানতে ক্লিক করুন- মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)