আল-মুত্তাকি লিল্লাহ (৯৪০–৯৪৪ খ্রি.): এক অসহায় খলিফার উপাখ্যান



খলিফা আর-রাজির মৃত্যুর পর আব্বাসীয় খিলাফত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে খলিফা পদটি কেবল একটি নামমাত্র উপাধিতে পরিণত হয়। ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি চলে যায় আমীরুল উমারা বা প্রধান সেনাপতিদের হাতে। আর-রাজির পর খলিফা হন তাঁর ভাই আল-মুত্তাকি লিল্লাহ । খলিফা আর-রাজি যখন মারা যান, তখন প্রভাবশালী 'আমীরুল উমারা ছিলেন বজকম  নামক এক তুর্কি সেনাপতি। তিনি আর-রাজির ভাই আল-মুত্তাকি-কে সিংহাসনে বসান। আল-মুত্তাকি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং ভালো মানুষ। তিনি রোজা রাখতেন এবং ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। কিন্তু রাষ্ট্র চালানোর মতো সামরিক শক্তি বা চাতুর্য তাঁর ছিল না। তিনি জানতেন যে তাঁর জীবন ও সিংহাসন পুরোপুরি সেনাপতিদের মর্জির ওপর টিকে আছে।

ক্ষমতার ত্রিমুখী লড়াই : খলিফা যখন ফুটবল তখন তাকে খেলতে তো মাঠে প্লেয়ার নামবে। আল-মুত্তাকির ৪ বছরের শাসনকাল ছিল মূলত তিনজন শক্তিশালী ব্যক্তির মধ্যকার লড়াইয়ের ইতিহাস। খলিফা এই তিনজনের মধ্যে ফুটবলের মতো এদিক-ওদিক হয়েছেন ।

বজকম ছিলেন প্রথম আমীরুল উমারা। তিনি মারা যাওয়ার পর বাগদাদে চরম অরাজকতা শুরু হয়। বজকমের মৃত্যুর পর ইবনে রায়েক ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেন হামদানীয় বংশের শাসকরা। নাসির আদ-দৌলা মোসুলের হামদানীয় শাসকরা বাগদাদ দখল করেন এবং খলিফাকে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, খলিফা একবার বাগদাদ থেকে পালিয়ে মোসুলে যান সাহায্যের জন্য, আবার সেখান থেকে ফিরে আসেন যখন অন্য কোনো সেনাপতি বাগদাদ দখল করে। খলিফার নিজের কোনো সেনাবাহিনী ছিল না।

তুর্কি সেনাপতি তাজুন এবং চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা: ইবনে রায়েক ও হামদানীয়দের পর ক্ষমতায় আসেন তাজুন নামক এক নিষ্ঠুর তুর্কি সেনাপতি। আল-মুত্তাকি তুজুনকে ভয় পেতেন, তাই তিনি আবার পালিয়ে গিয়ে হামদানীয়দের আশ্রয় নেন। তুজুন বুঝতে পারেন যে খলিফা বাইরে থাকলে তাঁর ক্ষমতার বৈধতা থাকে না। তাই তিনি খলিফার কাছে পবিত্র কুরআনের ওপর হাত রেখে শপথ করে চিঠি পাঠান যে— আপনি বাগদাদে ফিরে আসুন, আমি আপনার কোনো ক্ষতি করব না এবং আপনার অনুগত থাকব। সরলমনা খলিফা আল-মুত্তাকি তুজুনের এই মিথ্যা শপথ বিশ্বাস করেন এবং ৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। খলিফা যখন বাগদাদের কাছাকাছি পৌঁছান, তখন তুজুন তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর ভান করে এগিয়ে যান। কিন্তু খলিফা তাঁর সামনে আসতেই তুজুন তাঁর আসল রূপ দেখান ।

তুজুন খলিফাকে ঘোড়া থেকে টেনে নামান এবং তাঁকে বন্দি করেন। তুজুনের নির্দেশে খলিফা আল-মুত্তাকির দুই চোখে তপ্ত লোহার শলাকা ঢুকিয়ে অন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি ছিল আব্বাসীয় ইতিহাসের অন্যতম বীভৎস দৃশ্য। খলিফার আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও তুর্কিদের মন গলেনি। অন্ধ খলিফাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে একটি অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর এই অন্ধ অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে ছিলেন এবং ৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

কেন খলিফাদের অন্ধ করা হতো : খলিফার তো কোনো দোষ ছিল না। এতো ভালো খলিফা কেন তাকে অন্ধ করে দেয়া হলো। এরকম প্রশ্ন সবার মনে আসা স্বাভাবিক। আসলে ,সলামি আইন ও তৎকালীন রীতি অনুযায়ী, একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী বা অন্ধ ব্যক্তি খলিফা হওয়ার যোগ্যতা হারাতেন। তাই কোনো খলিফাকে হত্যা না করে আজীবনের জন্য ক্ষমতার পথ বন্ধ করে দেওয়ার সবথেকে সহজ ও নিষ্ঠুর উপায় ছিল তাঁকে অন্ধ করে দেওয়া। এটি ছিল ক্ষমতার লড়াইয়ের এক বীভৎস কৌশল।

সেই সময়ের আব্বাসীয় খিলাফতের আশেপাশের সাম্রাজ্য: দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (৯৪০–৯৪৪ খ্রি.) আব্বাসীয় খিলাফত যখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সামরিক দুর্বলতায় জর্জরিত ছিল, তখন বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। আব্বাসীয় খিলাফতের  একদিকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং অন্যদিকে নতুন উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দ্বারা চারিদিক থেকে পরিবেষ্টিত ও চাপের মুখে ছিল।

·         বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য): বর্তমান তুরস্ক, গ্রিস এবং বলকান অঞ্চল নিয়ে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ।কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল তাদের রাজধানী।তারা ছিল আব্বাসীয়দের দীর্ঘদিনের প্রধান শত্রু । আব্বাসীয় খিলাফতের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দুর্বলতার সুযোগে বাইজেন্টাইনরা সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার সীমান্ত বরাবর আক্রমণ চালাত। ১০ম শতাব্দীর এই সময়ে তাদের সামরিক শক্তি বেশ প্রবল ছিল এবং তারা হারানো অঞ্চল উদ্ধারে সচেষ্ট ছিল।

·         ফাতেমীয় খিলাফত: বর্তমান তিউনিসিয়া, লিবিয়া, আলজেরিয়া (মূল কেন্দ্র ছিল উত্তর আফ্রিকা, পরে তারা মিশরে রাজধানী স্থানান্তরিত করে)।শিয়া মতাদর্শী এই খিলাফত নিজেকে আব্বাসীয়দের একমাত্র বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাবি করত।ফাতেমীয়রা আব্বাসীয়দের আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করত। তারা মিশরের দিকে অগ্রসর হতে থাকায় আব্বাসীয়দের জন্য এটি ছিল বিশাল মাথাব্যথার কারণ।

·         সামানি সাম্রাজ্য: বর্তমান ইরান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও আফগানিস্তান নিয়ে সামানি সাম্রাজ্য গঠিত। বুখারা ছিল এদের রাজধানী। এটি ছিল পূর্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারস্য-ভিত্তিক সাম্রাজ্য। আব্বাসীয় খলিফাদের নামেমাত্র আনুগত্য স্বীকার করলেও সামানিরা কার্যত স্বাধীন ছিল। শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের বিকাশে তারা তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল।

·         বুয়াইহীয় রাজবংশ: বর্তমান ইরান এবং ইরাকের কিছু অংশ। এটি ছিল একটি পারস্য-ভিত্তিক শিয়া রাজবংশ। এটিই ছিল আল-মুত্তাকির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। ৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তারা বাগদাদ দখল করে নেয়। বাগদাদ দখলের পর খলিফারা কার্যত বুয়াইহীয় আমীরদের হাতের পুতুলে পরিণত হন। খলিফার নামে মুদ্রা চলত ও খুতবা পাঠ করা হতো, কিন্তু ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল এই বুয়াইহীয়দের হাতে।

·         হামদানীয় রাজবংশ: বর্তমান উত্তর ইরাক (মোসুল) এবং সিরিয়া (আলেপ্পো)। আল-মুত্তাকির রাজত্বকালে তারা বাগদাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করত। খলিফা আল-মুত্তাকি অনেক সময় নিজের প্রাণ বাঁচাতে বা তুর্কি সেনাপতিদের হাত থেকে বাঁচতে হামদানীয়দের কাছে আশ্রয় নিতেন। এদের রাজধানী ছিল মোসুল এবং পরে আলেপ্পো, যা শিল্প ও যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত ছিল।

·         উমাইয়া খিলাফত (কর্ডোভা): বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল। এটি ছিল বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতের সমান্তরাল একটি মুসলিম রাষ্ট্র। তারা আব্বাসীয়দের সাথে সরাসরি কোনো যুদ্ধে লিপ্ত ছিল না। বরং তারা নিজেদের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মুসলিম শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করত এবং স্থাপত্য ও বিজ্ঞানে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছিল।

 

সে সময় ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের জন্য বিয়োজন কাল। আগে খলিফার একক শাসন ছিল, কিন্তু এই সময়ে খিলাফত 'টুকরো টুকরো' হয়ে যায়। একদিকে শিয়া মতাদর্শী ফাতেমীয় ও বুয়াইহীয়দের উত্থান এবং অন্যদিকে বাইজেন্টাইনদের সামরিক চাপ—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে আব্বাসীয় খলিফারা কেবল বাগদাদের কিছু অংশে প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

আল-মুত্তাকির অসহায়ত্ব ছিল মূলত এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক চাপের সরাসরি ফলাফল। তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে বাগদাদে তাঁর নিরাপত্তা নেই, তখন তিনি হামদানীয়দের মতো আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুর্কি সেনাপতিদের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন।

 আরো জানতে ক্লিক করুন: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

 

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)