আল-মুক্তাদির বিল্লাহ: (৯০৮–৯৩২ খ্রি.) এক নাবালক খলিফার করুন ইতিহাস
আল-মুক্তাদিরের শাসনকাল আব্বাসীয় ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক অধ্যায়। তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর ক্ষমতায় থাকলেও, এটি ছিল মূলত নারী ও আমলাদের শাসন এবং সাম্রাজ্যের পতনের চূড়ান্ত সূচনা। আল-মুক্তাদির যখন সিংহাসনে বসেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। আব্বাসীয় ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম নাবালক খলিফা। দরবারের আমলারা জেনেশুনেই এক শিশুকে খলিফা বানিয়েছিলেন যাতে তারা পর্দার আড়াল থেকে দেশ শাসন করতে পারে।
খলিফা ছোট হওয়ায় প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় তাঁর মা শাগাব এবং শক্তিশালী উজিরদের হাতে। ইতিহাসে একে নারীদের শাসন বলা হয়।শাসনকালের বিলাসিতা ও বিশৃঙ্খলা: আল-মুক্তাদিরের আমলে আব্বাসীয়দের সেই জৌলুস ও শৃঙ্খলা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে।
1.
আল-মুতাদিদ ও আল-মুক্তাফি যে বিশাল ধনভাণ্ডার জমা করেছিলেন, আল-মুক্তাদির তা আমোদ-প্রমোদ আর বিলাসিতায় উড়িয়ে দেন। তিনি তাঁর মায়ের পরামর্শে দরবারে হাজার হাজার দাসী ও কর্মচারী নিয়োগ দেন।
2.
তাঁর সময়ে উজির বা প্রধানমন্ত্রীদের ঘনঘন পরিবর্তন করা হতো। কেউ ভালো কাজ করতে চাইলে হিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে সরিয়ে দেওয়া হতো। বিখ্যাত উজির ইবনে আল-ফুরাত এবং আলী ইবনে ঈসা এই সময়েই দায়িত্ব পালন করেন।
3.
তুর্কি সেনাপতি মুনিস আল-মুজাফফর এই সময়ে সামরিক বাহিনীর সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। খলিফা তাঁর ওপর এতটাই নির্ভরশীল ছিলেন যে মুনিস যা চাইতেন তাই হতো।
মুনিসের ক্ষমতার উত্থান ও প্রভাব: খলিফা আল-মুক্তাদির এবং তাঁর প্রধান সেনাপতি মুনিস আল-মুজাফফর-এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের ইতিহাসের এক করুণ পরিহাস। মুনিস ছিলেন আল-মুক্তাদিরের শাসনের প্রধান স্তম্ভ, কিন্তু সেই স্তম্ভটিই শেষ পর্যন্ত খলিফাকে পিষে মেরে ফেলেছিল। মুনিস
ছিলেন একজন তুর্কি খোজা সেনাপতি। তিনি প্রায় ২৮ বছর ধরে আব্বাসীয় বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আল-মুক্তাদির ছোটবেলা থেকেই মুনিসের ওপর সামরিকভাবে পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন। ফাতেমীয়দের হাত থেকে মিশর রক্ষা এবং বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুনিস অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছিলেন।
ধীরে ধীরে
মুনিস খিলাফতের সবথেকে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হন। খলিফার অনুমতি ছাড়াই তিনি মন্ত্রী (উজির) নিয়োগ বা বরখাস্ত করতে শুরু করেন।
দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ততা থাকলেও বেশ কিছু কারণে খলিফার সাথে মুনিসের তিক্ততা চরমে পৌঁছায়-
1. রাজকোষ খালি থাকায় আল-মুক্তাদির সৈন্যদের নিয়মিত বেতন দিতে পারছিলেন না। মুনিস খলিফাকে বিলাসিতা কমাতে বলতেন, কিন্তু খলিফা তাঁর মা ও আমলাদের কথায় চলতেন। বেতন না পেয়ে সৈন্যরা মুনিসের মাধ্যমে খলিফার ওপর চাপ সৃষ্টি করত।
2. খলিফার উজির ও পারিষদরা ভয় পাচ্ছিলেন যে মুনিস যেকোনো সময় খলিফাকে সরিয়ে দিতে পারেন। তারা খলিফার কানে মুনিসের বিরুদ্ধে বিষ ঢালতে শুরু করেন।
3. ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মুনিস প্রথমবার বিদ্রোহ করেন এবং আল-মুক্তাদিরকে সরিয়ে তাঁর ভাই আল-কাহিরকে খলিফা বানান। কিন্তু সৈন্যদের চাপে তিন দিন পর আল-মুক্তাদিরকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাতে হয়। এরপর থেকেই দুজনের মধ্যে আস্থার দেয়াল চিরতরে ভেঙে যায়।
সাম্রাজ্যের ভাঙন ও বিদ্রোহ: আল-মুক্তাদিরের দুর্বলতার সুযোগে সাম্রাজ্যের চারদিকে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে-
1.
তিউনিসিয়ায় শিয়া ফাতেমীয়রা একটি শক্তিশালী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে এবং মিশর আক্রমণের চেষ্টা চালায়।
2.
এই সময়ের সবথেকে ভয়ংকর ঘটনা ছিল কারমাতিয়দের উত্থান। তারা ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মক্কা আক্রমণ করে, হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) চুরি করে নিয়ে যায় এবং হাজার হাজার হাজিকে হত্যা করে। খলিফা তাদের থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন।
3.
উত্তর সীমান্তে রোমানরা (বাইজেন্টাইন) একের পর এক মুসলিম শহর দখল করতে শুরু করে।
চূড়ান্ত যুদ্ধ ও খলিফার মৃত্যু: ৯৩২ খ্রিস্টাব্দে বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মুনিস তাঁর বিশাল তুর্কি বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অবরোধ করেন। আল-মুক্তাদিরের উজিররা তাঁকে পরামর্শ দেন প্রাসাদে লুকিয়ে না থেকে সরাসরি ময়দানে নামতে। খলিফা পবিত্র আলখেল্লা পরে এবং তলোয়ার হাতে নিয়ে যুদ্ধে নামেন। যুদ্ধের ময়দানে খলিফার অনেক সৈন্য মুনিসের দলে যোগ দেয়। এক পর্যায়ে আল-মুক্তাদির একা হয়ে পড়েন। মুনিসের নির্দেশিত তুর্কি ঘাতকরা খলিফাকে ঘিরে ফেলে এবং তলোয়ারের আঘাতে তাঁকে হত্যা করে। খলিফা যে পবিত্র আলখেল্লা এবং রাজকীয় পোশাক পরেছিলেন, ঘাতকরা তা লুট করার জন্য তাঁর মৃতদেহ থেকে খুলে নেয়। ফলে খলিফার দেহটি প্রায় নগ্ন অবস্থায় যুদ্ধের ময়দানে পড়ে থাকে। কোনো রাজকীয় সম্মান তো দূরের কথা, সাধারণ দাফন-কাফনের ব্যবস্থাও তখন কেউ করেনি। তাঁর দেহটি ধুলোবালির মধ্যে পড়ে ছিল। শেষ পর্যন্ত ওই এলাকার সাধারণ কৃষকরা তাঁর করুণ দশা দেখে দয়াপরবশত একটি গর্ত খুঁড়ে তাঁকে মাটি চাপা দেয়। সেখানে কোনো জানাজা বা রাজকীয় শোকগাথা হয়নি। পরবর্তীতে তাঁর কবরের ওপর কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা চিহ্নও রাখা হয়নি যাতে মানুষ সেটি চিনতে না পারে।
চরম অপমাননের কারণ ও ঐতিহাসিক প্রভাব: খলিফার মতো একজন ব্যক্তিত্বকে কেন এভাবে মাটি চাপা দেওয়া হলো, তার পেছনে কিছু কারণ ছিল-
1.
মুনিসের
ঘৃণা: সেনাপতি মুনিস আল-মুজাফফর চাচ্ছিলেন খলিফার মৃত্যুর মাধ্যমে আব্বাসীয় আভিজাত্যের দাপট চিরতরে শেষ করে দিতে। তিনি সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে খলিফার প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখানো না হয়।
2.
ভীতি প্রদর্শন: তুর্কিরা চেয়েছিল পরবর্তী খলিফাকে (আল-কাহির) এই বার্তা দিতে যে—যদি তোমরা আমাদের কথামতো না চলো, তবে তোমাদের পরিণতিও এমন তুচ্ছ হবে।
3.
বিশৃঙ্খলা: যুদ্ধের পর বাগদাদে এমন চরম বিশৃঙ্খলা ও লুটতরাজ শুরু হয়েছিল যে, খলিফার পরিবারের সদস্যরাও প্রাণভয়ে লুকিয়ে ছিল। ফলে তাঁর দাফনের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ ছিল না।
আল-মুক্তাদিরের এই বেওয়ারিশ বা মাটি চাপা পড়া অবস্থা আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। যে বংশের খলিফারা একসময় অর্ধেক পৃথিবী শাসন করতেন, তাঁদের একজনের মরদেহ রাস্তার পাশে কৃষকদের হাতে মাটি চাপা পড়ছে—এটি ছিল মুসলিম জাহানের জন্য এক বিশাল ধাক্কা।
.png)
Comments
Post a Comment