মুসা আল-হাদী: (৭৮৫–৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ)

 


খলিফা আল-মাহদীর মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে মুসা আল-হাদী আব্বাসীয় খিলাফতের চতুর্থ খলিফা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকাল ছিল মাত্র ১ বছর ৩ মাস, কিন্তু এই অল্প সময়েই রাজপরিবারে চরম উত্তেজনা, ষড়যন্ত্র এবং ক্ষমতার লড়াই দেখা দিয়েছিল।

ক্ষমতা গ্রহণ এবং হারুন-অর-রশিদের সাথে দ্বন্দ্ব : আল-মাহদী চেয়েছিলেন তাঁর দুই ছেলে পর্যায়ক্রমে খলিফা হবেন—প্রথমে আল-হাদী, তারপর হারুন-অর-রশিদ। কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার পর আল-হাদী এই নিয়ম পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন। আল-হাদী চেয়েছিলেন তাঁর নিজের নাবালক পুত্র জাফরকে পরবর্তী খলিফা মনোনীত করতে। এর অর্থ ছিল হারুন-অর-রশিদের বৈধ অধিকার কেড়ে নেওয়া। আল-হাদী সেনাপতি এবং রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যাতে তারা হারুনকে বাদ দিয়ে তাঁর পুত্র জাফরের নামে আনুগত্যের শপথ (বায়াত) গ্রহণ করে।

অনেকে ভয়ের কারণে রাজি হলেও অনেকে হারুনের পক্ষে অনড় ছিলেন। আল-হাদী তাঁর ভাই হারুনকে সরাসরি শত্রু মনে করতে শুরু করেন। হারুন যাতে স্বেচ্ছায় তাঁর দাবি ত্যাগ করেন, সেজন্য আল-হাদী বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। হারুনকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার জন্য আল-হাদী তাঁকে নানাভাবে হেনস্তা করতেন। এমনকি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হারুন তাঁর নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। হারুনের শিক্ষক ও প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ইয়াহিয়া ইবনে খালিদ বারমাকি। তিনি হারুনকে পরামর্শ দেন যেন তিনি বিবাদে না জড়িয়ে ধৈর্য ধরেন এবং বাগদাদ ছেড়ে দূরে কোথাও শিকারে চলে যান। হারুন তা-ই করেন, যার ফলে সরাসরি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। হারুন-অর-রশিদের বাগদাদ ছেড়ে গেলে হারুনের শিক্ষক ও প্রধান উপদেষ্টা  ইয়াহিয়া বারমাকি ছিলেন আল-হাদীর প্রধান লক্ষ্য। আল-হাদী তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে ধমক দেন এবং হারুনের পক্ষ ত্যাগ করতে বলেন।

ইয়াহিয়া অত্যন্ত সাহসের সাথে খলিফা আল-হাদীকে বলেন যে, হারুনের অধিকার কেড়ে নিলে এবং নাবালক পুত্রকে খলিফা বানালে সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেবে। এতে খিলাফতের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে। ইয়াহিয়ার এই স্পষ্ট কথা শুনে আল-হাদী ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং ঘোষণা করেন যে, খুব শীঘ্রই তিনি ইয়াহিয়া এবং হারুন—উভয়কেই হত্যা করবেন। পরবর্তীতে হারুন-অর-রশিদ কে ও বন্দি করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে ।

রাজমাতা খায়জুরানের সাথে সংঘাত: এই দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের মা খায়জুরান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। খায়জুরান তাঁর ছোট ছেলে হারুনকে বেশি স্নেহ করতেন এবং মনে করতেন হারুনই খিলাফতের জন্য বেশি যোগ্য। তিনি পর্দার আড়াল থেকে হারুনের অধিকার রক্ষার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আল-হাদী যখন জানতে পারেন তাঁর মা হারুনের পক্ষে কাজ করছেন, তখন তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।তিনি  তাঁর মায়ের এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পছন্দ করেননি। তিনি মাকে আদেশ দেন যে তিনি যেন কেবল ঘরের কাজে সীমাবদ্ধ থাকেন এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কোনো কথা না বলেন।প্রকাশ্য দরবারে মাকে অপমান ও করেন এবং ঘোষণা করেন যে, কোনো কর্মকর্তা যদি তাঁর মায়ের সাথে দেখা করতে যায় তবে তার শিরচ্ছেদ করা হবে। তিনি তাঁর মাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টাও করেছিলেন বলে কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়।

ফাখের যুদ্ধ : (৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে) হযরত আলী (রা.)-এর বংশধর এবং আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে ক্ষমতার যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব ছিল, তার একটি অত্যন্ত করুণ এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হলো ফাখের যুদ্ধ । ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আল-হাদীর শাসনামলে এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। শিয়া মুসলমানদের কাছে কারবালার যুদ্ধের পর এটিই সবচেয়ে শোকাবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা নবী পরিবারের (আহলে বায়াত) হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু তারা তা করেনি, উল্টো আলীর (রা.) বংশধরদের ওপর নজরদারি ও কঠোরতা বাড়িয়ে দেয়। হোসাইন ইবনে আলী ইবনুল হাসান ছিলেন হযরত হাসান (রা.)-এর প্রপৌত্র। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক, সাহসী এবং ইবাদতগুজার মানুষ ছিলেন বলে তাঁকে হোসাইন আল-ফাসি বা হোসাইন আল-আলাভি বলা হতো। খলিফা আল-হাদীর নিযুক্ত মদিনার গভর্নর আলীর (রা.) বংশধরদের সাথে অত্যন্ত অপমানজনক আচরণ শুরু করেন। তাঁদের চলাফেরায় বাধা দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন হাজিরা দিতে বাধ্য করা হয়। এই অপমানের প্রতিবাদে হোসাইন ইবনে আলী মদিনায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মদিনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। হোসাইন ইবনে আলী চাইলেন হজ্জের মৌসুমে মক্কায় গিয়ে সাধারণ মুসলমানদের সমর্থন আদায় করতে। কারণ হজ্জের সময় সারা বিশ্ব থেকে মুসলমানরা সেখানে সমবেত হয়। তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে অনেক লোক তাঁর সাথে যোগ দেয়। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি কেবল ইনসাফ কায়েম এবং নবীজির (সা.) সুন্নাহ পুনরুজ্জীবিত করতে চান। খলিফা আল-হাদী যখন এই খবর পেলেন, তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি হজ্জ পালন করতে আসা আব্বাসীয় রাজপরিবারের সদস্য এবং বিশাল এক সুসজ্জিত বাহিনীকে নির্দেশ দেন এই বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দিতে। মক্কার অদূরে ফাক নামক একটি উপত্যকায় উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়। তারিখটি ছিল ১১ই জিলহজ্জ (৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ)। হোসাইন ইবনে আলীর সাথে ছিল মাত্র কয়েকশ অনুসারী, যারা মূলত ইবাদতকারী এবং সাধারণ মানুষ ছিলেন। অন্যদিকে আব্বাসীয় সেনাপতি মুসা ইবনে ঈসার অধীনে ছিল বিশাল এক পেশাদার সেনাবাহিনী। আব্বাসীয় বাহিনী তীরবৃষ্টির মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করে। হোসাইন ইবনে আলী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে একটি তীরের আঘাতে হোসাইন ইবনে আলী শাহাদাত বরণ করেন। আব্বাসীয় সৈন্যরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রায় সবাইকে হত্যা করে। কারবালার যুদ্ধের মতো এই যুদ্ধের পরেও আব্বাসীয়রা মৃতদেহগুলোর সাথে অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করেছিল। হোসাইন ইবনে আলীসহ প্রায় ১০০ জন শহীদদের মাথা কেটে খলিফা আল-হাদীর কাছে বাগদাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অনেককে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে হত্যা করা হয়।এই ঘটনার নৃশংসতা দেখে তৎকালীন বিখ্যাত আলেমরা অত্যন্ত মর্মাহত হন। ইমাম মুহাম্মদ আল-জাওয়াদ (রহ.) বলেছিলেন,কারবালার পর ফাক-এর ঘটনার মতো আর কোনো বড় ট্র্যাজেডি আমাদের ওপর আসেনি। এই যুদ্ধে সবাই মারা গেলেও হোসাইন ইবনে আলীর চাচাতো ভাই ইদ্রিস ইবনে আবদুল্লাহ অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ইদ্রিস কৌশলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে উত্তর আফ্রিকার মরক্কোতে পৌঁছে যান। সেখানকার বার্বার উপজাতিরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করে। সেখানে তিনি ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে স্বতন্ত্র ইদ্রিসীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের হাত থেকে বের হয়ে যাওয়া প্রথম কোনো স্বাধীন শিয়া রাষ্ট্র। অর্থাৎ, ফাখের যুদ্ধে আব্বাসীয়রা জিতলেও এর ফলেই তারা উত্তর আফ্রিকার নিয়ন্ত্রণ চিরতরে হারিয়ে ফেলে।

আল-হাদীর রহস্যময় মৃত্যু ও ঐতিহাসিক রাত: দ্বন্দ্ব যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং হারুন ও ইয়াহিয়ার জীবন যখন সংকটের মুখে, ঠিক তখনই এক অলৌকিক বা রহস্যময় ঘটনা ঘটে। ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দের এক রাতে আল-হাদী হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। খলিফা মুসা আল-হাদীর মৃত্যু ছিল আব্বাসীয় ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এবং নাটকীয় ঘটনা। মাত্র ২৪-২৫ বছর বয়সে তাঁর এই আকস্মিক বিদায় এক রাতের মধ্যে পৃথিবীর মানচিত্র এবং রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

সরকারি নথিপত্র এবং অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, আল-হাদী কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হননি, বরং তিনি প্রাকৃতিক কারণেই মারা গিয়েছিলেন। বলা হয়, আল-হাদী পেটের কোনো কঠিন রোগে (সম্ভবত আলসার বা পাকস্থলীর ক্ষত) ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকেই তিনি তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ইরাকের ঈসাবাদ নামক স্থানে তিনি অবস্থান করছিলেন। সেখানে যন্ত্রণার তীব্রতা বেড়ে গেলে তিনি হঠাৎ করেই মারা যান। মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে খুব কম মানুষই উপস্থিত ছিল।

অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন, আল-হাদীর মৃত্যু ছিল একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার মূল কারিগর ছিলেন রাজমাতা খায়জুরান।রাজমাতা খায়জুরান যখন দেখলেন আল-হাদী তাঁর ছোট ছেলে হারুনকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন, তখন খায়জুরান নিজের প্রিয় পুত্র হারুনকে বাঁচাতে চরম সিদ্ধান্ত নেন। বর্ণিত আছে যে, আল-হাদী যখন অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় ছিলেন, তখন খায়জুরানের নির্দেশে তাঁরই কয়েকজন বিশ্বস্ত দাসী বালিশ চাপা দিয়ে বা আল-হাদীর বুকের ওপর বসে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে, তাঁকে খাবারে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

আল-হাদীর মৃত্যুর রাতটি ইসলামের ইতিহাসে এক অলৌকিক রাত হিসেবে পরিচিত। এই এক রাতেই তিনটি এমন ঘটনা ঘটেছিল যা আগে কখনো হয়নি 1.এক খলিফার মৃত্যু- উগ্র মেজাজের খলিফা আল-হাদী মৃত্যুবরণ করেন। 2.নতুন খলিফার অভিষেক- একই রাতে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে হারুন-অর-রশিদ আব্বাসীয় খিলাফতের সিংহাসনে বসেন। 3.ভবিষ্যৎ খলিফার জন্ম- ঠিক সেই রাতেই হারুন-অর-রশিদের পুত্র আল-মামুন জন্মগ্রহণ করেন, যিনি পরবর্তীতে আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ খলিফা হয়েছিলেন।


 আরো জানতে ক্লিক করুন: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন-

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)