মুহাম্মদ আল-মাহদী : (৭৭৫–৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ)

 


খলিফা আবু জাফর আল-মনসুরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুহাম্মদ আল-মাহদী (৭৭৫–৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় খিলাফতের সিংহাসনে বসেন। আল-মনসুরের শাসনকাল ছিল কঠোরতা এবং দমনের, কিন্তু আল-মাহদী ক্ষমতায় এসে সাম্রাজ্যে এক নতুন উদারতা ও শান্তির যুগ নিয়ে আসেন। তাঁর ১০ বছরের শাসনকাল আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের ভিত্তি আরও মজবুত করেছিল।

উদারতা ও জনকল্যাণমূলক কাজ: আল-মাহদী ক্ষমতায় এসেই তাঁর পিতার কঠোর নীতিগুলো শিথিল করেন। আল-মনসুরের সময় রাজনৈতিক কারণে অনেক মানুষকে কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল। আল-মাহদী খলিফা হওয়ার পর একটি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং কারাগারে থাকা প্রায় সকল রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেন। এটি জনগণের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী করে তোলে। আল-মনসুর মহানবী (সা.)-এর বংশধরদের (আলী রা.-এর পরিবার) ওপর যে কঠোরতা করেছিলেন, আল-মাহদী তা বন্ধ করেন। তিনি তাঁদের বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন এবং তাঁদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এর ফলে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ অনেকটা কমে যায়।

আল-মাহদী প্রজাসাধারণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি মক্কা ও মদিনার পথে অসংখ্য সরাইখানা, কূপ এবং হাসপাতাল নির্মাণ করেন। বিশেষ করে মরুভূমির পথে হাজীদের পানির কষ্ট দূর করার জন্য তিনি বিশাল সব জলাধার তৈরি করেছিলেন। তিনি সাম্রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করেন। তাঁর সময়ে ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য নতুন নতুন ডাকঘর (বারিদ) ও রাস্তা তৈরি করা হয়। তিনি মদিনার মসজিদে নববীর ব্যাপক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন এবং মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন।

সামরিক অভিযান ও রোমানদের সাথে যুদ্ধ : যদিও তিনি দয়ালু ছিলেন, কিন্তু সাম্রাজ্যের সীমানা রক্ষায় তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর সময়ে বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের সাথে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ হয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য) প্রায়ই আব্বাসীয় সীমান্তগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। বিশেষ করে রোমান সম্রাজ্ঞী আইরিন যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি আব্বাসীয়দের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। ৭৮২ খ্রিস্টাব্দে আল-মাহদী তাঁর প্রিয় পুত্র হারুন-অর-রশিদকে  প্রায় ৯৪,০০০ থেকে ১ লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী দিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে পাঠান। এই বাহিনীতে অভিজ্ঞ সেনাপতিদের পাশাপাশি কয়েক বছরের যুদ্ধের রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল। যদিও হারুন তখন যুবক ছিলেন, কিন্তু তাঁর দূরদর্শিতা ও সাহস দেখে খলিফা তাঁকে এই অভিযানে সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন। আব্বাসীয় বাহিনী তোরোস পর্বতমালা অতিক্রম করে সরাসরি রোমানদের হৃদপিণ্ড এশিয়া মাইনরে (বর্তমান তুরস্ক) প্রবেশ করে। হারুন-অর-রশিদের বাহিনী পথে থাকা রোমানদের শক্তিশালী দুর্গ মাগিদা জয় করেন। এরপর তারা পিদিয়া নামক স্থানে রোমানদের এক বিশাল প্রতিরোধ বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। রোমানদের হাজার হাজার সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত ও বন্দি হয়। হারুন তাঁর বাহিনী নিয়ে রোমানদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল)-এর ঠিক উল্টো পাশে ক্রাইসোপোলিস (বর্তমান উসকুদর) নামক স্থানে পৌঁছে যান। রোমানরা তাদের খোদ রাজধানীর সামনে মুসলিম বাহিনীর এই উপস্থিতি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কনস্টান্টিনোপল শহরটি সমুদ্র দিয়ে ঘেরা থাকায় তা সরাসরি দখল করা কঠিন ছিল, কিন্তু হারুনের অবরোধ রোমানদের অর্থনীতি ও মনোবল ভেঙে দেয়। সম্রাজ্ঞী আইরিন বুঝতে পারেন যে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাঁর সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। আইরিন বাধ্য হয়ে হারুনের কাছে শান্তি ভিক্ষা করেন এবং দূত পাঠান। হারুন কয়েকটি কঠোর শর্তে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। রোমানরা প্রতি বছর আব্বাসীয় খিলাফতকে ৭০ থেকে ৯০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) দিতে বাধ্য হয়। এছাড়াও মুসলমানদের ১,০০০ বন্দিকে মুক্তি দেওয়া এবং ৩ বছরের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ধর্মীয় আন্দোলন ও ধর্মদ্রোহী দমন শিল্প,সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ : আল-মাহদীর শাসনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জিন্দিক বা ধর্মদ্রোহীদের উত্থান। এরা ইসলামের ছদ্মবেশে মানবীজম বা বিকৃত মতবাদ প্রচার করত। আল-মাহদী ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস রক্ষার জন্য একটি বিশেষ আদালত বা তদন্ত বিভাগ তৈরি করেন। যারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত, তাদের তিনি কঠোরভাবে দমন করেন। তিনি মনে করতেন, সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার জন্য বিশুদ্ধ আকিদা বা বিশ্বাস রক্ষা করা জরুরি। আল-মাহদী নিজে একজন উচ্চশিক্ষিত এবং শিল্পানুরাগী মানুষ ছিলেন। তাঁর সময়ে আব্বাসীয় দরবার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর দরবারে বড় বড় কবি ও সংগীতজ্ঞদের মিলনমেলা বসত। তিনি তাঁদের প্রচুর অর্থ ও সম্মান দিতেন। আল-মনসুর অত্যন্ত মিতব্যয়ী ছিলেন, কিন্তু আল-মাহদীর সময়ে রাজকীয় জৌলুস বাড়তে শুরু করে। বাগদাদের প্রাসাদগুলো রত্ন ও কারুকাজ দিয়ে সাজানো হয়, যা পরবর্তীতে হারুন-অর-রশিদের সময়ে চূড়ান্ত রূপ পায়।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার : খলিফা আল-মাহদী-এর মৃত্যু ছিল অত্যন্ত আকস্মিক এবং ট্র্যাজিক। ৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর এই অকাল মৃত্যু আব্বাসীয় খিলাফতে একটি সাময়িক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। খলিফা আল-মাহদী শিকার করতে খুব পছন্দ করতেন। ৭৮৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে তিনি তাঁর পুত্র হারুন-অর-রশিদ এবং অনুসারীদের নিয়ে ইরানের পাহাড়ি অঞ্চল মাসাবাদান (বর্তমান কেরমানশাহর কাছে)-এ শিকারে যান। শিকার চলাকালীন একটি হরিণ বা বন্য প্রাণীকে তাড়া করতে গিয়ে আল-মাহদী তাঁর ঘোড়া নিয়ে খুব দ্রুত গতিতে একটি পুরনো পরিত্যক্ত দালানের বা ধ্বংসাবশেষের দরজার ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেন। দরজাটি ছিল অত্যন্ত নিচু। ঘোড়াটি দ্রুত গতিতে ভেতরে ঢুকে গেলেও আল-মাহদীর পিঠ বা মেরুদণ্ড দরজার উপরের কাঠামোর সাথে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায়। এই মারাত্মক আঘাতেই তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই বা তার কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪৩ বছর। পিতার মৃত্যুর সময় হারুন-অর-রশিদ পাশেই ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও সাহসের সাথে পরিস্থিতি সামাল দেন। হারুন নিজেই তাঁর পিতার জানাজার নামাজ পড়ান এবং মাসাবাদান অঞ্চলেই তাঁকে দাফন করা হয়। খলিফা আল-মাহদী মারা যাওয়ার খবর শোনার পর রাজধানী বাগদাদে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর দুই পুত্র আল-হাদী এবং হারুন-অর-রশিদকে পর্যায়ক্রমে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে গিয়েছিলেন। আল-মাহদীর মৃত্যু ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।


আরো জানতে ক্লিক করুন- মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)