মির্জা গালিবনামা - যদি জান্নাত না থাকত, তবে কি আপনি সিজদা দিতেন?
দিল্লির এক পড়ন্ত বিকেলে জামে মসজিদের সিঁড়িতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে ছিলেন মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিব। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন শহরের এক নামকরা মাওলানা,যার কপালে সিজদার চিহ্ন স্পষ্ট এবং বগলে মোটা কিতাব।
মাওলানা গালিবকে দেখে একটু বিদ্রূপের সুরে বললেন,
মির্জা সাহেব, দিন তো শেষ হয়ে এলো, আখেরাতের পুঁজিতে তো দেখি শূন্যতা। কবরে যখন ফেরেশতারা হিসাব চাইবে, তখন এই কাব্য আর সুরা দিয়ে তো পার পাবেন না। ইবাদত করুন, জান্নাতের বাগানে হুর আর শরাবান-তহুরার প্রতিশ্রুতি তো খোদা দিয়েই রেখেছেন।
গালিব একটু হাসলেন। সেই হাসিতে একাধারে করুণা আর গভীর দর্শন মিশে ছিল। তিনি মাওলানার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
হযরত, আপনি কি খোদার ইবাদত করছেন, নাকি জান্নাতের বীমায় কিস্তি জমা দিচ্ছেন?
মাওলানা এবার থমকে দাঁড়ালেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন, এ কেমন কথা মির্জা? ইবাদতের বিনিময়ে জান্নাত পাওয়া তো মুমিনের অধিকার। এটা তো খোদাই ওয়াদা করেছেন।
গালিব আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন:
আসলে সমস্যাটা খোদার নয়, সমস্যাটা আপনাদের মতো সওদাগর বা ব্যবসায়ীদের। খোদা তো এক অসীম সমুদ্র, যাঁর কোনো সীমা নেই। কিন্তু আপনারা তাঁকে বানিয়েছেন এক মহাজন। আপনারা সিজদা দেন এই ভয়ে যে, পাছে জাহান্নামের আগুন জ্বলে ওঠে। আপনারা দান-খয়রাত করেন এই আশায় যে, পরকালে তার দশগুণ মুনাফা পাওয়া যাবে। আপনাদের কাছে তসবিহ মানে হলো হিসাব রাখার যন্ত্র (ক্যালকুলেটর), আর মসজিদ হলো এক একটা তিজারত-খানা বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
মাওলানা রাগত স্বরে বললেন,
আপনি কি বলতে চান জান্নাতের লোভ দেখানো ভুল?
গালিব মৃদু স্বরে উত্তর দিলেন, জান্নাতের বাগান তো বড়দের জন্য নয়, ওটা হলো ছোট বাচ্চাদের চকলেট দিয়ে ভোলানোর মতো। যে শিশু পড়তে চায় না, তাকে মা বলে—পড়ে নাও, লজেন্স দেব। কিন্তু যে বিদ্যাকে ভালোবেসে পড়ে, তার কাছে লজেন্সের কোনো মূল্য নেই। ইবাদতের বিনিময়ে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি ব্যবসায়ীরা দেয়, খোদা নয়। কারণ খোদা তো চান প্রেম, আর ব্যবসায়ীরা চায় কেবল আনুগত্যের বিনিময়ে লেনদেন।
তিনি আরও যোগ করলেন,
হযরত, যে দিন জান্নাতের লোভ আর দোজখের ভয় আপনার মন থেকে মুছে যাবে, সেদিনই আপনি প্রথমবার সত্যিকার ইবাদত করবেন। কারণ সেদিন আপনার কপাল মাটিতে ঠেকবে কোনো সওদার জন্য নয়, বরং এই অনুভবে যে—'সে আছে বলেই আমি আছি'। প্রেমের দরবারে কোনো পাওনাদার থাকে না, থাকে শুধু এক নিঃস্বার্থ ভিখারি।
মাওলানা আমতা আমতা করে বলল, তাহলে কি জান্নাতের আশা করাও কি ভুল?
গালিব হাসলেন, এবার তাঁর হাসিতে এক অদ্ভুত আভিজাত্য। তিনি বললেন:
আশা করা ভুল নয়, কিন্তু আশাকে 'শর্ত' বানানো ভুল। একবার ভাবুন তো, যদি কাল ঘোষণা হয় যে জান্নাত বলে কিছু নেই, জাহান্নামও নেই—তবে কি আপনি পরদিন থেকে সেজদা দেওয়া ছেড়ে দেবেন? যদি ছেড়ে দেন, তবে বুঝবেন আপনি কোনোদিন খোদার ইবাদত করেননি, করেছেন আপনার নিজের কামনার ইবাদত।
মাওলানা কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু গালিব ততক্ষণে আকাশের লালিমার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে তাঁর সেই অমর শেরটি আওড়াচ্ছেন:
"হাম কো মালুম হ্যায় জান্নাত কি হাকিকত লেকিন,
দিল কে খুশ রাখনে কো গালিব ইয়ে খায়াল আচ্ছা হ্যায়"
(জান্নাতের আসল সত্য তো আমার জানা আছে গালিব, কিন্তু মনকে সান্ত্বনা দিতে এই কল্পনাটি মন্দ নয়।)
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। মাওলানা সাহেব কিতাব বগলে গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন তাঁর হিসাবের ইবাদত করতে, আর গালিব বসে রইলেন এক শূন্যতা আর পূর্ণতার সন্ধিক্ষণে—যেখানে খোদা কোনো সওদাগর নন, বরং এক পরম প্রেমময় সত্তা।
সংগ্রহীত
Comments
Post a Comment