আল-ওয়াসিক বিল্লাহ: (৮৪২–৮৪৭ খ্রিস্টাব্দ)


খলিফা আল-মুতাসিমের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আল-ওয়াসিক বিল্লাহ (৮৪২–৮৪৭ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় খিলাফতের নবম খলিফা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকাল ছিল মাত্র পাঁচ বছরের, কিন্তু এই অল্প সময়ে তিনি তাঁর পিতা ও চাচার (আল-মামুন) নীতিগুলোকেই কঠোরভাবে বজায় রেখেছিলেন।

বুদ্ধিবৃত্তিক ও বৈজ্ঞানিক পৃষ্ঠপোষকতা: আল-ওয়াসিক তাঁর চাচা আল-মামুনের মতো অত্যন্ত শিক্ষিত এবং জ্ঞানপিপাসু ছিলেন।তাঁর দরবারে সাহিত্যিক, কবি এবং বিজ্ঞানীদের ব্যাপক কদর ছিল। তিনি নিজে সঙ্গীত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। আল-ওয়াসিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি এতটাই আসক্ত ছিলেন যে, তাঁর সময়ে বাগদাদ ও সামাররার মানমন্দিরগুলো পূর্ণোদ্যমে কাজ করত। তিনি প্রায়ই প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সাথে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতেন। নক্ষত্রের গতিবিধি এবং ক্যালেন্ডার সংস্কার নিয়ে তিনি সরাসরি তর্কে অংশ নিতেন। তাঁর নির্দেশে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য অ্যাস্ট্রোলেব নামক যন্ত্রের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করা হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন মহাকাশ গবেষণার মাধ্যমে প্রার্থনার সঠিক সময় এবং দিক নির্ণয় আরও নির্ভুল করতে।

আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে আল-ওয়াসিককে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। তিনি কেবল গান শুনতেন না, বরং তিনি নিজে ১০০টিরও বেশি সুর) তৈরি করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। তাঁর দরবারে 'উদ' (Oud) সহ বিভিন্ন ধ্রুপদী বাদ্যযন্ত্রের চর্চা হতো। তিনি সঙ্গীতকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে দেখতেন এবং এর গাণিতিক ছন্দ নিয়ে গবেষণা করতে উৎসাহিত করতেন।

আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শুদ্ধতা রক্ষায় তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তাঁর দরবারে কোনো কবি যদি নতুন ঘরানার বা উচ্চমার্গের কোনো কবিতা পাঠ করতেন, তবে তাঁকে অকাতরে স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেওয়া হতো। আরবি ব্যাকরণ ও অলঙ্কারশাস্ত্রের ওপর গবেষণার জন্য তিনি কুফা ও বসরার পণ্ডিতদের বিশেষ বৃত্তি প্রদান করতেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর গ্রিক ও ভারতীয় বইগুলো আরবিতে অনুবাদের জন্য তিনি রাজকোষ থেকে বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করেছিলেন। বিশেষ করে চোখের রোগ এবং মানবদেহের ব্যবচ্ছেদ (Anatomy) নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি চিকিৎসকদের উৎসাহ দিতেন। তিনি এই বিখ্যাত লাইব্রেরিতে দুর্লভ পাণ্ডুলিপির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে বই সংগ্রহ করতেন। তিনি এক বসায় দীর্ঘ কোনো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বা কবিতা মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। তাঁর প্রজ্ঞা বা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা এতই বেশি ছিল যে, অনেক সময় বিজ্ঞ পণ্ডিতরাও তাঁর সাথে তর্কে হেরে যেতেন।

তুর্কি বাহিনীর দাপট বৃদ্ধি: আশনাস ছিলেন আল-মুতাসিমের কেনা একজন তুর্কি গোলাম, যিনি নিজের বীরত্বে সেনাপতি পদে উন্নীত হন। আল-ওয়াসিক তাঁকে যে সম্মান দিয়েছিলেন তা ছিল অভূতপূর্ব- ৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আশনাসকে 'সুলতান' উপাধি দেন। এর আগে 'সুলতান' শব্দটি ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক পদবি ছিল না। এটিই প্রথমবার যখন খলিফা নিজে একজনকে তাঁর সমান্তরাল ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। আশনাসকে যখন এই উপাধি দেওয়া হয়, তখন তাঁকে বহুমূল্যবান রাজপোশাক, দুটি রত্নখচিত তরবারি এবং একটি সোনার কোমরবন্ধ পরানো হয়। এটি ছিল মূলত খলিফার তরফ থেকে শাসনক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার একটি প্রকাশ্য ঘোষণা। আশনাসের পাশাপাশি আরেকজন তুর্কি সেনাপতি ইতাখ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি মূলত খলিফার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ইতাখ কেবল সামরিক বাহিনী নয়, বরং গোয়েন্দা বিভাগ (বারিদ) এবং প্রাসাদের অভ্যন্তরীণ সব বিষয়ের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। ইতাখ এতটাই দুর্ধর্ষ ছিলেন যে, খলিফার পরিবারের সদস্যরাও তাঁকে ভয় পেত। তিনি সরাসরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন এবং খলিফা কেবল তাতে স্বাক্ষর করতেন।খলিফা আল-ওয়াসিক বেশি সময় জ্ঞানচর্চা ও আনন্দ-বিনোদনে কাটাতেন। এই সুযোগে তুর্কি আমলারা খলিফা এবং জনগণের মাঝখানে একটি দেয়াল তৈরি করেন। সাধারণ মানুষ বা অন্য আমলারা খলিফার কাছে পৌঁছাতে চাইলে তুর্কিদের অনুমতি লাগত। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা কর বা রাজস্বের একটি বড় অংশ তুর্কি বাহিনীর বেতন মেটাতে ব্যয় হতো। তুর্কি সেনাপতিরা রাজকোষের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোতে তুর্কিদের পছন্দের লোকজনকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। এর ফলে খলিফার নিজস্ব অনুগত কর্মকর্তাদের সংখ্যা কমতে থাকে।শাসনব্যবস্থার চাবিকাঠি ধীরে ধীরে খলিফার হাত থেকে তুর্কি আমলাদের হাতে চলে যেতে শুরু করে, যা পরবর্তী খলিফাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মুতাজিলা মতবাদ ও মিহনা (ধর্মীয় পরীক্ষা) : আল-ওয়াসিকের শাসনামলের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত দিক ছিল তাঁর ধর্মীয় নীতি।তিনি আল-মামুনের শুরু করা 'মুতাজিলা' (যুক্তিপন্থী) মতবাদকে অত্যন্ত কঠোরভাবে রক্ষা করতেন। যারা এই মতবাদ (বিশেষ করে কুরআন সৃষ্টি তত্ত্ব) মানত না, তাদের ওপর তিনি রাষ্ট্রীয় নির্যাতন চালিয়েছিলেন।তাঁর সময়ে অনেক প্রখ্যাত আলেমকে কারারুদ্ধ করা হয়। তবে তাঁর শাসনের শেষ দিকে তিনি এই কঠোরতা কিছুটা শিথিল করেছিলেন বলে জানা যায়।

অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ দমন: দিও বড় কোনো যুদ্ধ তাঁর সময়ে হয়নি, তবে তিনি ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা দমনে সফল ছিলেন।পারস্যের আহওয়াজ অঞ্চল এবং আরব মরুভূমির কিছু বেদুইন গোত্র বিদ্রোহ করলে তিনি তাঁর তুর্কি সেনাপতিদের পাঠিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তা দমন করেন।তিনি তাঁর আমলাদের দুর্নীতির বিষয়ে খুব কড়া ছিলেন। অনেক বড় বড় রাজকর্মকর্তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তিনি রাজকোষে জমা করেছিলেন।

ঐতিহাসিক বন্দী বিনিময়: (৮৪৫ খ্রি.) তাঁর সময়ে রোমানদের (বাইজেন্টাইন) সাথে কোনো বড় স্থলযুদ্ধ না হলেও সমুদ্রপথে ছোটখাটো সংঘাত হয়েছিল। ৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে ল্যামাস নদীর তীরে রোমানদের সাথে আব্বাসীয়দের একটি বিশাল 'বন্দী বিনিময়' (Prisoner Exchange) অনুষ্ঠান হয়। সেখানে প্রায় ৪,৫০০ মুসলিম বন্দীকে রোমানদের কাছ থেকে মুক্ত করে আনা হয়। এটি ছিল তাঁর কূটনৈতিক সাফল্যের একটি বড় নিদর্শন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার:খলিফা আল-ওয়াসিকের মৃত্যুর পর রাজপ্রাসাদে যে করুণ এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা আব্বাসীয় ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়। ৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৩২ থেকে ৩৫ বছর বয়সে অত্যধিক জলশাদ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে আল-ওয়াসিক মৃত্যুবরণ করেন। আল-ওয়াসিক যখন মারা যান, তখন তাঁর পাশে কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয় বা সেবক ছিল না। খলিফা যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন প্রাসাদের অন্য কক্ষে তুর্কি সেনাপতি এবং উচ্চপদস্থ আমলারা পরবর্তী খলিফা কে হবেন তা নিয়ে বিতর্কে মত্ত ছিলেন।

ঐতিহাসিক ইবনে কাসির এবং তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা মারা যাওয়ার পর তাঁর মৃতদেহটি একটি নির্জন কক্ষে ফেলে রাখা হয়েছিল। সবাই ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মৃতদেহের পাহারায় কেউ ছিল না। সেই সময় একটি বিড়াল খোলা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে মৃত খলিফার মুখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁর একটি চোখ খুবলে খেয়ে ফেলে। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী খলিফাদের একজনের চরম অবমাননাকর পরিণতি। আল-ওয়াসিকের মৃত্যুর সাথে সাথেই প্রধান উজির মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল মালিক এবং তুর্কি সেনাপতি ইতাখ ও আশনাস এক গোপন বৈঠকে বসেন। তাঁরা চেয়েছিলেন আল-ওয়াসিকের ছোট ছেলে মুহাম্মদকে (যিনি পরে খলিফা আল-মুহতাদি নামে পরিচিত হন) ক্ষমতায় বসাতে। কারণ তিনি ছিলেন নাবালক, আর নাবালক কাউকে খলিফা বানালে তুর্কিরা পর্দার আড়াল থেকে দেশ শাসন করতে পারবে। কিন্তু নাবালক মুহাম্মদকে যখন রাজকীয় পোশাক পরানো হয়, তখন দেখা গেল তিনি এতটাই ছোট যে (বিভিন্ন সূত্রমতে তাঁর বয়স তখন ছিল মাত্র ১১ থেকে ১২ বছর) খলিফার বিশাল পাগড়ি ও রাজপোশাক তাঁর শরীরে মানাচ্ছে না। তখন তুর্কিরা বুঝতে পারে যে এতো ছোট কাউকে খলিফা বানালে জনগণ মেনে নেবে না। অবশেষে কোনো উপায় না দেখে তুর্কি সেনাপতিরা আল-ওয়াসিকের ভাই জাফরকে (যিনি খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল নামে পরিচিত হন) ডেকে পাঠান। জাফর শুরুতে ভেবেছিলেন তাঁকে হয়তো হত্যার জন্য ডাকা হয়েছে। কিন্তু যখন তাঁকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করা হলো, তিনি অবাক হয়ে যান। জাফর খলিফা হওয়ার পরই কেবল আল-ওয়াসিকের মৃতদেহের দিকে নজর দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় অযত্নে পড়ে থাকার পর অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে আল-ওয়াসিককে সামাররার রাজপ্রাসাদেই দাফন করা হয়।


ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন:

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)