আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ: (৭৫০–৭৫৪ খ্রিস্টাব্দ)
আব্বাসীয়
খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ:
(৭৫০–৭৫৪
খ্রিস্টাব্দ)
আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ-এর শাসনকাল (৭৫০–৭৫৪
খ্রিস্টাব্দ) ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উমাইয়াদের ১৩২ বছরের
শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি একটি নতুন রাজবংশের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।আবুল আব্বাস ছিলেন
মহানবী (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশধর। জাব নদীর যুদ্ধে বিজয়ের পর আবুল
আব্বাস কুফার প্রধান মসজিদে যান এবং সেখানে নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি ছিল
মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি আমূল পরিবর্তন, কারণ এর মাধ্যমে আরবের রাজনৈতিক
কেন্দ্র সিরিয়া (দামেস্ক) থেকে ইরাকের দিকে স্থানান্তরিত হয়।তাঁর মাধ্যমে আব্বাসীয়
বিপ্লব সফল হয় এবং তিনি ঘোষণা করেন যে, উমাইয়াদের অন্যায় ও অবিচারের শাসনের অবসান
ঘটিয়ে এখন থেকে ইনসাফ ও নবীর পরিবারের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
আবুল আব্বাস ইতিহাসে আস-সাফফাহ নামে পরিচিত। এই শব্দের অর্থ হলো রক্তপাতকারী বা দাতা। তিনি
এই উপাধিটি নিজেই গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর শাসনামলে উমাইয়াদের প্রতি তিনি চরম নিষ্ঠুরতা
প্রদর্শন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, উমাইয়া বংশের একজন সদস্য জীবিত থাকলেও আব্বাসীয়
শাসন নিরাপদ হবে না। তাই তিনি তাঁর সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন উমাইয়া রাজপরিবারের
ছোট-বড় সকল সদস্যকে খুঁজে বের করে হত্যা করতে।তাঁর নির্দেশে সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে
আলী উমাইয়া বংশের প্রায় ৮০ জন প্রভাবশালী সদস্যকে একটি ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানান এবং
সেখানে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করেন। এমনকি মৃত উমাইয়া খলিফাদের কবর খুঁড়ে তাঁদের
কঙ্কাল পুড়িয়ে ফেলার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও তিনি নিয়েছিলেন। তাঁর এই কঠোরতার কারণেই
মূলত তাঁর নামের সাথে আস-সাফফাহ যুক্ত হয়।
প্রশাসনিক
কেন্দ্র পরিবর্তন ও রাজধানী স্থাপন: উমাইয়াদের রাজধানী ছিল সিরিয়ার
দামেস্কে, কিন্তু আব্বাসীয়দের মূল শক্তি ছিল ইরাক এবং পারস্য (ইরান) অঞ্চলে। তাই আস-সাফফাহ
তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনেন। প্রথমে তিনি কুফাকে রাজধানী করলেও সেখানকার
মানুষের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি রাজধানী পরিবর্তন করেন। তিনি ফুরাত নদীর তীরে
আল-আনবার নামক স্থানে একটি নতুন শহর
নির্মাণ করেন এবং একে তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলে আরবের রাজনীতিতে
পারস্য বা ইরানি প্রভাব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে । এবং তিনি উমাইয়া আমলের কর্মকর্তাদের
সরিয়ে তাঁর অনুগত হাশেমী এবং পারস্যের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান।
তালাসের
যুদ্ধ:(৭৫১ খ্রিস্টাব্দ) আস-সাফফাহর শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ
বৈশ্বিক ঘটনা হলো চীনের ট্যাং রাজবংশের বিরুদ্ধে তালাসের যুদ্ধ। বর্তমান মধ্য এশিয়ার তালাসের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী চীনা
বাহিনীকে পরাজিত করে। এই বিজয়ের ফলে মধ্য এশিয়ায় ইসলামের প্রভাব চিরস্থায়ী হয়
এবং চীনের পশ্চিম দিকে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে। এই যুদ্ধে অনেক চীনা কারিগর
বন্দি হন, যাঁদের কাছ থেকে মুসলমানরা প্রথম কাগজ তৈরির কৌশল শেখে। এই প্রযুক্তিটি পরবর্তীতে সমরকন্দ ও বাগদাদে পৌঁছায়
এবং সারা বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়।
অভ্যন্তরীণ
বিদ্রোহ দমন ও মৃত্যু : আস-সাফফাহ যখন ক্ষমতা নেন, তখন সাম্রাজ্যের
অনেক জায়গায় উমাইয়াদের সমর্থকরা বিদ্রোহ করছিল। তাঁর পুরো শাসনকালই কেটেছে এই অভ্যন্তরীণ
বিশৃঙ্খলা দমন করে সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল করতে। সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন অঞ্চলে উমাইয়া
ভক্তরা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও আস-সাফফাহ তাঁর সেনাপতিদের মাধ্যমে অত্যন্ত কঠোরভাবে
সেই বিদ্রোহগুলো দমন করেন। মাত্র ৪ বছর শাসন করার পর ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে গুটিবসন্তে আক্রান্ত
হয়ে আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর ভাই আবু জাফর আল-মনসুরকে উত্তরাধিকারী মনোনীত
করে যান, যাঁকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রকৃত স্থপতি বলা হয়।
আরো জানতে ক্লিক করুন- মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

Comments
Post a Comment