আব্বাসীয় খিলাফতের উজ্জ্বল নক্ষত্র আল-মুক্তাফি বিল্লাহ: (৯০২–৯০৮ খ্রি.)
৯০২ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আল-মুতাদিদের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আল-মুক্তাফি বিল্লাহ (৯০২–৯০৮ খ্রি.) আব্বাসীয় খিলাফতের সপ্তদশ খলিফা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আব্বাসীয় বংশের শেষ অত্যন্ত সফল খলিফাদের একজন। আল-মুতাদিদ তাঁর পুত্রকে এমন একটি সাম্রাজ্য দিয়ে গিয়েছিলেন যা প্রশাসনিক ও সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। ফলে আল-মুক্তাফিকে তাঁর পূর্বসূরিদের মতো তুর্কিদের ষড়যন্ত্র বা সিংহাসন নিয়ে কাড়াকাড়ির মুখোমুখি হতে হয়নি। তিনি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে এবং জনগণের সমর্থনে ক্ষমতায় বসেন।
মিশর ও সিরিয়া পুনরুদ্ধার:
(৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ) এটি ছিল আব্বাসীয় ইতিহাসের এক বিশাল মাইলফলক। দীর্ঘ প্রায় ৩৭ বছর পর মিশর আবার সরাসরি বাগদাদের শাসনে ফিরে আসে। আহমেদ ইবনে তুলুনের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে পড়েছিল। আল-মুক্তাফি এই সুযোগটি গ্রহণ করেন। তিনি প্রখ্যাত সেনাপতি মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান আল-কাতিব-এর নেতৃত্বে এক বিশাল নৌ ও স্থল বাহিনী পাঠান। ৯০৫ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় বাহিনী কায়রোতে প্রবেশ করে। তুলুনিদ রাজবংশের পতন ঘটে এবং তাদের রাজধানী আল-কাতাই ধ্বংস করে দেওয়া হয়। সিরিয়া ও মিশর পুনরায় খিলাফতের সরাসরি প্রদেশে পরিণত হয়। এর ফলে বাগদাদের রাজকোষে আবার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসতে শুরু করে এবং খলিফার আধিপত্য পুরো আরব বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ
যে ,মিশরের তুলুনিদ রাজপরিবার আল-মুক্তাফির সৎ-মায়ের পরিবার ছিল। তারা খলিফার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় বা সৎ-নানা-মামার মতো একটি অবস্থানে ছিলেন। আহমেদ ইবনে তুলুনের উত্তরাধিকারীরা (যেমন হারুন ইবনে খুমারওয়াইহ) প্রজাদের ওপর অত্যাচার এবং কোষাগারের টাকা আমোদ-প্রমোদে ব্যয় করছিলেন। তারা বাগদাদের কেন্দ্রীয় শাসন মানতে চাইছিলেন না। আল-মুক্তাফির সেনাপতি মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান আল-কাতিব যখন মিশর আক্রমণ করেন, তখন তুলুনিদদের নিজেদের ভেতরের সেনাপতিরাই বিশ্বাসঘাতকতা করে আব্বাসীয়দের সাথে হাত মেলায়। ৯০৫ খ্রিস্টাব্দে যখন আব্বাসীয় বাহিনী কায়রো দখল করে, তখন তুলুনিদ পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের বন্দি করে বাগদাদে নিয়ে আসা হয়। আল-মুক্তাফি তাদের প্রতি খুব একটা নিষ্ঠুরতা দেখাননি, বরং তাদের বাগদাদেই নজরদারিতে রাখার ব্যবস্থা করেন। সহজ কথায় তাঁরা ছিলেন খলিফার বাবার শ্বশুরবাড়ির লোক। কিন্তু রাজসিংহাসনের লোভে এবং সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের স্বার্থে আল-মুক্তাফি সেই আত্মীয়তার মায়া ত্যাগ করেছিলেন।
কারমাতিয়দের দমন ও নিরাপত্তা: কারমাতিয়রা ছিল একটি চরমপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যারা তৎকালীন সময়ে মক্কাগামী হাজি কাফেলা এবং বড় বড় শহরগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। তারা বিশ্বাস করত যে খলিফার শাসন অবৈধ। তারা সিরিয়া ও ইরাকের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল। আল-মুক্তাফি তাদের দমনে কোনো আপস করেননি। ৯০৩ ও ৯০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি একাধিক বড় অভিযান পরিচালনা করেন। বিখ্যাত হামার যুদ্ধ-এ কারমাতিয়দের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করা হয় এবং তাদের নেতাদের বন্দি করে বাগদাদে এনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
স্থাপত্য ও বাগদাদের সৌন্দর্যবর্ধন: আল-মুক্তাফি শুধু একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শিল্পমনা শাসক। তিনি বাগদাদের দজলা নদীর তীরে তাঁর পিতার শুরু করা তাজ (The Crown) প্রাসাদের নির্মাণ সম্পন্ন করেন। এই প্রাসাদটি ছিল স্থাপত্যশৈলীর এক বিস্ময়। এটি এতটাই বিশাল ও সুন্দর ছিল যে একে বাগদাদের রত্ন বলা হতো। তিনি অনেকগুলো নতুন বাজার, রাস্তা এবং মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর সময়ে বাগদাদ আবার হারুন-অর-রশিদের আমলের মতো জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আল-মুক্তাফির চরিত্র ও শাসনশৈলী: আল-মুক্তাফি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী এবং মিতব্যয়ী। তিনি তাঁর পিতার মতো নিষ্ঠুর ছিলেন না, বরং সাধারণ মানুষের প্রতি অনেক দয়ালু ছিলেন। তিনি তাঁর রাজত্বকালে অনেক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং অতিরিক্ত কর মওকুফ করেছিলেন। তিনি নিয়মিত জনগণের সাথে দেখা করতেন এবং তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনতেন। তাঁর সময়ে কোনো বড় ধরণের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়নি।
মৃত্যু ও খিলাফতের করুণ পরিণতি: (৯০৮ খ্রি.) মাত্র ৩২ বছর বয়সে আল-মুক্তাফি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যু আব্বাসীয় খিলাফতের জন্য ছিল একটি অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ, আল-মুক্তাফির পর তাঁর ছোট ভাই আল-মুক্তাদির খলিফা হন, যিনি ছিলেন মাত্র ১৩ বছরের এক নাবালক কিশোর। আল-মুক্তাদির ছিলেন বিলাসপ্রিয় এবং অযোগ্য, যাঁর হাত ধরে পুনরায় তুর্কি সেনাপতি ও হারেমের নারীরা ক্ষমতার দখল নেয়।
Comments
Post a Comment