আল-মুহতাদি বিল্লাহকে:(৮৬৯–৮৭০ খ্রি.)

 

 



খলিফা আল-মুতাজের সেই করুণ মৃত্যুর পর তুর্কি সেনাপতিরা আল-মুহতাদি বিল্লাহকে বাগদাদের সিংহাসনে বসায়।তিনি ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের চতুর্দশ খলিফা। তিনি ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের নবম খলিফা আল-ওয়াসিক বিল্লাহর পুত্র। ইসলামের ইতিহাসে তাঁকে আব্বাসীয়দের ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বলা হয়। তিনি যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন খিলাফত তুর্কিদের সীমাহীন পাপ, দুর্নীতি এবং অরাজকতায় ডুবে ছিল।

একটি বিধ্বস্ত সাম্রাজ্যের ভার: খলিফা আল-মুতাজকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় হত্যার পর তুর্কি সেনাপতিরা আল-ওয়াসিকের পুত্র মুহাম্মদকে ডেকে পাঠায়। ৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি আল-মুহতাদি বিল্লাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন।তুর্কিরা ভেবেছিল তিনি পূর্বসূরিদের মতো কেবল নামেই খলিফা থাকবেন। কিন্তু আল-মুহতাদি ছিলেন দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তুর্কিদের দাপট না কমালে খিলাফত ধ্বংস হয়ে যাবে।আল-মুহতাদি খলিফা হওয়ার পর প্রথমেই খিলাফতের হারানো মর্যাদা ও ধার্মিকতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।

তিনি প্রাসাদের সব মদ, নাচ-গান এবং বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করেন। তিনি খলিফাদের বিলাসবহুল রেশমি পোশাক পরা বন্ধ করে সাধারণ মানুষের মতো পশমের পোশাক পরা শুরু করেন।

তিনি নিজেই সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার জন্য সপ্তাহে দুদিন আদালত পরিচালনা করতেন। কোনো সাধারণ নাগরিক যাতে খলিফার কাছে সরাসরি পৌঁছাতে পারে, তিনি সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।

তিনি রাজকোষের অর্থের অপচয় রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেন এবং অনেক দুর্নীতিবাজ তুর্কি আমলার অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন।

খলিফার কৌশলী পদক্ষেপ:  খলিফা অত্যন্ত চতুরতার সাথে তুর্কি সেনাপতিদের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তুর্কিরা একতাবদ্ধ থাকলে খলিফার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তাই তিনি ভাগ করো এবং শাসন করো নীতি গ্রহণ করেন। খলিফা সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক চাল চালেন-

1.      তুর্কি বাহিনীতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সৈন্য ছিল। খলিফা এক গোষ্ঠীর সেনাপতিকে অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রলুব্ধ করেন। এবং উপজাতীয় ও গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ উসকে দিতে থাকেন।

2.      তিনি প্রচার করেন যে, প্রধান সেনাপতি বোগা আল-শারাবি এবং সালিহ ইবনে ওয়াসিফ সাধারণ সৈন্যদের বেতনের টাকা আত্মসাৎ করে নিজেদের বিলাসিতায় ব্যয় করছেন। এতে সাধারণ তুর্কি সৈন্যরা তাদের নিজস্ব সেনাপতিদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

3.      খলিফা গোপনে এক সেনাপতির ষড়যন্ত্রের কথা অন্য সেনাপতিকে জানিয়ে দিতেন। এর ফলে সেনাপতিদের মধ্যে চরম অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয় এবং তারা একে অপরকে শত্রু ভাবতে শুরু করে।

4.      তিনি নিজেকে একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পান, যা তুর্কিদের ওপর এক ধরণের নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

এই কৌশলের সবচেয়ে বড় শিকার ছিলেন দুর্ধর্ষ তুর্কি সেনাপতি বোগা আল-শারাবি।বোগা যখন বুঝতে পারেন খলিফা তাকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তিনি বিদ্রোহের চেষ্টা করেন।কিন্তু খলিফা ততক্ষণে অন্যান্য উপ-সেনাপতিদের নিজের পক্ষে নিয়ে এসেছিলেন।বোগাকে অতর্কিতে বন্দি করা হয় এবং খলিফার সরাসরি আদেশে তার শিরশ্ছেদ করা হয়। বোগার মতো প্রভাবশালী সেনাপতির মৃত্যু তুর্কিদের ইতিহাসে একটি বড় ধাক্কা ছিল।

এই কৌশলের ফলাফল:এই কৌশলের ফলাফল -ভালো ও মন্দ দুই-ই ছিল।

ইতিবাচক ফলাফল:বোগার মৃত্যুদণ্ড দেখে তুর্কি সৈন্যরা প্রথমবার অনুভব করে যে খলিফাও কঠোর হতে পারেন। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্যে কিছুটা চির ধরে।সাধারণ জনগণের চোখে খলিফা একজন শক্তিশালী এবং সাহসী শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

নেতিবাচক ফলাফল: চরম প্রতিহিংসায় তুর্কিরা দমে যাওয়ার বদলে আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে খলিফা বেঁচে থাকলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন।সেনাপতিদের দ্বন্দ্বের ফলে পুরো সামাররা এবং বাগদাদে সামরিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। প্রশাসনিক চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পড়ে।

আল-মুহতাদির বীরত্বপূর্ণ মৃত্যু: (৮৭০ খ্রি.)  তুর্কিরা যখন দেখল যে এই খলিফা তাদের হাতের পুতুল নয়, বরং তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি, তখন তারা একজোট হয়ে বিদ্রোহ করে। ৮৭০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে তুর্কি সৈন্যরা সামাররার রাজপ্রাসাদ অবরোধ করে। খলিফার হাতে মাত্র কয়েক হাজার বিশ্বস্ত সৈন্য ছিল।খলিফা আল-মুহতাদি কেবল প্রাসাদে লুকিয়ে থাকেননি। তিনি নিজে হাতে তলোয়ার তুলে নেন এবং ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন। তিনি সৈন্যদের চিৎকার করে বলছিলেন— হে আল্লাহর বান্দারা! এই জালিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো! কিন্তু তুর্কিদের বিশাল শক্তির সামনে তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনী পরাজিত হয়। তুর্কিরা তাঁকে বন্দি করে এবং অত্যন্ত নির্দয়ভাবে শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। তারা তাঁকে লাথি মারে এবং বিষাক্ত ক্ষত তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত মাত্র এক বছরের শাসনের পর এই মহান ও সাহসী খলিফাকে হত্যা করা হয়।


ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন:মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন:

 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)