খলিফা আল-মুতাজ বিল্লাহ: (৮৬৬–৮৬৯ খ্রি.)

 



খলিফা আল-মুতাজ বিল্লাহ (৮৬৬–৮৬৯ খ্রি.) ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের ত্রয়োদশ খলিফা। তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু দুর্ভাগ্যবান শাসক।তাঁর শাসনকাল ছিল চরম বিশৃঙ্খলা, তুর্কিদের সীমাহীন দাপট এবং রাজকীয় দেউলিয়াত্বের এক করুণ ইতিহাস। আল-মুতাজ সরাসরি উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা পাননি, বরং একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল।আল-মুতাজ ছিলেন খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের দ্বিতীয় পুত্র। তুর্কিরা তাঁকে ভয় পেয়ে কারাগারে আটকে রেখেছিল। কিন্তু যখন খলিফা আল-মুস্তাইন সামাররা ছেড়ে বাগদাদে পালিয়ে যান, তখন তুর্কিরা ক্ষিপ্ত হয়ে আল-মুতাজকে কারাগার থেকে মুক্ত করে খলিফা ঘোষণা করে।

গৃহযুদ্ধ ও ক্ষমতা গ্রহণ: আল-মুতাজ যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন আব্বাসীয় খিলাফত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল।খলিফা আল-মুতাজ বিল্লাহর ক্ষমতা লাভ এবং তার ভাই আল-মুসতাঈনের সাথে এই সংঘাতের ইতিহাস অত্যন্ত নাটকীয়। এই গৃহযুদ্ধকে ইসলামের ইতিহাসে পঞ্চম ফিতনা বা আব্বাসীয়দের মধ্যকার অন্যতম রক্তক্ষয়ী ক্ষমতার লড়াই বলা হয়। আল-মুতাজ খলিফা হওয়ার পর তার ভাই আবু আহমেদ (যিনি মুয়াফফাক নামে পরিচিত) এর নেতৃত্বে একটি বিশাল বাহিনী বাগদাদ দখলের জন্য পাঠান। ৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে প্রায় এক বছর বাগদাদ শহর অবরোধ করে রাখা হয়। দীর্ঘ অবরোধের ফলে বাগদাদে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়। এমনকি শহরের প্রতিরক্ষার জন্য সাধারণ মানুষকেও যুদ্ধে নামানো হয়েছিল। এই যুদ্ধ কেবল দুই ভাইয়ের ছিল না, এটি ছিল মূলত সামাররা বনাম বাগদাদ এবং তুর্কি বনাম তাহিরীয় (পারস্যের একটি প্রভাবশালী পরিবার যারা মুসতাঈনকে সমর্থন করত) শক্তির লড়াই। বাগদাদের প্রাচীরের বাইরে অসংখ্য ছোট-বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে প্রচুর ধন-সম্পদ ও প্রাণের বিনাশ ঘটে। দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার পর এবং বাগদাদবাসীর অসহায়ত্ব দেখে আল-মুসতাঈন বুঝতে পারেন যে তার পক্ষে জয়লাভ করা সম্ভব নয়। তাহিরীয় গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ তাকে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেন। একটি চুক্তির মাধ্যমে ৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মুসতাঈন ক্ষমতা ত্যাগ করতে রাজি হন। শর্ত ছিল যে তাকে মদিনায় নিরাপদে থাকতে দেওয়া হবে। আল-মুসতাঈন পদত্যাগ করার পর আল-মুতাজ সমগ্র সাম্রাজ্যের অবিসংবাদিত খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি পান। কিন্তু ক্ষমতার পথ নিষ্কণ্টক করতে তিনি চুক্তির বরখেলাপ করেন। মদিনায় যাওয়ার পথে মুসতাঈনকে আটক করা হয় এবং আল-মুতাজের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়।

তুর্কিদের দাপট ও আর্থিক সংকট:মুতাজের মাত্র তিন বছরের শাসনকাল ছিল খিলাফতের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। খলিফা আল-মুস্তাইনের সময়ে তুর্কি সেনাপতিদের আধিপত্য এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে খলিফা নিজেই নিজের প্রাসাদে বন্দি হয়ে পড়েছিলেন।খলিফা আল-মুস্তাইন বুঝতে পেরেছিলেন যে তুর্কি সেনাপতিরা তাকে যেকোনো সময় সরিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তুর্কি সেনাদের নিচু স্তরের সৈন্যরা বোগা এবং ওয়াসিফের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল কারণ তারা ঠিকমতো বেতন পাচ্ছিল না। খলিফা এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে তুর্কিদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ভাঙতে চেয়েছিলেন।

বোগা আল-শারাবি যখন খলিফার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছিলেন, তখন খলিফা তার অনুগত কিছু রক্ষীকে ব্যবহার করে বোগাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তবে সরাসরি তলোয়ার দিয়ে হত্যার চেয়েও এটি ছিল একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বোগা যখন বুঝতে পারেন যে সামাররায় তার জীবন বিপন্ন, তখন তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পরে তাকে ধরা হয় এবং তাকে খলিফার নির্দেশে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। পিতা হত্যার মাস্টারমাইন্ড কে শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হওয়া হয়নি, তার কাটা মাথাটি সামাররার রাস্তায় প্রদর্শন করা হয়েছিল যাতে অন্যান্য তুর্কি সেনারা ভয় পায়।এরপর তার দেহটি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

উত্তরাধিকার : আল-মুতাজ ক্ষমতা সংহত করতে গিয়ে নিজের পরিবারের সদস্যদের সাথেও নিষ্ঠুর আচরণ করেন। খলিফা হওয়ার পর তিনি নিজের দুই ভাই আল-মুয়াইয়াদ এবং আল- মুয়াফফাক কে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য কারাগারে নিক্ষেপ করেন। তিনি তার ভাই মুয়ায়্যাদকে এতটাই প্রহার করেন যে কারাগারে তার মৃত্যু হয়। এটি করা হয়েছিল যাতে ভবিষ্যতে কেউ তার ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে না পারে। তবে এই নিষ্ঠুরতা তুর্কিদের আরও সতর্ক করে দেয়। তবে ঐতিহাসিকদের দাবি-তিনি মুয়াইয়াদকে কারারুদ্ধ করেন এবং ঠান্ডায় জমিয়ে হত্যা করেন ।

আল-মুতাজের করুণ মৃত্যু: আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে আল-মুতাজের মৃত্যু ছিল সম্ভবত সবথেকে যন্ত্রণাদায়ক। এটি তুর্কিদের নৃশংসতার এক চরম নিদর্শন। ৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি ও বারবার সৈন্যরা বকেয়া বেতনের দাবিতে প্রাসাদ ঘেরাও করে। খলিফা তাঁদের হাতে টাকা দিতে ব্যর্থ হন। তুর্কিরা খলিফাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে প্রাসাদের বাইরে নিয়ে আসে। তাঁকে প্রচণ্ড তপ্ত রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সৈন্যরা তাঁর শরীরে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে এবং সুঁই দিয়ে তাঁর চামড়া ফুটো করে দেয়। খলিফা পানি পান করতে চাইলে সৈন্যরা তাঁকে পানি দেয়নি। এরপর তাঁকে একটি অন্ধকার ও বাতাসহীন ভূগর্ভস্থ ঘরে বন্দি করে রাখা হয়। তিন দিন ধরে কোনো খাবার ও পানি না পেয়ে তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতে মাত্র ২২ বছর বয়সে আল-মুতাজ মৃত্যুবরণ করেন। আল-মুতাজ ছিলেন সুদর্শন ও শিক্ষিত, কিন্তু অত্যন্ত দুর্বল চরিত্রের শাসক। তিনি দাবার গুটির মতো তুর্কিদের সাথে খেলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই তুর্কিরাই তাঁকে বীভৎসভাবে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যু প্রমাণ করে যে, সামাররায় খলিফার জীবনের মূল্য একটি সাধারণ পশুর চেয়েও কম ছিল।

 

ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন: ইসলামের ইতিহাস

 

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)