আল-মুনতাসির বিল্লাহ: (৮৬১–৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) সোনার খাঁচায় বন্দি খলিফা
খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরই পুত্র আল-মুনতাসির বিল্লাহ আব্বাসীয় খিলাফতের একাদশ খলিফা হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন। তবে পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসলেও তাঁর রাজত্বকাল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং বিষাদময়।হত্যাকাণ্ডের পরদিন সকালেই মুনতাসির নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি জনগণের কাছে প্রচার করেন যে, উজির ফাতহ ইবনে খাকান খলিফাকে হত্যা করায় তুর্কিরা খলিফাকে বাঁচাতে গিয়ে উজিরকে হত্যা করেছে। কিন্তু এই মিথ্যা কেউ বিশ্বাস করেনি।
জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা: ক্ষমতায় বসেই তিনি তাঁর পিতার কিছু কঠোর নীতি শিথিল করেন। তিনি শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেন এবং ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মাজার জিয়ারতের অনুমতি দেন। এর মাধ্যমে তিনি জনগণের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তুর্কিদের হাতের পুতুল: খলিফা আল-মুনতাসিরের অবস্থা ছিল অনেকটা 'সোনার খাঁচায় বন্দি পাখির' মতো। তিনি পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই সিংহাসনের চাবিকাঠি ছিল দুই তুর্কি সেনাপতি বোগা আল-শারাবি এবং ওয়াসিফ-এর পকেটে। এই দুই তুর্কি সেনাপতি আল-মুতাওয়াক্কিল হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন। তাঁরা জানতেন যে মুনতাসির তাঁদের সাহায্য ছাড়া একদিনও ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না।
রাষ্ট্রের বড় কোনো নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা বা কোষাগারের অর্থ খরচ—সবই বোগা ও ওয়াসিফ নির্ধারণ করতেন। খলিফা কেবল তাঁদের দলিলে মোহর মেরে দিতেন।
খলিফার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী থেকে শুরু করে প্রাসাদের পরিচারক পর্যন্ত সবাই ছিল এই দুই সেনাপতির অনুগত। ফলে মুনতাসির কার সাথে কথা বলছেন বা কী ভাবছেন, তার প্রতিটি খবর তাঁদের কাছে পৌঁছে যেত।
আল-মুনতাসির ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ভাইদের (মুতাজ ও মুয়াইয়াদ) ভালোবাসতেন এবং তাঁদের ক্ষতি করতে চাননি। কিন্তু বোগা ও ওয়াসিফ ভয় পাচ্ছিলেন যে, যদি কখনো মুতাজ ক্ষমতায় বসেন, তবে তিনি তাঁর পিতা আল-মুতাওয়াক্কিলের হত্যার প্রতিশোধ নেবেন। তুর্কিরা মুনতাসিরকে বাধ্য করে তাঁর দুই ভাইকে ডেকে এনে জনসমক্ষে উত্তরাধিকার থেকে পদত্যাগ করতে। মুনতাসির অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের ভাইদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে বাধ্য হন, কারণ অস্বীকার করলে তুর্কিরা তাঁকেও সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
আব্বাসীয় খিলাফতের বিশাল
রাজস্ব
তখন
খলিফার
হাতে
আসত
না।
তুর্কি
সৈন্যরা প্রায়ই
বেতন
বাড়ানোর দাবিতে
প্রাসাদ ঘেরাও
করত। বোগা এবং ওয়াসিফ রাজকোষের সিংহভাগ অর্থ তাঁদের নিজস্ব তুর্কি বাহিনীর পেছনে ব্যয় করতেন। খলিফার হাতে নিজের শৌখিনতা বা জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য খুব সামান্য অর্থই অবশিষ্ট থাকত।
ঐতিহাসিক বর্ণনা
অনুযায়ী, একবার
আল-মুনতাসির তাঁর এক ঘনিষ্ঠ
সহচরকে
আক্ষেপে বলেছিলেন—
"আমি এমন এক পাপ করেছি যা আমাকে শান্তি দিচ্ছে না। আমি খলিফা ঠিকই, কিন্তু আমার কোনো হুকুম চলে না। আমি কেবল বোগা আর ওয়াসিফের হাতের খেলনা।"
এই মানসিক চাপ এবং অসহায়ত্বই তাঁকে দ্রুত অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পিতাকে হত্যার বিনিময়ে তিনি যে ক্ষমতা পেয়েছেন, তা আসলে এক বিভীষিকা।
পিতৃঘাতী খলিফার মানসিক যন্ত্রণা ও মৃত্যু: মুনতাসিরের রাজত্বকাল স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৬ মাস।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, মুনতাসির ঘুমাতে পারতেন না। তিনি স্বপ্নে তাঁর পিতাকে দেখতেন, যিনি তাঁকে তলোয়ার হাতে তাড়া করছেন। তিনি সবসময় আতঙ্কে থাকতেন যে তুর্কিরা যেভাবে তাঁর পিতাকে হত্যা করেছে, তাঁকেও হয়তো একইভাবে হত্যা করবে।
৮৬২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যু নিয়ে দুটি মত প্রচলিত আছে:
1.
তুর্কিদের
বিষপ্রয়োগ: তুর্কিরা বুঝতে পেরেছিল মুনতাসির অনুশোচনায় ভুগছেন এবং হয়তো তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাই তারা চিকিৎসকের মাধ্যমে বিষাক্ত অস্ত্রোপচার বা বিষপ্রয়োগে তাঁকে হত্যা করে।
2.
মানসিক আঘাত: পিতাকে হত্যার গ্লানি সইতে না পেরে তিনি হৃদ্রোগে বা মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে মারা যান।
আল-মুনতাসিরের জীবন থেকে ইতিহাসে একটি প্রবাদ পাকাপোক্ত হয় যে— পিতৃঘাতী সন্তান কখনো রাজত্ব ভোগ করতে পারে না। তিনি আব্বাসীয় খিলাফতের সেই পতনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন, যা থেকে এই বিশাল সাম্রাজ্য আর কখনোই ফিরে দাঁড়াতে পারেনি।
আরো জানতে ক্লিক করুন- মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন:

Comments
Post a Comment