খলিফা আল-ওয়াসিকের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই জাফর আল-মুতাওয়াক্কিল (৮৪৭–৮৬১ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় খিলাফতের দশম খলিফা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকাল ছিল আব্বাসীয় ইতিহাসের একটি বড় পরিবর্তনের সময়।
ধর্মীয় সংস্কার: আল-মুতাওয়াক্কিল ক্ষমতায় এসেই তাঁর পূর্বসূরিদের (মামুন, মুতাসিম, ওয়াসিক) দীর্ঘদিনের নীতি বদলে দেন। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুতাজিলা মতবাদ নিষিদ্ধ করেন এবং কুরআন সৃষ্টি কি না—এই বিতর্কিত পরীক্ষার (মিহনা) অবসান ঘটান। তিনি রক্ষণশীল সুন্নি মতবাদকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেন। আল-মুতাওয়াক্কিল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে সসম্মানে কারামুক্ত করেন এবং তাঁর ওপর চলা নির্যাতন বন্ধ করেন। এ কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর সময়ে জিম্মিদের (অমুসলিম নাগরিক) জন্য পোশাকে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহারের মতো কিছু কঠোর নিয়ম চালু করা হয়েছিল।
তুর্কি সেনাপতিদের দমনের চেষ্টা:
খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল খুব ভালো করেই জানতেন যে, তুর্কি সেনাপতিরা রাজপ্রাসাদের ভেতর ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর ভাই আল-ওয়াসিকের মৃতদেহ যখন অবহেলায় পড়ে ছিল এবং বিড়াল যখন তাঁর চোখ খুবলে খেয়েছিল, তখন আল-মুতাওয়াক্কিল সেই লাঞ্ছনা নিজের চোখে দেখেছিলেন। তাই ক্ষমতায় বসার পর থেকেই তিনি তুর্কিদের হাত থেকে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী এবং বিপজ্জনক শতরঞ্জ খেলা শুরু করেন।
1.
ইতাখ ছিলেন আল-মুতাসিমের আমল থেকে সবথেকে শক্তিশালী তুর্কি সেনাপতি। তিনি কেবল সেনাবাহিনী নয়, বরং খলিফার অন্দরমহল এবং গোয়েন্দা বিভাগও নিয়ন্ত্রণ করতেন। আল-মুতাওয়াক্কিল জানতেন, ইতাখকে সরাসরি আক্রমণ করলে তুর্কিরা বিদ্রোহ করবে। তাই তিনি কূটনৈতিক চাল চাললেন। (৮৪৮
খ্রি.) খলিফা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ইতাখকে হজ্জে যাওয়ার প্রস্তাব দেন এবং তাঁকে হজ্জ কাফেলার আমীর নিযুক্ত করেন। এটি ছিল ইতাখের জন্য সম্মানের বিষয়, তাই তিনি রাজি হন। মূলত খলিফা চাচ্ছিলেন ইতাখকে তাঁর শক্তির উৎস সামাররা থেকে দূরে সরাতে। ইতাখ যখন হজ্জ শেষ করে সসম্মানে বাগদাদের দিকে ফিরছিলেন, তখন খলিফা তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য লোক পাঠান। কিন্তু ইতাখ বাগদাদে প্রবেশের পরপরই খলিফার নির্দেশে তাঁকে বন্দি করা হয়। ইতাখকে একটি নির্জন কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়। তুর্কি সৈন্যরা যাতে বিদ্রোহ করতে না পারে, সেজন্য খলিফা প্রচার করেন যে ইতাখ অসুস্থ। ৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে কারাগারেই ইতাখের মৃত্যু হয়। অনেকের মতে, তাঁকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল অথবা অনাহারে রাখা হয়েছিল। ইতাখের পতন ছিল তুর্কিদের জন্য খলিফার পক্ষ থেকে প্রথম বড় সতর্কবার্তা।
2.
ইতাখকে সরানোর পর বাকি তুর্কি সেনাপতিরা (যেমন—বোগা ও ওয়াসিফ) আরও সতর্ক হয়ে যায়। আল-মুতাওয়াক্কিল বুঝতে পারেন, সামাররা শহরটি তুর্কিদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি দেয়ালের কান আছে। তাই তিনি তুর্কিদের প্রভাবমুক্ত একটি নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ার স্বপ্ন দেখেন। ৮৫৯-৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি সামাররা থেকে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার উত্তরে দজলা নদীর তীরে একটি নতুন শহর নির্মাণের কাজ শুরু করেন, যার নাম দেন আল-মুতাওয়াক্কিলিয়া বা সংক্ষেপে জাফরিয়া। তিনি সেখানে কয়েক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয়ে আল-মাউজি নামক একটি জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ এবং একটি বিশাল জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সমস্ত অনুগত আমলা এবং আরব সমর্থকদের নিয়ে সেখানে চলে যেতে। তুর্কিরা বুঝতে পেরেছিল যে খলিফা যদি সামাররা ছেড়ে চলে যান, তবে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে। তারা এই শহর নির্মাণের কাজে পদে পদে বাধা দিতে থাকে। এছাড়া খলিফার নিজস্ব তুর্কি সৈন্যরাও সেখানে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। তুর্কিদের বাধার মুখে তার এই পরিকল্পনা সফল হননি।
স্থাপত্য ও সংস্কৃতি: আল-মুতাওয়াক্কিল ছিলেন একজন শৌখিন নির্মাতা। তাঁর সময়ে সামাররা শহর তার সৌন্দর্যের শিখরে পৌঁছায়। তিনি তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর মালউইয়া বা সর্পিল মিনার। এটি ৫২ মিটার উঁচু এবং বাইরে দিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠা যায়। তিনি দজলা নদীর তীরে আল-মুতাওয়াক্কিলিয়া নামক এলাকায় জাঁকজমকপূর্ণ সব প্রাসাদ ও বাগান তৈরি করেন।
সামরিক অভিযান ও বিদ্রোহ দমন: সামরিক ক্ষেত্রেও তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল- রোমানদের সাথে তাঁর সময়ে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম নৌবাহিনী রোমানদের শক্ত ঘাঁটি দমিয়েটা আক্রমণ করে জয়ী হয়। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান এই অঞ্চলগুলোতে হওয়া বড় বড় বিদ্রোহ তিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করেন এবং খিলাফতের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।
পিতা ও পুত্রের দ্বন্দ্ব ও মৃত্যু: আল-মুতাওয়াক্কিল এবং তাঁর ছেলে মুনতাসিরের মধ্যে সম্পর্ক আগে থেকেই তিক্ত ছিল। আল-মুতাওয়াক্কিল তাঁর বড় ছেলে মুনতাসিরকে অপছন্দ করতেন। তিনি চেয়েছিলেন মুনতাসিরকে সরিয়ে তাঁর দ্বিতীয় ছেলে মুতাজকে পরবর্তী খলিফা করতে। এটি মুনতাসিরের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ভয়ের জন্ম দেয়। খলিফা প্রায়ই রাজদরবারে সবার সামনে মুনতাসিরকে অপমান করতেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, একবার মদ্যপ অবস্থায় খলিফা তাঁর উজির ফাতহ ইবনে খাকানকে আদেশ দেন মুনতাসিরকে চড় মারতে। এমনকি তিনি মুনতাসিরকে কাতিল (হত্যাকারী) বলে গালি দিতেন, যা অনেকটা ভবিষ্যৎবাণীর মতো সত্যি হয়েছিল। খলিফা মুনতাসিরের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দিয়েছিলেন, যা মুনতাসিরকে কোণঠাসা করে ফেলে। তুর্কি সেনাপতিরা (বিশেষ করে বোগা আল-শারাবি এবং ওয়াসিফ) জানতেন যে খলিফা তাঁদের ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছেন। তাঁরা এমন একজনকে খলিফা হিসেবে চেয়েছিলেন যে তাঁদের হাতের পুতুল হয়ে থাকবে।
তুর্কিরা মুনতাসিরের কাছে গিয়ে তাঁকে প্ররোচিত করে। তারা তাঁকে বোঝায় যে, খলিফা জীবিত থাকলে মুনতাসিরের প্রাণ সংশয় আছে। আত্মরক্ষা এবং ক্ষমতার লোভে মুনতাসির তুর্কিদের সাথে হাত মেলান এবং নিজের পিতাকে হত্যার সবুজ সংকেত দেন।
৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১১ই ডিসেম্বর রাত। সামাররার জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে খলিফা তাঁর প্রিয় উজির ফাতহ ইবনে খাকানের সাথে আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত ছিলেন। মুনতাসিরের সহযোগিতায় তুর্কিরা প্রাসাদের প্রধান ফটকের বিশ্বস্ত প্রহরীদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে তুর্কি ঘাতকদের মোতায়েন করে।
গভীর রাতে ৫ জন তুর্কি ঘাতক খোলা তলোয়ার হাতে খলিফার কক্ষে ঢুকে পড়ে। খলিফার উজির ফাতহ ইবনে খাকান তাঁকে বাঁচাতে নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘাতকরা এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে তারা খলিফা এবং উজির—উভয়কেই তলোয়ার দিয়ে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। পাশের ঘরেই অবস্থান করছিলেন মুনতাসির। হত্যাকাণ্ড শেষ হওয়ার পর তিনি ঘরে ঢুকে কান্নার অভিনয় করেন এবং দাবি করেন যে উজির ফাতহ ইবনে খাকানই খলিফাকে হত্যা করেছে, তাই তুর্কিরা উজিরকে পাল্টা হত্যা করেছে। কিন্তু বাগদাদের জনগণ খুব ভালো করেই জানত যে খলিফাকে হত্যার আসল কারিগর কে।
ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন:
Comments
Post a Comment