আব্বাসীয় খিলাফতের ত্রাণকর্তা খলিফা আল-মুতাদিদ বিল্লাহ: (৮৯২–৯০২ খ্রি.)

 




আল-মুতাদিদ বিল্লাহ ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের ষোড়শ খলিফা। তাঁকে ইতিহাসের পাতায় দ্বিতীয় মুতাসিম বা আব্বাসীয়দের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তাঁর শাসনকাল ছিল পতনোন্মুখ আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে নতুন করে প্রাণ দেওয়ার এক অসাধারণ অধ্যায়।

ক্ষমতা লাভ: আল-মুতাদিদ উত্তরাধিকার সূত্রে নয়, বরং নিজের বীরত্ব ও মেধার জোরে ক্ষমতায় এসেছিলেন।তিনি ছিলেন মহান সমরনায়ক মুয়াফফাকের পুত্র। তাঁর পিতা খলিফা না হয়েও সাম্রাজ্য রক্ষা করেছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর আল-মুতাদিদ তাঁর চাচা খলিফা আল-মুতামিদের কাছ থেকে কৌশলে ও শক্তিতে উত্তরাধিকার আদায় করে নেন।৮৯২ খ্রিস্টাব্দে চাচার মৃত্যুর পর তিনি খলিফা হন। তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেন যখন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছিল এবং রাজকোষ ছিল প্রায় শূন্য।

রাজস্ব ব্যবস্থা: আল-মুতাদিদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল অর্থনৈতিক সংস্কার। তৎকালীন সময়ে কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল কর প্রদানের সময়কাল।ইসলামি হিজরি ক্যালেন্ডার (চন্দ্র মাস) অনুযায়ী বছর শেষ হওয়ার সময়টি প্রতি বছর ১০-১১ দিন করে এগিয়ে আসত। কিন্তু কৃষকদের ফসল কাটার সময় নির্ধারিত থাকে ঋতু বা সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। ফলে অনেক সময় ফসল পাকার আগেই কর আদায়ের সময় হয়ে যেত, যা কৃষকদের ঋণের জালে ফেলত।তিনি মুতাদিদীয় ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন, যা ছিল পারস্যের নওরোজ বা সৌর বর্ষের সাথে সংগতিপূর্ণ। তিনি কর আদায়ের তারিখ ২ মাস পিছিয়ে দেন (নওরোজের সাথে মিলিয়ে)। এতে কৃষকরা ফসল বিক্রি করে স্বাচ্ছন্দে কর দেওয়ার সুযোগ পায়।কৃষকদের ওপর জুলুম বন্ধ হওয়ায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং সরকারি কোষাগারে রাজস্বের পরিমাণ বাড়ে।

দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কার ও গোপন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক: আল-মুতাদিদ জানতেন যে, প্রশাসনের ভেতরে ঘুণ ধরলে কোনো সংস্কারই টিকবে না।তিনি খিলাফতের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বা বারিদ কে পুনর্গঠিত করেন। সাম্রাজ্যের প্রতিটি কোণায় তাঁর গোয়েন্দা ছড়িয়ে ছিল। বলা হয়, কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতি করলে বা ষড়যন্ত্র করলে খলিফা তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জেনে যেতেন।কোনো গভর্নর বা কর আদায়কারী সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করলে খলিফা স্বয়ং হস্তক্ষেপ করতেন।দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপোষহীন। তবে তার শাস্তির পদ্ধতিগুলো ছিল অত্যন্ত ভয়ানক (যেমন জ্যান্ত কবর দেওয়া), যা কর্মকর্তাদের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। ফলে আমলারা ঘুষ এবং অপচয় থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়।তিনি রাজকীয় খরচ কমিয়ে আনেন এবং সেই অর্থ সামরিক বাহিনী ও জনকল্যাণে ব্যয় করেন। তিনি রাজকীয় ব্যয়ে ব্যাপক কাটছাঁট করেন এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত করার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফিরে আসে।

রাজধানী বাগদাদে প্রত্যাবর্তন: তিনি সামাররার সেই অভিশপ্ত পরিবেশ (যেখানে একের পর এক খলিফা খুন হয়েছিলেন) ছেড়ে স্থায়ীভাবে রাজধানী আবার বাগদাদে ফিরিয়ে আনেন।সামাররা ছিল তুর্কি দেহরক্ষীদের শক্তিশালী কেন্দ্র। সেখানে খলিফারা মূলত তাদের হাতের পুতুল ছিলেন।আল-মুতাদিদ বুঝতে পেরেছিলেন যে তুর্কিদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে হলে তাদের দুর্গ (সামাররা) ছাড়তে হবে। তিনি রাজধানী আনুষ্ঠানিকভাবে আবার বাগদাদে স্থানান্তর করেন।তিনি বাগদাদের পূর্ব অংশে দার আল-খিলাফাহ নামে বিশাল প্রাসাদ কমপ্লেক্স তৈরি করেন। এটি ছিল সুরক্ষিত এবং তুর্কিদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে।এই  স্থানান্তরের ফলে খলিফার প্রশাসনিক ক্ষমতা সরাসরি জনসাধারণের কাছাকাছি আসে এবং তুর্কি সেনাপতিদের ক্ষমতা সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়ে পড়ে।

সামরিক অভিযান ও বিদ্রোহ দমন: খলিফা আল-মুতাদিদ বিল্লাহ (৮৯২–৯০২ খ্রি.) ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের সেই কাণ্ডারি, যিনি ডুবতে থাকা জাহাজকে টেনে তীরে তুলেছিলেন। তাঁর শাসনকাল ছিল বীরত্ব, কূটনীতি এবং প্রশাসনিক কঠোরতার এক অনন্য সংমিশ্রণ।আল-মুতাদিদ ছিলেন একজন জন্মগত যোদ্ধা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কেবল বাগদাদে বসে আদেশ দিলে খিলাফত টিকবে না।   উত্তর মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত) বিদ্রোহী আরব গোত্র এবং খারিজিদের দমন করতে তিনি নিজে অসংখ্যবার অভিযানে যান। তিনি মসুলে তাঁর কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনেন।

এছাড়া পারস্যের (ইরান) প্রভাবশালী সাফারিদদের আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্ত রক্ষা করতে তিনি শক্তিশালী অবস্থান নেন। যদিও তিনি সব এলাকা সরাসরি দখলে নেননি, কিন্তু তাঁর সামরিক শক্তির ভয়ে বিদ্রোহীরা শান্ত থাকতে বাধ্য হয়।

তুলুনিদদের সাথে সমঝোতা: মিশরের তুলুনিদ রাজবংশ ছিল আব্বাসীয়দের জন্য এক বড় মাথাব্যথা। আল-মুতাদিদ যুদ্ধের বদলে কূটনীতি বেছে নেন। তুলুনিদ শাসক খুমারওয়াইহ-এর সুন্দরী কন্যা কাতর আল-নাদার সাথে খলিফা আল-মুতাদিদ নিজেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ইতিহাসে এই বিবাহটি তার জাঁকজমক এবং যৌতুকের প্রাচুর্যের জন্য বিখ্যাত। এই বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে মিশর ও বাগদাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটে। মিশরীয়রা খলিফাকে তাদের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং বার্ষিক বড় অঙ্কের রাজস্ব বাগদাদে পাঠানো শুরু করে।

তুর্কিদের লৌহকঠিন নিয়ন্ত্রণ: পূর্ববর্তী খলিফাদের যারা তুর্কিরা হত্যা বা অপমান করেছিল, আল-মুতাদিদ তাদের জন্য ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তিনি তুর্কি সেনাপতিদের বুঝতে দিয়েছিলেন যে, সামান্যতম অবাধ্যতার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। তিনি বহু প্রভাবশালী কিন্তু দুর্নীতিবাজ তুর্কি কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে কঠোর শাস্তি দেন। তিনি শুধু তুর্কিদের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয় করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করেন, যাতে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ খলিফাকে জিম্মি করতে না পারে।

চারিত্রিক কঠোরতা ও বিচারব্যবস্থা:  আল-মুতাদিদ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী কিন্তু ভয়ংকর রকমের কঠোর। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এমন সব নিষ্ঠুর পদ্ধতি অবলম্বন করতেন (যেমন—মাটির নিচে জীবন্ত পুঁতে ফেলা), যা শুনলে মানুষের মনে কাঁপন ধরত। তাঁর এই ভীতি সাম্রাজ্যে এক অভূতপূর্ব শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল। বলা হতো, তাঁর ভয়ে বাগদাদের চোর-ডাকাতরা পেশা ছেড়ে দিয়েছিল।

আল-মুতাদিদ ধর্মীয় অন্ধত্ব দূর করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেন। যদি কোনো মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয় না থাকত, তবে তার সম্পত্তি আগে সরাসরি রাষ্ট্র পেত। মুতাদিদ নিয়ম করেন যে, দূরবর্তী আত্মীয় থাকলেও তাদের অংশ দিতে হবে। এছাড়াও তিনি জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনের চর্চাকে উৎসাহিত করেছিলেন। তাঁর সময়ে প্রখ্যাত গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ সাবিত ইবনে কুররা খলিফার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় তিনি উদার হস্তে অর্থ ব্যয় করতেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার: ৯০২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে এই কর্মঠ খলিফা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অত্যধিক পরিশ্রম এবং হয়তো কিছু শারীরিক অসুস্থতা তাঁর দ্রুত মৃত্যুর কারণ ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আল-মুক্তাফি বিল্লাহ খলিফা হন। আল-মুতাদিদের সংস্কারগুলো আব্বাসীয় খিলাফতকে অন্তত আরও এক শতাব্দীর জন্য রক্ষা করেছিল। তার সময়ে রাজকোষের উদ্বৃত্ত অর্থ ৯ মিলিয়ন দিনারে পৌঁছেছিল।আল-মুতাদিদ এমন একটি শক্তিশালী ভিত্তি রেখে গিয়েছিলেন যে, তাঁর পুত্র পরবর্তী বছরগুলোতে খিলাফতকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন।

 

আরো জানতে ক্লিক করুন- মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)