আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম ৩৬ বছর (৭৫০-৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ) এর শাসনকাল...

 


আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ: (৭৫০–৭৫৪ খ্রিস্টাব্দ)

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ-এর শাসনকাল (৭৫০–৭৫৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উমাইয়াদের ১৩২ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি একটি নতুন রাজবংশের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।আবুল আব্বাস ছিলেন মহানবী (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশধর।

জাব নদীর যুদ্ধে বিজয়ের পর আবুল আব্বাস কুফার প্রধান মসজিদে যান এবং সেখানে নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি আমূল পরিবর্তন, কারণ এর মাধ্যমে আরবের রাজনৈতিক কেন্দ্র সিরিয়া (দামেস্ক) থেকে ইরাকের দিকে স্থানান্তরিত হয়।তাঁর মাধ্যমে আব্বাসীয় বিপ্লব সফল হয় এবং তিনি ঘোষণা করেন যে, উমাইয়াদের অন্যায় ও অবিচারের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এখন থেকে ইনসাফ ও নবীর পরিবারের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

আবুল আব্বাস ইতিহাসে আস-সাফফাহ নামে পরিচিত। এই শব্দের অর্থ হলো রক্তপাতকারী বা দাতা। তিনি এই উপাধিটি নিজেই গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর শাসনামলে উমাইয়াদের প্রতি তিনি চরম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, উমাইয়া বংশের একজন সদস্য জীবিত থাকলেও আব্বাসীয় শাসন নিরাপদ হবে না। তাই তিনি তাঁর সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন উমাইয়া রাজপরিবারের ছোট-বড় সকল সদস্যকে খুঁজে বের করে হত্যা করতে।তাঁর নির্দেশে সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে আলী উমাইয়া বংশের প্রায় ৮০ জন প্রভাবশালী সদস্যকে একটি ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানান এবং সেখানে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করেন। এমনকি মৃত উমাইয়া খলিফাদের কবর খুঁড়ে তাঁদের কঙ্কাল পুড়িয়ে ফেলার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও তিনি নিয়েছিলেন। তাঁর এই কঠোরতার কারণেই মূলত তাঁর নামের সাথে আস-সাফফাহ যুক্ত হয়।

প্রশাসনিক কেন্দ্র পরিবর্তন ও রাজধানী স্থাপন: উমাইয়াদের রাজধানী ছিল সিরিয়ার দামেস্কে, কিন্তু আব্বাসীয়দের মূল শক্তি ছিল ইরাক এবং পারস্য (ইরান) অঞ্চলে। তাই আস-সাফফাহ তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনেন। প্রথমে তিনি কুফাকে রাজধানী করলেও সেখানকার মানুষের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি রাজধানী পরিবর্তন করেন। তিনি ফুরাত নদীর তীরে আল-আনবার নামক স্থানে একটি নতুন শহর নির্মাণ করেন এবং একে তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলে আরবের রাজনীতিতে পারস্য বা ইরানি প্রভাব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে । এবং তিনি উমাইয়া আমলের কর্মকর্তাদের সরিয়ে তাঁর অনুগত হাশেমী এবং পারস্যের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান।

তালাসের যুদ্ধ:(৭৫১ খ্রিস্টাব্দ) আস-সাফফাহর শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ঘটনা হলো চীনের ট্যাং রাজবংশের বিরুদ্ধে তালাসের যুদ্ধ। বর্তমান মধ্য এশিয়ার তালাসের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী চীনা বাহিনীকে পরাজিত করে। এই বিজয়ের ফলে মধ্য এশিয়ায় ইসলামের প্রভাব চিরস্থায়ী হয় এবং চীনের পশ্চিম দিকে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে। এই যুদ্ধে অনেক চীনা কারিগর বন্দি হন, যাঁদের কাছ থেকে মুসলমানরা প্রথম কাগজ তৈরির কৌশল শেখে। এই প্রযুক্তিটি পরবর্তীতে সমরকন্দ ও বাগদাদে পৌঁছায় এবং সারা বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়।

অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন ও মৃত্যু : আস-সাফফাহ যখন ক্ষমতা নেন, তখন সাম্রাজ্যের অনেক জায়গায় উমাইয়াদের সমর্থকরা বিদ্রোহ করছিল। তাঁর পুরো শাসনকালই কেটেছে এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমন করে সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল করতে। সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন অঞ্চলে উমাইয়া ভক্তরা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও আস-সাফফাহ তাঁর সেনাপতিদের মাধ্যমে অত্যন্ত কঠোরভাবে সেই বিদ্রোহগুলো দমন করেন। মাত্র ৪ বছর শাসন করার পর ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর ভাই আবু জাফর আল-মনসুরকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান, যাঁকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রকৃত স্থপতি বলা হয়।


 


আবু জাফর আল-মনসুর : (৭৫৪–৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ)

খলিফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই আবু জাফর আল-মনসুর (৭৫৪–৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় খিলাফতের সিংহাসনে বসেন। যদিও আস-সাফফাহ এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু ইতিহাসবিদদের মতে আল-মনসুরই হলেন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রকৃত স্থপতি। তাঁর ২১ বছরের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। আল-মনসুর যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন তাঁর সামনে বড় বড় সব বাধা ছিল। তিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে তাঁর সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দেন।

1.চাচা আবদুল্লাহর বিদ্রোহ: আবদুল্লাহ ছিলেন সিরিয়ার গভর্নর এবং উমাইয়াদের বিরুদ্ধে জাব নদীর যুদ্ধে জয়ী সেনাপতি। খলিফা আস-সাফফাহর মৃত্যুর পর আল-মনসুর যখন খলিফা হন, তখন তাঁর নিজের চাচা আবদুল্লাহ ইবনে আলী খিলাফতের দাবিদার হিসেবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।আবদুল্লাহ দাবি করেন যে, উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় আস-সাফফাহ ওয়াদা করেছিলেন—যিনি মারওয়ান ২-কে পরাজিত করতে পারবেন তিনিই পরবর্তী খলিফা হবেন। সেই হিসেবে তিনি নিজেকে হকের খলিফা মনে করতেন এবং আল-মনসুরের আনুগত্য করতে অস্বীকার করেন। আল-মনসুর এই বিদ্রোহ দমনের জন্য তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাপতি আবু মুসলিম খোরাসানিকে পাঠান। ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে নিসিবিনের যুদ্ধে দীর্ঘ পাঁচ মাস লড়াইয়ের পর আবদুল্লাহর বাহিনী পরাজিত হয়। আবদুল্লাহ পালিয়ে গেলেও পরে তাঁকে বন্দী করা হয় এবং অত্যন্ত কৌশলে একটি লবণাক্ত ভিত্তির ওপর নির্মিত ঘরে রাখা হয়, যা পরে ধসে পড়লে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই বিজয়ের মাধ্যমে আল-মনসুরের পারিবারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটে।

2.আবু মুসলিম খোরাসানিকে হত্যা: এ যেন এক বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস।আবু মুসলিম খোরাসানি ছিলেন আব্বাসীয় বিপ্লবের মূল কারিগর। তাঁর সাহায্য ছাড়া উমাইয়াদের পতন ঘটানো অসম্ভব ছিল।এছাড়া আল-মনসুর এর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাপতি এই আবু মুসলিম খোরাসানি কিন্তু আল-মনসুর তাঁকে নিজের ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করতেন।আবু মুসলিম খোরাসান অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন এবং তাঁর হাতে বিশাল এক অনুগত বাহিনী ছিল। আল-মনসুর ভয় পাচ্ছিলেন যে, আবু মুসলিম যেকোনো সময় নিজেই ক্ষমতা দখল করতে পারেন। বিশেষ করে চাচা আবদুল্লাহ ইবনে আলীর বিদ্রোহ দমনের পর আবু মুসলিমের শক্তি আরও বেড়ে যায়। ৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে আল-মনসুর অত্যন্ত কৌশলে আবু মুসলিমকে রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। আবু মুসলিম যখন খলিফার সাথে দেখা করতে আসেন, তখন আগে থেকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাঁচজন ঘাতক আল-মনসুরের সংকেত পেয়ে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আল-মনসুর তাঁর সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়ে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, ফলে পারস্যের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। তা সামাল দেওয়া খলিফা আল-মনসুরের জন্য ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্ষোভ যখন বিদ্রোহে রূপ নেয়, তখন আল-মনসুর কোনো আলোচনার পথ বেছে নেননি, বরং তলোয়ারের মাধ্যমে তা দমন করেন। আবু মুসলিমের অনুসারীরা 'সুনবাদ' নামক এক নেতার অধীনে উত্তর ইরানে বিশাল বিদ্রোহ শুরু করে। মাত্র ৭০ দিনের মাথায় আল-মনসুর তাঁর সেনাপতি জিয়াদ ইবনে মুশারিককে পাঠিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সেই বিদ্রোহ দমন করেন এবং প্রায় ৬০ হাজার বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয়। এরপর পারস্যে রাওয়ান্দিয়া এবং উস্তাদ সিস-এর মতো আরও কয়েকটি বড় বিদ্রোহ হয়। আল-মনসুর প্রতিটি বিদ্রোহে তাঁর সেরা সেনাবাহিনী পাঠান এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে এই বার্তা দেন যে, আব্বাসীয় শাসনের বিরুদ্ধে কথা বললে মৃত্যু অনিবার্য। এই চরম আতঙ্ক পারস্যের সাধারণ মানুষকে শান্ত হতে বাধ্য করে।এর মাধ্যমে তিনি সাম্রাজ্যের একক ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন।

3.শিয়া বিদ্রোহ দমন:আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসার সময় প্রচার করেছিল যে তারা নবীজির (সা.) পরিবারের (আহলে বায়াত) কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার পর তারা তা নিজেরাই রেখে দেয়। এতে হযরত আলী (রা.)-এর বংশধররা ক্ষুব্ধ হন এবং বিদ্রোহ শুরু করেন। ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে হযরত হাসান (রা.)-এর নাতি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (যাঁকে নফসে জাকিয়া বা পবিত্র আত্মা বলা হতো) মদিনায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁর ভাই ইব্রাহিম ইবনে আবদুল্লাহ বসরায় বিদ্রোহ করেন। মক্কা ও মদিনার অনেক বড় আলেম ও সাধারণ মানুষ তাঁদের সমর্থন দেন। আল-মনসুর এই বিদ্রোহকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে নেন। তিনি মদিনায় বিশাল বাহিনী পাঠান।আহজাব যুদ্ধের সেই বিখ্যাত খন্দক বা পরিখার কাছে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তাঁর ভাই ইব্রাহিমকেও কুফার কাছে বাখামরা নামক স্থানে যুদ্ধে পরাজিত ও হত্যা করা হয়। এই বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে আল-মনসুর প্রমাণ করেন যে, ক্ষমতার প্রশ্নে তিনি আপন-পর বা নবী পরিবারের কারোর সাথেই আপস করবেন না।

স্বপ্নের শহর বাগদাদ নির্মাণ: (৭৬২ খ্রিস্টাব্দ) আল-মনসুরের সবচেয়ে অমর কীর্তি হলো দজলা নদীর তীরে নতুন রাজধানী বাগদাদ শহর নির্মাণ। তিনি এই শহরটিকে গোল বা বৃত্তাকারভাবে তৈরি করেছিলেন, তাই এর নাম ছিল মদিনাতুস সালাম বা শান্তির শহর। শহরের কেন্দ্রে ছিল খলিফার প্রাসাদ এবং জামে মসজিদ। চারদিকে ছিল বিশাল প্রতিরক্ষা দেয়াল এবং চারটি প্রধান ফটক। বাগদাদের অবস্থান এমন ছিল যে এটি খুব দ্রুতই এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই শহরটিই পরবর্তী কয়েকশ বছর ধরে বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

প্রশাসনিক সংস্কার ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা: আল-মনসুর বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল তলোয়ার দিয়ে পারসিকদের মন জয় করা যাবে না। তাই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে পারস্যের প্রভাবশালী পরিবারগুলোকে শাসনের অংশীদার করেন। তিনি পারস্যের বিখ্যাত ও শিক্ষিত বারমাকি পরিবারকে খিলাফতের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেন। খালিদ বিন বারমাককে তিনি তাঁর প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থমন্ত্রী বানান। উমাইয়ারা যেখানে কেবল আরবদের প্রাধান্য দিত, আল-মনসুর সেখানে পারসিকদের বড় বড় সরকারি পদ, গভর্নরের দায়িত্ব এবং সেনাবাহিনীর উচ্চপদে বসান। যখন পারস্যের নেতারা দেখলেন যে উমাইয়াদের চেয়ে আব্বাসীয় আমলে তারা বেশি ক্ষমতা ও মর্যাদা পাচ্ছে, তখন তাদের ক্ষোভ ধীরে ধীরে কমে আসে এবং তারা আব্বাসীয় শাসনের অনুগত হয়ে পড়ে।তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ডাক ও গোয়েন্দা বিভাগ গড়ে তোলেন। সাম্রাজ্যের দূর-দূরান্তে কী ঘটছে, তা তিনি প্রতিদিন খবর রাখতেন। এর ফলে কোনো বিদ্রোহ দানা বাঁধার আগেই তিনি তা দমন করতে পারতেন। আব্বাসীয়দের যে স্বর্ণযুগ আমরা জানি, তার বীজ বপন করেছিলেন আল-মনসুর। তিনি প্রাচীন গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় বিজ্ঞানীদের বইগুলো আরবিতে অনুবাদ করার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিতের ওপর অনেক বই তাঁর সময়েই প্রথম অনূদিত হয়। তাঁর দরবারে দেশ-বিদেশের পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। তিনি মনে করতেন, কেবল তলোয়ার দিয়ে নয়, জ্ঞান দিয়েও সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করা যায়।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার: আবু জাফর আল-মনসুর ছিলেন একাধারে নিষ্ঠুর এবং অত্যন্ত দূরদর্শী। ৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যাওয়ার পথে বি র মায়মুন নামক স্থানে আল-মনসুর ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর পুত্র আল-মাহদীকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। আল-মনসুর মৃত্যুর সময় সরকারি কোষাগারে বিপুল পরিমাণ অর্থ রেখে গিয়েছিলেন, যা পরবর্তী খলিফাদের জন্য সাম্রাজ্য চালানো সহজ করে দিয়েছিল।

 


মুহাম্মদ আল-মাহদী : (৭৭৫–৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ)

খলিফা আবু জাফর আল-মনসুরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুহাম্মদ আল-মাহদী (৭৭৫–৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় খিলাফতের সিংহাসনে বসেন। আল-মনসুরের শাসনকাল ছিল কঠোরতা এবং দমনের, কিন্তু আল-মাহদী ক্ষমতায় এসে সাম্রাজ্যে এক নতুন উদারতা ও শান্তির যুগ নিয়ে আসেন। তাঁর ১০ বছরের শাসনকাল আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের ভিত্তি আরও মজবুত করেছিল।

উদারতা ও জনকল্যাণমূলক কাজ: আল-মাহদী ক্ষমতায় এসেই তাঁর পিতার কঠোর নীতিগুলো শিথিল করেন। আল-মনসুরের সময় রাজনৈতিক কারণে অনেক মানুষকে কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল। আল-মাহদী খলিফা হওয়ার পর একটি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং কারাগারে থাকা প্রায় সকল রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেন। এটি জনগণের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী করে তোলে। আল-মনসুর মহানবী (সা.)-এর বংশধরদের (আলী রা.-এর পরিবার) ওপর যে কঠোরতা করেছিলেন, আল-মাহদী তা বন্ধ করেন। তিনি তাঁদের বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন এবং তাঁদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এর ফলে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ অনেকটা কমে যায়।

আল-মাহদী প্রজাসাধারণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি মক্কা ও মদিনার পথে অসংখ্য সরাইখানা, কূপ এবং হাসপাতাল নির্মাণ করেন। বিশেষ করে মরুভূমির পথে হাজীদের পানির কষ্ট দূর করার জন্য তিনি বিশাল সব জলাধার তৈরি করেছিলেন। তিনি সাম্রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করেন। তাঁর সময়ে ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য নতুন নতুন ডাকঘর (বারিদ) ও রাস্তা তৈরি করা হয়। তিনি মদিনার মসজিদে নববীর ব্যাপক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন এবং মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন।

সামরিক অভিযান ও রোমানদের সাথে যুদ্ধ : যদিও তিনি দয়ালু ছিলেন, কিন্তু সাম্রাজ্যের সীমানা রক্ষায় তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর সময়ে বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের সাথে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ হয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য) প্রায়ই আব্বাসীয় সীমান্তগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। বিশেষ করে রোমান সম্রাজ্ঞী আইরিন যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি আব্বাসীয়দের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। ৭৮২ খ্রিস্টাব্দে আল-মাহদী তাঁর প্রিয় পুত্র হারুন-অর-রশিদকে  প্রায় ৯৪,০০০ থেকে ১ লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী দিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে পাঠান। এই বাহিনীতে অভিজ্ঞ সেনাপতিদের পাশাপাশি কয়েক বছরের যুদ্ধের রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল। যদিও হারুন তখন যুবক ছিলেন, কিন্তু তাঁর দূরদর্শিতা ও সাহস দেখে খলিফা তাঁকে এই অভিযানে সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন। আব্বাসীয় বাহিনী তোরোস পর্বতমালা অতিক্রম করে সরাসরি রোমানদের হৃদপিণ্ড এশিয়া মাইনরে (বর্তমান তুরস্ক) প্রবেশ করে। হারুন-অর-রশিদের বাহিনী পথে থাকা রোমানদের শক্তিশালী দুর্গ মাগিদা জয় করেন। এরপর তারা পিদিয়া নামক স্থানে রোমানদের এক বিশাল প্রতিরোধ বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। রোমানদের হাজার হাজার সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত ও বন্দি হয়। হারুন তাঁর বাহিনী নিয়ে রোমানদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল)-এর ঠিক উল্টো পাশে ক্রাইসোপোলিস (বর্তমান উসকুদর) নামক স্থানে পৌঁছে যান। রোমানরা তাদের খোদ রাজধানীর সামনে মুসলিম বাহিনীর এই উপস্থিতি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কনস্টান্টিনোপল শহরটি সমুদ্র দিয়ে ঘেরা থাকায় তা সরাসরি দখল করা কঠিন ছিল, কিন্তু হারুনের অবরোধ রোমানদের অর্থনীতি ও মনোবল ভেঙে দেয়। সম্রাজ্ঞী আইরিন বুঝতে পারেন যে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাঁর সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। আইরিন বাধ্য হয়ে হারুনের কাছে শান্তি ভিক্ষা করেন এবং দূত পাঠান। হারুন কয়েকটি কঠোর শর্তে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। রোমানরা প্রতি বছর আব্বাসীয় খিলাফতকে ৭০ থেকে ৯০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) দিতে বাধ্য হয়। এছাড়াও মুসলমানদের ১,০০০ বন্দিকে মুক্তি দেওয়া এবং ৩ বছরের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ধর্মীয় আন্দোলন ও ধর্মদ্রোহী দমন শিল্প,সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ : আল-মাহদীর শাসনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জিন্দিক বা ধর্মদ্রোহীদের উত্থান। এরা ইসলামের ছদ্মবেশে মানবীজম বা বিকৃত মতবাদ প্রচার করত। আল-মাহদী ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস রক্ষার জন্য একটি বিশেষ আদালত বা তদন্ত বিভাগ তৈরি করেন। যারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত, তাদের তিনি কঠোরভাবে দমন করেন। তিনি মনে করতেন, সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার জন্য বিশুদ্ধ আকিদা বা বিশ্বাস রক্ষা করা জরুরি। আল-মাহদী নিজে একজন উচ্চশিক্ষিত এবং শিল্পানুরাগী মানুষ ছিলেন। তাঁর সময়ে আব্বাসীয় দরবার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর দরবারে বড় বড় কবি ও সংগীতজ্ঞদের মিলনমেলা বসত। তিনি তাঁদের প্রচুর অর্থ ও সম্মান দিতেন। আল-মনসুর অত্যন্ত মিতব্যয়ী ছিলেন, কিন্তু আল-মাহদীর সময়ে রাজকীয় জৌলুস বাড়তে শুরু করে। বাগদাদের প্রাসাদগুলো রত্ন ও কারুকাজ দিয়ে সাজানো হয়, যা পরবর্তীতে হারুন-অর-রশিদের সময়ে চূড়ান্ত রূপ পায়।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার : খলিফা আল-মাহদী-এর মৃত্যু ছিল অত্যন্ত আকস্মিক এবং ট্র্যাজিক। ৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর এই অকাল মৃত্যু আব্বাসীয় খিলাফতে একটি সাময়িক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। খলিফা আল-মাহদী শিকার করতে খুব পছন্দ করতেন। ৭৮৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে তিনি তাঁর পুত্র হারুন-অর-রশিদ এবং অনুসারীদের নিয়ে ইরানের পাহাড়ি অঞ্চল মাসাবাদান (বর্তমান কেরমানশাহর কাছে)-এ শিকারে যান। শিকার চলাকালীন একটি হরিণ বা বন্য প্রাণীকে তাড়া করতে গিয়ে আল-মাহদী তাঁর ঘোড়া নিয়ে খুব দ্রুত গতিতে একটি পুরনো পরিত্যক্ত দালানের বা ধ্বংসাবশেষের দরজার ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেন। দরজাটি ছিল অত্যন্ত নিচু। ঘোড়াটি দ্রুত গতিতে ভেতরে ঢুকে গেলেও আল-মাহদীর পিঠ বা মেরুদণ্ড দরজার উপরের কাঠামোর সাথে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায়। এই মারাত্মক আঘাতেই তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই বা তার কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪৩ বছর। পিতার মৃত্যুর সময় হারুন-অর-রশিদ পাশেই ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও সাহসের সাথে পরিস্থিতি সামাল দেন। হারুন নিজেই তাঁর পিতার জানাজার নামাজ পড়ান এবং মাসাবাদান অঞ্চলেই তাঁকে দাফন করা হয়। খলিফা আল-মাহদী মারা যাওয়ার খবর শোনার পর রাজধানী বাগদাদে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর দুই পুত্র আল-হাদী এবং হারুন-অর-রশিদকে পর্যায়ক্রমে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে গিয়েছিলেন। আল-মাহদীর মৃত্যু ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

মুসা আল-হাদী: (৭৮৫–৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ)

খলিফা আল-মাহদীর মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে মুসা আল-হাদী আব্বাসীয় খিলাফতের চতুর্থ খলিফা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকাল ছিল মাত্র ১ বছর ৩ মাস, কিন্তু এই অল্প সময়েই রাজপরিবারে চরম উত্তেজনা, ষড়যন্ত্র এবং ক্ষমতার লড়াই দেখা দিয়েছিল।

ক্ষমতা গ্রহণ এবং হারুন-অর-রশিদের সাথে দ্বন্দ্ব : আল-মাহদী চেয়েছিলেন তাঁর দুই ছেলে পর্যায়ক্রমে খলিফা হবেন—প্রথমে আল-হাদী, তারপর হারুন-অর-রশিদ। কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার পর আল-হাদী এই নিয়ম পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন। আল-হাদী চেয়েছিলেন তাঁর নিজের নাবালক পুত্র জাফরকে পরবর্তী খলিফা মনোনীত করতে। এর অর্থ ছিল হারুন-অর-রশিদের বৈধ অধিকার কেড়ে নেওয়া। আল-হাদী সেনাপতি এবং রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যাতে তারা হারুনকে বাদ দিয়ে তাঁর পুত্র জাফরের নামে আনুগত্যের শপথ (বায়াত) গ্রহণ করে। অনেকে ভয়ের কারণে রাজি হলেও অনেকে হারুনের পক্ষে অনড় ছিলেন। আল-হাদী তাঁর ভাই হারুনকে সরাসরি শত্রু মনে করতে শুরু করেন। হারুন যাতে স্বেচ্ছায় তাঁর দাবি ত্যাগ করেন, সেজন্য আল-হাদী বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। হারুনকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার জন্য আল-হাদী তাঁকে নানাভাবে হেনস্তা করতেন। এমনকি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হারুন তাঁর নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। হারুনের শিক্ষক ও প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ইয়াহিয়া ইবনে খালিদ বারমাকি। তিনি হারুনকে পরামর্শ দেন যেন তিনি বিবাদে না জড়িয়ে ধৈর্য ধরেন এবং বাগদাদ ছেড়ে দূরে কোথাও শিকারে চলে যান। হারুন তা-ই করেন, যার ফলে সরাসরি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। হারুন-অর-রশিদের বাগদাদ ছেড়ে গেলে হারুনের শিক্ষক ও প্রধান উপদেষ্টা  ইয়াহিয়া বারমাকি ছিলেন আল-হাদীর প্রধান লক্ষ্য। আল-হাদী তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে ধমক দেন এবং হারুনের পক্ষ ত্যাগ করতে বলেন।

ইয়াহিয়া অত্যন্ত সাহসের সাথে খলিফা আল-হাদীকে বলেন যে, হারুনের অধিকার কেড়ে নিলে এবং নাবালক পুত্রকে খলিফা বানালে সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেবে। এতে খিলাফতের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে। ইয়াহিয়ার এই স্পষ্ট কথা শুনে আল-হাদী ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং ঘোষণা করেন যে, খুব শীঘ্রই তিনি ইয়াহিয়া এবং হারুন—উভয়কেই হত্যা করবেন। পরবর্তীতে হারুন-অর-রশিদ কে ও বন্দি করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে ।

রাজমাতা খায়জুরানের সাথে সংঘাত: এই দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের মা খায়জুরান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। খায়জুরান তাঁর ছোট ছেলে হারুনকে বেশি স্নেহ করতেন এবং মনে করতেন হারুনই খিলাফতের জন্য বেশি যোগ্য। তিনি পর্দার আড়াল থেকে হারুনের অধিকার রক্ষার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আল-হাদী যখন জানতে পারেন তাঁর মা হারুনের পক্ষে কাজ করছেন, তখন তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।তিনি  তাঁর মায়ের এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পছন্দ করেননি। তিনি মাকে আদেশ দেন যে তিনি যেন কেবল ঘরের কাজে সীমাবদ্ধ থাকেন এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কোনো কথা না বলেন।প্রকাশ্য দরবারে মাকে অপমান ও করেন এবং ঘোষণা করেন যে, কোনো কর্মকর্তা যদি তাঁর মায়ের সাথে দেখা করতে যায় তবে তার শিরচ্ছেদ করা হবে। তিনি তাঁর মাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টাও করেছিলেন বলে কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়।

ফাখের যুদ্ধ : (৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে) হযরত আলী (রা.)-এর বংশধর এবং আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে ক্ষমতার যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব ছিল, তার একটি অত্যন্ত করুণ এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হলো ফাখের যুদ্ধ । ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আল-হাদীর শাসনামলে এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। শিয়া মুসলমানদের কাছে কারবালার যুদ্ধের পর এটিই সবচেয়ে শোকাবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা নবী পরিবারের (আহলে বায়াত) হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু তারা তা করেনি, উল্টো আলীর (রা.) বংশধরদের ওপর নজরদারি ও কঠোরতা বাড়িয়ে দেয়। হোসাইন ইবনে আলী ইবনুল হাসান ছিলেন হযরত হাসান (রা.)-এর প্রপৌত্র। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক, সাহসী এবং ইবাদতগুজার মানুষ ছিলেন বলে তাঁকে হোসাইন আল-ফাসি বা হোসাইন আল-আলাভি বলা হতো। খলিফা আল-হাদীর নিযুক্ত মদিনার গভর্নর আলীর (রা.) বংশধরদের সাথে অত্যন্ত অপমানজনক আচরণ শুরু করেন। তাঁদের চলাফেরায় বাধা দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন হাজিরা দিতে বাধ্য করা হয়। এই অপমানের প্রতিবাদে হোসাইন ইবনে আলী মদিনায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মদিনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। হোসাইন ইবনে আলী চাইলেন হজ্জের মৌসুমে মক্কায় গিয়ে সাধারণ মুসলমানদের সমর্থন আদায় করতে। কারণ হজ্জের সময় সারা বিশ্ব থেকে মুসলমানরা সেখানে সমবেত হয়। তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে অনেক লোক তাঁর সাথে যোগ দেয়। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি কেবল ইনসাফ কায়েম এবং নবীজির (সা.) সুন্নাহ পুনরুজ্জীবিত করতে চান। খলিফা আল-হাদী যখন এই খবর পেলেন, তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি হজ্জ পালন করতে আসা আব্বাসীয় রাজপরিবারের সদস্য এবং বিশাল এক সুসজ্জিত বাহিনীকে নির্দেশ দেন এই বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দিতে। মক্কার অদূরে ফাক নামক একটি উপত্যকায় উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়। তারিখটি ছিল ১১ই জিলহজ্জ (৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ)। হোসাইন ইবনে আলীর সাথে ছিল মাত্র কয়েকশ অনুসারী, যারা মূলত ইবাদতকারী এবং সাধারণ মানুষ ছিলেন। অন্যদিকে আব্বাসীয় সেনাপতি মুসা ইবনে ঈসার অধীনে ছিল বিশাল এক পেশাদার সেনাবাহিনী। আব্বাসীয় বাহিনী তীরবৃষ্টির মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করে। হোসাইন ইবনে আলী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে একটি তীরের আঘাতে হোসাইন ইবনে আলী শাহাদাত বরণ করেন। আব্বাসীয় সৈন্যরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রায় সবাইকে হত্যা করে। কারবালার যুদ্ধের মতো এই যুদ্ধের পরেও আব্বাসীয়রা মৃতদেহগুলোর সাথে অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করেছিল। হোসাইন ইবনে আলীসহ প্রায় ১০০ জন শহীদদের মাথা কেটে খলিফা আল-হাদীর কাছে বাগদাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অনেককে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে হত্যা করা হয়।এই ঘটনার নৃশংসতা দেখে তৎকালীন বিখ্যাত আলেমরা অত্যন্ত মর্মাহত হন। ইমাম মুহাম্মদ আল-জাওয়াদ (রহ.) বলেছিলেন,কারবালার পর ফাক-এর ঘটনার মতো আর কোনো বড় ট্র্যাজেডি আমাদের ওপর আসেনি। এই যুদ্ধে সবাই মারা গেলেও হোসাইন ইবনে আলীর চাচাতো ভাই ইদ্রিস ইবনে আবদুল্লাহ অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ইদ্রিস কৌশলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে উত্তর আফ্রিকার মরক্কোতে পৌঁছে যান। সেখানকার বার্বার উপজাতিরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করে। সেখানে তিনি ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে স্বতন্ত্র ইদ্রিসীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের হাত থেকে বের হয়ে যাওয়া প্রথম কোনো স্বাধীন শিয়া রাষ্ট্র। অর্থাৎ, ফাখের যুদ্ধে আব্বাসীয়রা জিতলেও এর ফলেই তারা উত্তর আফ্রিকার নিয়ন্ত্রণ চিরতরে হারিয়ে ফেলে।

আল-হাদীর রহস্যময় মৃত্যু ও ঐতিহাসিক রাত: দ্বন্দ্ব যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং হারুন ও ইয়াহিয়ার জীবন যখন সংকটের মুখে, ঠিক তখনই এক অলৌকিক বা রহস্যময় ঘটনা ঘটে। ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দের এক রাতে আল-হাদী হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। খলিফা মুসা আল-হাদীর মৃত্যু ছিল আব্বাসীয় ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এবং নাটকীয় ঘটনা। মাত্র ২৪-২৫ বছর বয়সে তাঁর এই আকস্মিক বিদায় এক রাতের মধ্যে পৃথিবীর মানচিত্র এবং রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

সরকারি নথিপত্র এবং অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, আল-হাদী কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হননি, বরং তিনি প্রাকৃতিক কারণেই মারা গিয়েছিলেন। বলা হয়, আল-হাদী পেটের কোনো কঠিন রোগে (সম্ভবত আলসার বা পাকস্থলীর ক্ষত) ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকেই তিনি তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ইরাকের ঈসাবাদ নামক স্থানে তিনি অবস্থান করছিলেন। সেখানে যন্ত্রণার তীব্রতা বেড়ে গেলে তিনি হঠাৎ করেই মারা যান। মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে খুব কম মানুষই উপস্থিত ছিল।

অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন, আল-হাদীর মৃত্যু ছিল একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার মূল কারিগর ছিলেন রাজমাতা খায়জুরান।রাজমাতা খায়জুরান যখন দেখলেন আল-হাদী তাঁর ছোট ছেলে হারুনকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন, তখন খায়জুরান নিজের প্রিয় পুত্র হারুনকে বাঁচাতে চরম সিদ্ধান্ত নেন। বর্ণিত আছে যে, আল-হাদী যখন অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় ছিলেন, তখন খায়জুরানের নির্দেশে তাঁরই কয়েকজন বিশ্বস্ত দাসী বালিশ চাপা দিয়ে বা আল-হাদীর বুকের ওপর বসে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে, তাঁকে খাবারে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

আল-হাদীর মৃত্যুর রাতটি ইসলামের ইতিহাসে এক অলৌকিক রাত হিসেবে পরিচিত। এই এক রাতেই তিনটি এমন ঘটনা ঘটেছিল যা আগে কখনো হয়নি 1.এক খলিফার মৃত্যু- উগ্র মেজাজের খলিফা আল-হাদী মৃত্যুবরণ করেন। 2.নতুন খলিফার অভিষেক- একই রাতে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে হারুন-অর-রশিদ আব্বাসীয় খিলাফতের সিংহাসনে বসেন। 3.ভবিষ্যৎ খলিফার জন্ম- ঠিক সেই রাতেই হারুন-অর-রশিদের পুত্র আল-মামুন জন্মগ্রহণ করেন, যিনি পরবর্তীতে আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ খলিফা হয়েছিলেন।

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)