খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক: (৭০৫–৭১৫ খ্রি.)

 


খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক (ওয়ালিদ ১) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের সবচেয়ে সফল এবং প্রভাবশালী শাসকদের একজন। তাঁর ১০ বছরের শাসনকালকে ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বা সম্প্রসারণের শ্রেষ্ঠ সময় বলা হয়। তাঁর পিতা আবদুল মালেক সাম্রাজ্যে যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছিলেন, ওয়ালিদ তার ওপর ভিত্তি করে এক বিশাল বৈশ্বিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

অভূতপূর্ব ভৌগোলিক বিস্তার (তিন মহাদেশে ইসলাম):

ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের আমলেই মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা সবদিকে সবচেয়ে বেশি প্রসারিত হয়েছিল। তাঁর দক্ষ সেনাপতিদের মাধ্যমে তিনি একই সাথে তিনটি ভিন্ন দিকে বিজয় অভিযান পরিচালনা করেন-

ইউরোপ বিজয়: (৭১১ খ্রিস্টাব্দ)এটি ছিল মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক সামরিক অভিযান। সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ৭,০০০ সৈন্য নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দিয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন।তারিক বিন জিয়াদের বীরত্ব ছিল প্রবাদপ্রতিম। স্পেনের উপকূলে অবতরণ করার পর তিনি তাঁর সৈন্যদের পিছু হটার সব পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নিজের জাহাজগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর বাহিনীকে বলেছিলেন,

সামনে শত্রু আর পেছনে সমুদ্র, পালানোর কোনো পথ নেই। এখন বিজয় অথবা শাহাদাত—এই আমাদের পথ।

৭১১ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের রাজা রডারিকের বিশাল বাহিনীর (প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য) সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়। অসম যুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তারিক বিন জিয়াদের রণকৌশল এবং ঈমানি শক্তির কাছে রডারিক পরাজিত ও নিহত হন। এই বিজয়ের পর একের পর এক কর্ডোভা, টলেডো ও সেভিল মুসলিমদের অধীনে আসে। এর মাধ্যমে ইউরোপে দীর্ঘ ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক স্বর্ণযুগ শুরু হয়।

ভারত অভিযান: (৭১১ - ৭১২ খ্রিস্টাব্দ) সিন্ধু ও মুলতান বিজয়

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রবেশের প্রধান কৃতিত্ব কিশোর সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম-এর। এই অভিযানের মূল কারণ ছিল সিন্ধুর রাজা দাহিরের আশ্রিত জলদস্যুদের মাধ্যমে মুসলিম বণিকদের জাহাজ লুণ্ঠন এবং বন্দীদের মুক্তি দিতে দাহিরের অস্বীকার। মাত্র ১৭ বছর বয়সে মুহাম্মদ বিন কাসিম ৬,০০০ অশ্বারোহী এবং অত্যাধুনিক মানজানিক (পাথর নিক্ষেপকারী যন্ত্র) নিয়ে সিন্ধু অভিমুখে যাত্রা করেন।৭১২ খ্রিস্টাব্দে রাওয়ার নামক স্থানে রাজা দাহিরের বিশাল সৈন্যবাহিনী এবং হস্তিবাহিনীর মুখোমুখি হন কাসিম। কাসিম অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে দাহিরের হাতির পিঠে থাকা হাওদায় অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন এবং দাহির নিহত হন। সিন্ধু জয়ের পর তিনি মুলতান পর্যন্ত অধিকার করেন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল তাঁর ইনসাফপূর্ণ শাসন। তিনি স্থানীয় হিন্দুদের ওপর কোনো ধর্মীয় জবরদস্তি করেননি এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন, যার ফলে অনেকেই স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

 

মধ্য এশিয়া বিজয়: (৭০৫ - ৭১৫ খ্রিস্টাব্দ) মাওয়ারাননহর বা ট্রান্সঅক্সিয়ানা অভিযান

মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ মরুভূমি ও পার্বত্য অঞ্চল বিজয় করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। এই অসাধ্য সাধন করেন উমাইয়াদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জেনারেল কুতাইবা বিন মুসলিম।

প্রধান শহরগুলোর বিজয়: কুতাইবা বিন মুসলিম ধাপে ধাপে বর্তমান উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কিরগিজস্তানের অঞ্চলগুলো জয় করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল বুখারা, সমরকন্দ এবং খোয়ারিজম বিজয়। এই শহরগুলো ছিল তৎকালীন সিল্ক রোডের (রেশম পথ) প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র।

চীনা সীমান্তের দিকে যাত্রা: কুতাইবা বিজয়ী বেশে অগ্রসর হয়ে বর্তমান চীনের কাশগড় পর্যন্ত পৌঁছে যান। বলা হয়, চীনের সম্রাট মুসলিম বাহিনীর শক্তিতে ভীত হয়ে একটি শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হন এবং জিজিয়া কর দিতে রাজি হন।

কুতাইবার এই বিজয়ের ফলে মধ্য এশিয়ার তুর্কি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের প্রসার ঘটে। বুখারা ও সমরকন্দ পরবর্তীতে বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয় (যেখান থেকে পরবর্তীতে ইমাম বুখারীর মতো মহান মনীষীরা উঠে আসেন)।

এই তিনটি বিজয় ছিল খলিফা ওয়ালিদের দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং তাঁর সেনাপতিদের অবিশ্বাস্য সাহসিকতার ফল। এক দশকের মধ্যেই মুসলিম সাম্রাজ্য পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে পূর্বে ভারতের সিন্ধু নদ এবং উত্তরে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের শাসনামলে উমাইয়া খিলাফত তার ভৌগোলিক বিস্তৃতির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিল। সেই সময় বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৩০টিরও বেশি আধুনিক দেশ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তাঁর শাসনের অধীনে ছিল।

এশিয়া মহাদেশ (মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া):

আরব উপদ্বীপ: বর্তমান সৌদি আরব, ইয়েমেন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইন।

মধ্যপ্রাচ্য: সিরিয়া (সাম্রাজ্যের কেন্দ্র), লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং ইরাক।

পারস্য অঞ্চল: বর্তমান ইরান এবং আফগানিস্তানের সম্পূর্ণ অংশ।

ভারতীয় উপমহাদেশ: বর্তমান পাকিস্তান (সিন্ধু ও মুলতান অঞ্চল) এবং ভারতের রাজস্থান ও গুজরাটের কিছু সীমান্ত এলাকা।

মধ্য এশিয়া: বর্তমান উজবেকিস্তান (সমরকন্দ ও বুখারা), তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান এবং কাজাখস্তানের দক্ষিণাঞ্চল। এমনকি চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত তাঁর প্রভাব ছিল।

আফ্রিকা মহাদেশ (উত্তর আফ্রিকা):

মিশর: এটি ছিল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র।

মাগরেব অঞ্চল: বর্তমান লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া এবং মরক্কো। এই অঞ্চলগুলো জয় করার পরই মুসলিমরা ইউরোপে প্রবেশের পথ খুঁজে পায়।

ইউরোপ মহাদেশ:আইবেরীয় উপদ্বীপ বর্তমান স্পেন এবং পর্তুগালের প্রায় ৯০% এলাকা তাঁর অধীনে চলে আসে (যা তখন আন্দালুসিয়া নামে পরিচিত ছিল)।

অন্যান্য: ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন দ্বীপ যেমন সাইপ্রাস এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের কিছু সীমান্ত এলাকাও তাঁর শাসনের আওতায় আসতে শুরু করেছিল।

গুরুত্বপূর্ণ শহরসমূহ (সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র):

তাঁর শাসনামলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ শহরগুলো উমাইয়াদের অধীনে ছিল-

দামেস্ক: সাম্রাজ্যের রাজধানী (বর্তমান সিরিয়া)।

মক্কা ও মদিনা: ইসলামের পবিত্রতম দুই শহর।

জেরুজালেম: যেখানে তিনি কুব্বাত আস-সাখরা নির্মাণ সম্পন্ন করেছিলেন।

কায়রো (ফুস্তাত): উত্তর আফ্রিকার প্রশাসনিক কেন্দ্র।

সমরকন্দ ও বুখারা: মধ্য এশিয়ার বাণিজ্য ও শিক্ষার কেন্দ্র।

কর্ডোভা: স্পেনের প্রশাসনিক কেন্দ্র।

স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ ও উমাইয়া মসজিদ নির্মাণ:

ওয়ালিদ স্থাপত্যকলার প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে অমর কীর্তি হলো সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে উমাইয়া জামে মসজিদ (The Great Mosque of Damascus) নির্মাণ। এটি তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ও বৃহত্তম স্থাপত্য ছিল। তিনি এই মসজিদ তৈরিতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, মার্বেল পাথর এবং মোজাইক ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়াও তিনি মদিনায় মসজিদে নববীর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটান এবং মদিনার গভর্নরের (উমর ইবনে আবদুল আজিজ) মাধ্যমে সেখানে মেহরাব ও মিনারের নকশায় নতুনত্ব আনেন।

জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও আধুনিক সেবামূলক ব্যবস্থা :

ওয়ালিদ কেবল একজন বিজেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দরদী শাসক। তিনিই প্রথম ইসলামি বিশ্বে সুসংগঠিত জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা চালু করেন।তিনি অন্ধ, পঙ্গু এবং কুষ্ঠরোগীদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রত্যেক অন্ধ ব্যক্তির সহায়তার জন্য একজন করে পথপ্রদর্শক এবং পঙ্গু ব্যক্তিদের জন্য একজন করে সেবক সরকারি খরচে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।তিনিই মুসলিম ইতিহাসে প্রথম বিশেষায়িত হাসপাতাল বা মারিস্তান নির্মাণ করেন যেখানে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও খাবার দেওয়া হতো। সাম্রাজ্যের অর্থনীতি মজবুত করার জন্য তিনি ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন করেন। কাফেলা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে তিনি দীর্ঘ পথগুলোতে নতুন রাস্তা নির্মাণ করেন এবং রাস্তার মোড়ে মোড়ে কূপ খনন করেন যাতে পথিকদের পানির কষ্ট না হয়।অনুর্বর জমিকে চাষযোগ্য করার জন্য তিনি অসংখ্য খাল ও সেচনালা খনন করেন। এর ফলে কৃষিতে বিপ্লব ঘটে এবং সাম্রাজ্যের রাজস্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাঁর পিতা আবদুল মালেক বিদ্রোহ দমন করে যে কঠোর শাসন শুরু করেছিলেন, ওয়ালিদ তাকে নমনীয়তা এবং দক্ষতার মাধ্যমে ধরে রাখেন। তাঁর শাসনামলে সাম্রাজ্যের ভেতরে বড় ধরণের কোনো গৃহযুদ্ধ বা বিদ্রোহ হয়নি। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মতো দক্ষ (যদিও কঠোর) প্রশাসকদের মাধ্যমে তিনি ইরাক ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলেন। শান্তি বজায় থাকায় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল।

উত্তরাধিকার ও মৃত্যু :৭১৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর ভাই সুলাইমান বিন আবদুল মালেককে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যান। যদিও ওয়ালিদ তাঁর নিজের ছেলেকে খলিফা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিবারের চাপে তিনি তাঁর পিতার করা চুক্তি (সুলাইমানকে উত্তরাধিকারী করা) মেনে নিতে বাধ্য হন।খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের সময়কাল ছিল মুসলমানদের সামরিক শক্তি, স্থাপত্যশৈলী এবং জনকল্যাণের এক অনন্য সংমিশ্রণ। তাঁর আমলেই ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।


Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)