ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক (৭২০–৭২৪ খ্রিস্টাব্দ):


হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর মৃত্যুর পর ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক (ইয়াজিদ ২) ক্ষমতায় বসেন।তিনি ছিলেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পুত্র। তাঁর শাসনকাল (৭২০-৭২৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিল উমাইয়া ইতিহাসের এক বিপরীতমুখী অধ্যায়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ যে ন্যায়বিচার ও মিতব্যয়িতার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, দ্বিতীয় ইয়াজিদ ক্ষমতায় এসে তা প্রায়  পুরোপুরি পাল্টে ফেলেন।

উমাইয়া খিলাফতের বিপরীতমুখী অধ্যায়: ইসলামি ইতিহাসের মহান ও ন্যায়পরায়ণ খলিফা হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত কিন্তু গৌরবময় শাসনের পর, ৭২০ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক (দ্বিতীয় ইয়াজিদ)। তিনি ছিলেন শক্তিশালী খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পুত্র।

উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) যে ইনসাফ, সাম্য এবং মিতব্যয়িতার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেছিলেন, দ্বিতীয় ইয়াজিদের চার বছরের (৭২০-৭২৪ খ্রিস্টাব্দ) শাসনকাল ছিল তার ঠিক বিপরীত। রাজপরিবারের চাপ, ব্যক্তিগত বিলাসিতা এবং ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে তাঁর আমলটি উমাইয়া রাজবংশের পতনের পথকে আরও সুগম করে তুলেছিল।

উমরের সংস্কার বাতিল ও রাজকীয় বিলাসিতার প্রত্যাবর্তন: ক্ষমতায় বসার পরপরই দ্বিতীয় ইয়াজিদ উমাইয়া রাজপরিবারের তীব্র চাপের মুখে পড়েন। উমর ইবনে আবদুল আজিজের কঠোর ন্যায়বিচারের কারণে রাজপরিবারের সদস্যরা যেসব অন্যায় সুযোগ-সুবিধা এবং সম্পত্তি হারিয়েছিলেন, তা ফিরে পাওয়ার জন্য তারা ব্যাকুল ছিল।

·         বায়তুল মালের অপব্যবহার: ইয়াজিদ ২ ক্ষমতায় এসেই উমর (রহ.)-এর প্রবর্তিত সাধারণ ও কৃচ্ছ্রসাধনের জীবনযাপনের নীতি পুরোপুরি ত্যাগ করেন। তিনি পুনরায় দামেস্কের রাজপ্রাসাদে প্রাক-ইসলামি রাজকীয় বিলাসিতা ফিরিয়ে আনেন এবং বায়তুল মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) অর্থ নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আমোদ-প্রমোদে নির্বিচারে ব্যয় করতে শুরু করেন।

·         জিজিয়া করের পুনর্বহাল: উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) অমুসলিম থেকে সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী (মাওয়ালি)-দের ওপর থেকে বৈষম্যমূলক জিজিয়া কর তুলে নিয়েছিলেন, যা ইসলামের মূল নীতি। কিন্তু দ্বিতীয় ইয়াজিদ রাজস্ব বৃদ্ধির অজুহাতে নবদীক্ষিত মুসলমানদের ওপর পুনরায় এই কর চাপিয়ে দেন। এর ফলে সাম্রাজ্যের অগণিত মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয় এবং তারা উমাইয়া শাসনের ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।

মারাত্মক গোত্রীয় কোন্দল ও সামরিক ফাটল: উমাইয়া সাম্রাজ্যের ভেতরের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং একই সাথে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল আরব গোত্রপ্রীতি। উমর (রহ.) তাঁর শাসন আমলে এই গোত্রীয় বৈষম্য দূর করে সবাইকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ইয়াজিদ সেই ভারসাম্য নষ্ট করেন।

·         মুদারি গোত্রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব: খলিফা ইয়াজিদ ২ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কারণে মুদারি (উত্তর আরবীয়) গোত্রের প্রতি অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। তিনি শাসনের শীর্ষপদ, প্রাদেশিক গভর্নর এবং সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো থেকে ইয়ামানি (দক্ষিণ আরবীয়) নেতাদের সরিয়ে কেবল মুদারিদের নিয়োগ দিতে শুরু করেন।

  আরো জানতে ক্লিক করুন: বাংলার ইতিহাস

·         সেনাবাহিনীতে বিভক্তি: এই প্রকাশ্য বৈষম্যের কারণে ইয়ামানি গোত্রের মুসলমান ও সৈন্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। যে উমাইয়া সেনাবাহিনী একসময় রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তারা এখন নিজেদের ভেতরের গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই গোত্রীয় কোন্দলই পরবর্তীতে উমাইয়াদের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দেয়।

বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও সামরিক স্থবিরতা: হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) যুদ্ধের চেয়ে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে শান্তি ও ইসলাম প্রচারের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। ইয়াজিদের আমলে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার চেষ্টা হলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

·         খাজার তুর্কিদের আক্রমণ: ককেশাস অঞ্চলে শক্তিশালী খাজার তুর্কিরা মুসলিম সীমান্তগুলোতে ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করে। ইয়াজিদের দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং সেনাবাহিনীতে গোত্রীয় কোন্দল থাকার কারণে এই আক্রমণগুলো শক্ত হাতে প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছিল না। সীমান্ত রক্ষা করতে মুসলিম বাহিনীকে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

·         সাম্রাজ্যের সংকোচন: খলিফা ওয়ালিদ বা সুলাইমানের আমলে উমাইয়া সাম্রাজ্য যেভাবে সিন্ধু থেকে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, ইয়াজিদের আমলে সেই সামরিক গৌরব পুরোপুরি থমকে যায়। উল্টো, কিছু কিছু সীমান্তবর্তী এলাকা মুসলিমদের হাতছাড়া হতে শুরু করে।

আব্বাসীয় আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি (গোপন দাওয়াত): দ্বিতীয় ইয়াজিদের এই বিশৃঙ্খল, বৈষম্যমূলক এবং বিলাসবহুল শাসনের সবচেয়ে বড় সুবিধা নেয় আবাসীয়রা। উমাইয়াদের প্রতি জনগণের এই অসন্তোষকে পুঁজি করে তারা তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমে পড়ে।

তারা গোপনে সাধারণ মানুষ এবং মাওয়ালিদের (অন-আরব মুসলিম) কাছে প্রচার করতে থাকে যে, উমাইয়া রাজবংশ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র পরিবারের (আহলুল বাইত) ওপর জুলুম করে ক্ষমতা দখল করেছে এবং তারা ইসলামের সঠিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। ইয়াজিদের আমলেই আব্বাসীয়দের এই গোপন দাওয়াত বা বিপ্লবের ভিত্তি মজবুত হয়, যা এর মাত্র আড়াই দশকের মধ্যে উমাইয়া খিলাফতকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল।

আমোদ-প্রমোদ ও খামখেয়ালি মৃত্যু: ইতিহাসে ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার চেয়ে ব্যক্তিগত শৌখিনতা, সঙ্গীতানুরাগ এবং আমোদ-প্রমোদের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ও সমালোচিত। তিনি তাঁর দুই প্রিয় দাসী— হাব্বাহ এবং সালামাহর প্রতি অন্ধভাবে আসক্ত ছিলেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের মতে, খলিফা তাঁর শাসনের অধিকাংশ সময় রাজকার্য ফেলে গান-বাজনা, মদ্যপান এবং এই দাসীদের সঙ্গেই কাটিয়ে দিতেন। ফলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাজে চরম অবহেলা ও স্থবিরতা দেখা দেয়। ৭২৪ খ্রিস্টাব্দ একদিন এক আমোদ-প্রমোদের আসরে গলায় ডালিমের দানা আটকে (মতান্তরে অন্য কারণে) প্রিয় দাসী হাব্বাহ আকস্মিকভাবে মারা যান। হাব্বাহর মৃত্যুতে খলিফা ইয়াজিদ এতটাই স্তব্ধ ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন যে, তিনি কয়েকদিন যাবত তার মরদেহ দাফন করতেও অস্বীকৃতি জানান। এই গভীর শোক সহ্য করতে না পেরে, হাব্বাহর মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন পরই ৭২৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি নিজেও মৃত্যুবরণ করেন।

খলিফা দ্বিতীয় ইয়াজিদের চার বছরের শাসনকাল ছিল উমাইয়া ইতিহাসের একটি চরম অন্ধকার অধ্যায়। তাঁর খামখেয়ালি স্বভাব, বিলাসিতা এবং গোত্রীয় পক্ষপাতিত্ব খিলাফতের পবিত্র মর্যাদা ও গৌরবকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) যে ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন, দ্বিতীয় ইয়াজিদ তাকে পুনরায় পতনের মুখে ঠেলে দেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছিল ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় বিপ্লবের মাধ্যমে উমাইয়াদের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে।

 

  আরো জানতে ক্লিক করুন: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

 

 


Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)