উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)(৭১৭–৭২০ খ্রিস্টাব্দ)
উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর ক্ষমতা গ্রহণ:
সুলাইমান বিন
আবদুল মালেক
যখন সিরিয়ার
দাবিক নামক
স্থানে মৃত্যুশয্যায়
ছিলেন, তখন তাঁর
উপদেষ্টা রাজা ইবনে হাইওয়াহ তাঁকে
পরামর্শ দেন
যে, উমাইয়া রাজবংশের
টিকে থাকার
জন্য এবং
আল্লাহর সন্তুষ্টির
জন্য একজন
পরহেজগার শাসক
প্রয়োজন। সুলাইমান
এই পরামর্শ
গ্রহণ করে
একটি সিলমোহরকৃত
পত্রে উমর
ইবনে আবদুল
আজিজের নাম
লিখে যান।
সুলাইমানের জানাজা শেষ হওয়ার পরপরই সেই পত্রটি জনগণের সামনে পড়া হয়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) খলিফা হওয়ার খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে যান এবং তিনি প্রথমে এই বিশাল দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন।
তিনি উপস্থিত জনতাকে বলেন, আমি তোমাদের ওপর খলিফা হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা পোষণ করি না, তোমরা চাইলে অন্য কাউকে বেছে নিতে পারো। কিন্তু জনতা সমস্বরে তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে তিনি শেষ পর্যন্ত খিলাফতের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।বিলাসিতা বর্জন
ও শাসনকাল: ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি রাজকীয় বিলাসিতা পুরোপুরি ত্যাগ করেন। খলিফা হওয়ার পর, তিনি রাজকীয় প্রথা অনুযায়ী দামি ঘোড়া এবং দেহরক্ষী নিতে অস্বীকার করেন। তিনি নিজের সাধারণ গাধায় চড়ে মসজিদে যান । তিনি উমাইয়া রাজপরিবারের সেই আমলাতান্ত্রিক ও ভোগবাদী ধারাকে পরিবর্তন করে খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেন।
উমাইয়া বংশের আগের খলিফারা এবং তাঁদের আত্মীয়রা সাধারণ মানুষের জমি ও সম্পদ জোরপূর্বক দখল করে রেখেছিলেন। উমর ইবনে আবদুল আজিজ ক্ষমতায় এসেই রাজপরিবারের সেই বিশেষ সুবিধাগুলো বন্ধ করে দেন।তিনি রাজপরিবারের সদস্যদের হাত থেকে অবৈধভাবে দখল করা জমি কেড়ে নিয়ে প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দেন। এমনকি উমাইয়া বংশের পূর্ববর্তী খলিফাদের নামীয় অন্যায় সুযোগ-সুবিধাও তিনি বাতিল করেন।
তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মতো কঠোর শাসকদের দ্বারা নিযুক্ত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেন এবং প্রতিটি গভর্নরকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করেন।
তাঁর মাত্র আড়াই বছরের শাসনামলে অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই উন্নত হয়েছিল যে, ইতিহাসে বলা হয়— আরবে যাকাত নেওয়ার মতো কোনো গরিব মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না।
আগের শাসনামলে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য যারা নতুন মুসলমান হতো , তাদের ওপরও জিজিয়া কর বসানো হতো। উমর ইবনে আবদুল আজিজ এই অন্যায্য প্রথা কঠোরভাবে বন্ধ করেন।
জিজিয়া কর বাতিল করার ফলে অমুসলিমরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। যখন রাজস্ব কর্মকর্তারা অভিযোগ করলেন যে এতে সরকারি আয় কমে যাচ্ছে, তখন তিনি ঐতিহাসিক এক উত্তর দিয়েছিলেন:
মহান আল্লাহ মুহাম্মদ (সা.)-কে সত্যের দাওয়াত দিয়ে পাঠিয়েছেন, কর আদায়কারী হিসেবে নয়।
তিনি অমুসলিমদের গির্জা এবং উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং তাদের ওপর কোনো প্রকার জুলুম করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন।তাঁর ইনসাফপূর্ণ শাসনের ফলে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অভাবনীয় বরকত আসে। তিনি দুর্নীতি বন্ধ করে বায়তুল মালের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় করেন। ঐতিহাসিক
বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তাঁর আড়াই বছরের শাসনের শেষ দিকে মানুষ যাকাতের টাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত, কিন্তু সেই টাকা নেওয়ার মতো একজন গরিব মানুষও পুরো সাম্রাজ্যে খুঁজে পাওয়া যেত না।সেই সময় তিনি এ ও ঘোষণা করেছিলেন যে, কোনো নাগরিক যদি নিজের ঋণ পরিশোধ করতে না পারে, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার ঋণ শোধ করে দেওয়া হবে।
হাদিস সংকলনের উদ্যোগ:
ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো পবিত্র হাদিস শরীফ সংকলনের সরকারি নির্দেশ। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, আলেমদের মৃত্যু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণীসমূহ হারিয়ে যেতে পারে। তাঁর নির্দেশেই ইমাম জুহরী (রহ.)-এর মতো আলেমগণ আনুষ্ঠানিকভাবে হাদিস সংগ্রহের কাজ শুরু করেন, যা আজ আমাদের কাছে সহীহ হাদিস পৌঁছানোর পথ প্রশস্ত করেছে।
মৃত্যু : উমর ইবনে আবদুল আজিজের ইনসাফপূর্ণ শাসন উমাইয়া রাজপরিবারের অনেক সদস্যের স্বার্থে আঘাত হেনেছিল, কারণ তাঁরা আর আগের মতো বিলাসিতা করতে পারছিলেন না। ফলে ষড়যন্ত্র করে তাঁরই এক ভৃত্য বা গোলামকে দিয়ে খাবারের সাথে বিষ প্রয়োগ করা হয়। ৭২০ খ্রিস্টাব্দে ৩৯ বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
তাঁর মৃত্যুর পর সুলাইমান বিন আবদুল মালেকের আগের ওসিয়ত অনুযায়ী ইয়াজিদ বিন আবদুল মালেক (দ্বিতীয় ইয়াজিদ) ক্ষমতায় বসেন। তিনি ক্ষমতায় এসে উমর ইবনে আবদুল আজিজের অনেক মানবিক সংস্কার বাতিল করে দেন এবং পুনরায় উমাইয়াদের পুরনো ধারার শাসনে ফিরে যান।
আরো জানতে ক্লিক করুন:মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

Comments
Post a Comment