আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান : (৬৮৫–৭০৫ খ্রি.)
মারওয়ান ইবনে হাকাম মাত্র এক বছরের মতো বেঁচে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান ক্ষমতায় বসেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক।আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানকে উমাইয়া খিলাফতের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ইয়াজিদের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য যখন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে সব বিদ্রোহ দমন করে এক শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন।
আবদুল মালেকের শাসনের শুরুর দিকে মুসলিম সাম্রাজ্য একাধিক ভাগে বিভক্ত ছিল। মক্কায় আবদুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়ের (রা.)-এর শাসন চলছিল এবং ইরাকে মুখতার আল-সাকাফির প্রভাব ছিল।মুখতার
আল-সাকাফির বিদ্রোহ (৬৮৫–৬৮৭ খ্রি.): মুখতার আল-সাকাফি ছিলেন এক অত্যন্ত চতুর এবং বাগ্মী নেতা। তাঁর বিদ্রোহের মূল ভিত্তি ছিল কারবালার হত্যার প্রতিশোধ।
ইয়াজিদের মৃত্যুর পর কুফার শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে মুখতার 'তাওয়াবুন' (অনুশোচনাকারী) আন্দোলনের পর শিয়াদের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নিজেকে হযরত আলী (রা.)-এর পুত্র মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করেন। মুখতার কুফা দখল করার পর বেছে বেছে কারবালার যুদ্ধের সাথে জড়িত কারবালার খুনি শিমার ইবনে জিলজুশান, খুউলি ইবনে ইয়াজিদ এবং ওমর ইবনে সা'দকে হত্যা করেন। আব্দুল মালেক তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে পাঠান। কিন্তু মুখতারের সেনাপতি ইব্রাহিম ইবনে মালিক আল-আশতার জাব নদীর তীরে ইবনে জিয়াদকে পরাজিত ও হত্যা করেন।মুখতার একদিকে উমাইয়া এবং অন্যদিকে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের—উভয় পক্ষের শত্রু হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত মক্কার খলিফা আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের ভাই মুসআব ইবনে জুবায়ের কুফা অবরোধ করেন। ৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুখতার নিহত হন।
মুসআব
ইবনে জুবায়েরের পরাজয় (৬৯১ খ্রি.): মুখতারকে পরাজিত করার পর মুসআব ইবনে জুবায়ের ইরাকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ।আব্দুল মালেক বুঝতে পেরেছিলেন ইরাক জয় করতে না পারলে দামেস্ক নিরাপদ নয়। তিনি ইরাকের বড় বড় গোত্রপতিদের গোপনে চিঠি পাঠিয়ে এবং অর্থের লোভ দেখিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে আসেন। ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে দাজলা নদীর তীরে মাসকিন নামক স্থানে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের শুরুতেই মুসআবের অনেক বিশ্বস্ত সেনাপতি বিশ্বাসঘাতকতা করে আব্দুল মালেকের পক্ষে চলে যায়। মুসআব অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন, কিন্তু চারপাশ থেকে ঘেরাও হয়ে তিনি এবং তাঁর পুত্র ঈসা শহীদ হন। এই বিজয়ের ফলে ইরাক উমাইয়াদের অধীনে আসে এবং আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের মক্কায় একা হয়ে পড়েন।
আব্দুল্লাহ
ইবনে জুবায়ের (রা.) ও মক্কা অবরোধ
(৬৯২ খ্রি.): এটি ছিল আব্দুল মালেকের শাসনের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর নাতি এবং একজন অত্যন্ত পরহেজগার সাহাবী। আব্দুল
মালেক তাঁর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও অনুগত সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে ২০ হাজার সৈন্য দিয়ে মক্কায় পাঠান। হাজ্জাজ
মক্কা শহর চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন এবং জাবালে আবু কুবাইস পাহাড়ে মিনজানিক (পাথর নিক্ষেপ করার যন্ত্র) স্থাপন করেন। এই যন্ত্র দিয়ে কাবার ওপর বিশাল বিশাল পাথর নিক্ষেপ করা হয়, যার ফলে কাবা ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়। দীর্ঘ ৭ মাস অবরোধের ফলে মক্কায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। অনেক সমর্থক জুবায়ের (রা.)-কে ছেড়ে চলে যান। তাঁর মা আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) তাঁকে কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণের চেয়ে বীরের মতো মৃত্যু বরণ করার উৎসাহ দেন। ৬৯২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে হাজ্জাজের বাহিনীর সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) শহীদ হন। এর মাধ্যমে আরবে উমাইয়া বিরোধী আন্দোলনের অবসান ঘটে।
খারেজি
বিদ্রোহ দমন (৬৯৪–৬৯৮ খ্রি.) : খারেজিরা ছিল এমন এক চরমপন্থী দল যারা উমাইয়া এবং জুবায়ের—উভয় খিলাফতকেই অস্বীকার করত। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পারস্য এবং বসরায় ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। আব্দুল
মালেক হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে ইরাকের গভর্নর বানিয়ে পাঠান। কুফার মসজিদে দাঁড়িয়ে হাজ্জাজ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন: আমি এমন কিছু মাথা দেখতে পাচ্ছি যা পেকে গেছে এবং কাটার সময় হয়েছে।
হাজ্জাজ তাঁর অভিজ্ঞ সেনাপতি মুহাল্লাব ইবনে আবু সুফরাকে খারেজিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে পাঠান। মুহাল্লাব অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে একের পর এক খারেজি দুর্গ ধ্বংস করেন। প্রায় ৪-৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের পর খারেজিদের প্রধান দুই শাখা (আজরাকি ও নাজাত) নির্মূল করা হয়। ফলে ইরাক ও পারস্যে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটে। আবদুল মালেক পুরো মুসলিম জাহানকে পুনরায় দামেস্কের একক শাসনের অধীনে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এই এককেন্দ্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার কারণেই তাঁকে উমাইয়াদের প্রকৃত রক্ষক বলা হয়।
প্রথম ইসলামি মুদ্রা প্রবর্তন:আবদুল মালেকের সবচেয়ে বড় সংস্কার ছিল নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা। তাঁর আগে মুসলিম সাম্রাজ্যে রোমান (বাইজেন্টাইন) এবং পারস্যের (সাসানীয়) মুদ্রা প্রচলিত ছিল। তিনি ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) এবং দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) চালু করেন। এই মুদ্রাগুলোতে কোনো ছবি বা প্রতীকের বদলে পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং ইসলামি বাণী খোদাই করা হয়েছিল। এর ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয় এবং বিজাতীয় মুদ্রার ওপর নির্ভরতা শেষ হয়।
আরবি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান:তাঁর শাসনের আগে খিলাফতের প্রশাসনিক কাজগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রিক, ফারসি বা কিবতি ভাষায় সম্পন্ন হতো। আবদুল মালেক আদেশ জারি করেন যে, পুরো সাম্রাজ্যের সমস্ত দাপ্তরিক কাজ এবং রেকর্ড শুধুমাত্র আরবি ভাষায় সংরক্ষণ করতে হবে। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে আরবি ভাষা কেবল ধর্মের ভাষা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান, প্রশাসন এবং শিক্ষার ভাষায় পরিণত হয়। এটি বিভিন্ন জাতির মুসলমানদের মধ্যে ভাষাগত ঐক্য তৈরি করেছিল।
স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময়: জেরুজালেমে অবস্থিত বিখ্যাত কুব্বাত আস-সাখরা বা ডোম অফ দ্য রক আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলেই (৬৯১ খ্রিস্টাব্দে) নির্মিত হয়। এটি ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম প্রাচীন ও সুন্দর নিদর্শন। তিনি চেয়েছিলেন মুসলিম স্থাপত্যের এমন একটি নিদর্শন তৈরি করতে যা তৎকালীন বড় বড় গির্জা বা রোমান প্রাসাদের জৌলুসকেও ছাড়িয়ে যাবে। আজও এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশাসনিক ও ডাক ব্যবস্থার উন্নয়ন:
তিনি পুরো সাম্রাজ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ও ডাক ব্যবস্থা (বরিদুল মালেক) গড়ে তোলেন। ঘোড়ার মাধ্যমে দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য বিভিন্ন স্থানে বিশ্রামাগার ও ঘোড়া পরিবর্তনের স্টেশন তৈরি করেন। এর ফলে দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে বিদ্রোহ বা জরুরি খবর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানী দামেস্কে পৌঁছে যেত। এটি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
কুরআন শরিফে হরকত বা নুকতা প্রদান:অনেকের মতে, তাঁর শাসনামলেই (এবং তাঁর সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের তত্ত্বাবধানে) কুরআন শরিফের লিপিতে নুকতা (বিন্দু) এবং হরকত (জের-জবর-পেশ) ব্যাপকভাবে সংযোজন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল অনারব মুসলমানরা যাতে কোনো ভুল ছাড়াই সঠিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে। এটি ইসলামি শিক্ষা প্রসারে এক অমর অবদান।
আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান ২১ বছর (৬৮৫–৭০৫ খ্রি.) শাসন করেন। তাঁর সময় থেকেই উমাইয়া সাম্রাজ্য একটি সুশৃঙ্খল আরব সাম্রাজ্যে রূপ নেয়। আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক (ওয়ালিদ ১) খলিফা হিসেবে ক্ষমতায় বসেন।
আবদুল মালেক তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর পুত্রদের শাসনের জন্য তৈরি করেছিলেন। তিনি তাঁর বড় ছেলে ওয়ালিদকে প্রথম উত্তরাধিকারী এবং মেজো ছেলে সুলাইমানকে দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করে যান। এর ফলে তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষমতা নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা বা যুদ্ধ হয়নি।

Comments
Post a Comment