"বাগদাদের স্বর্ণযুগ" খলিফা আল-মামুন : (৮১৩–৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ)
খলিফা হারুন-অর-রশিদের পুত্র আল-মামুন ছিলেন আব্বাসীয় বংশের সপ্তম এবং সম্ভবত সবচেয়ে মেধাবী খলিফা। তাঁর শাসনকালকে ইসলামের ইতিহাসে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বর্ণযুগ বলা হয়।
তিনি কেবল একজন বিজেতা ছিলেন না, বরং একজন দার্শনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শাসক ছিলেন।গৃহযুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতা: গৃহযুদ্ধে ভাই আল-আমিনকে পরাজিত করার পর মামুন শুরুতে বাগদাদে আসেননি। তিনি মার্ভ (খোরাসান) থেকে শাসনকাজ চালাতেন। পারসিক
প্রভাব এবং বাগদাদের বিশৃঙ্খলার কারণে শুরুতে অনেক সমস্যা হলেও ৮১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিজয়ী বেশে বাগদাদে প্রবেশ করেন এবং সাম্রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। তিনি পারস্য এবং আরব কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করেন, যদিও তাঁর আমলে পারসিকদের প্রাধান্য কিছুটা বেশি ছিল।
বাইতুল হিকমাহ ও বিশ্বকোষীয় বিপ্লব : আল-মামুনের শাসনামলের সবচেয়ে বড় গৌরব হলো বাইতুল হিকমাহ এর চরম বিকাশ। তিনি গ্রিক, ভারতীয় এবং পারস্যের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য বিশেষ বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। অ্যারিস্টটল, প্লেটো, টলেমি এবং ভারতীয় গণিতবিদদের বইগুলো এই সময়েই বৃহৎ পরিসরে আরবিতে অনূদিত হয়। কথিত আছে, তিনি কোনো বইয়ের অনুবাদের বিনিময়ে লেখককে সেই বইয়ের ওজনের সমান সোনা দান করতেন। এর ফলে বাগদাদ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়।
বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যার জয়যাত্রা: আল-মামুন নিজে বিজ্ঞান ও গণিত খুব পছন্দ করতেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় আরবরা বিজ্ঞানে অভাবনীয় উন্নতি করে। তিনি বাগদাদ এবং দামেস্কে বিশ্বের প্রথম সারির মানমন্দির স্থাপন করেন। সেখানে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করেছিলেন এবং গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন।
আধুনিক বীজগণিতের জনক মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি খলিফা মামুনের দরবারেই তাঁর বিখ্যাত কাজগুলো সম্পন্ন করেন। মামুনের অনুপ্রেরণাতেই তিনি প্রথম 'অ্যালজেব্রা' বা বীজগণিতবিষয়ক বই লিখেছিলেন।
মুতাজিলা মতবাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক: আল-মামুন বিশ্বাস করতেন যে ধর্মকে যুক্তির আলোয় দেখা উচিত। তিনি মুতাজিলা নামক একটি ধর্মীয় ও দার্শনিক মতবাদকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেন। এই মতবাদের মূল কথা ছিল কুরআন সৃষ্টি নাকি অনাদি এই নিয়ে বিতর্ক। তিনি এই মতবাদটি সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, যা ইতিহাসে মিহনা বা ধর্মীয় পরীক্ষা হিসেবে পরিচিত। এর ফলে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতো বড় বড় আলেমদের সাথে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। এটি তাঁর শাসনামলের একটি বিতর্কিত দিক।
সামরিক অভিযান ও সীমানা রক্ষা:খলিফা
আল-মামুন কেবল একজন জ্ঞানপিপাসু শাসকই ছিলেন না, বরং তিনি একজন অত্যন্ত দক্ষ সামরিক সেনানায়কও ছিলেন। তাঁর ২১ বছরের শাসনামলে তিনি একদিকে যেমন ঘরোয়া বিদ্রোহ দমন করেছেন, অন্যদিকে রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একের পর এক সফল অভিযান চালিয়ে আব্বাসীয় খিলাফতের সীমানা রক্ষা করেছেন। মিশরের ডেল্টা অঞ্চলে কর বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে এক বিশাল বিদ্রোহ দেখা দেয়। মামুন নিজেই মিশরে যান এবং পরিস্থিতি শান্ত করেন। এটি ছিল কোনো আব্বাসীয় খলিফার মিশরে প্রথম সফর।পারস্যের আজারবাইজান অঞ্চলে 'বাবাক খোররামি' নামক এক বিদ্রোহী নেতা খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। তিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আব্বাসীয় বাহিনীকে নাকাল করে রেখেছিলেন। মামুন তাঁর সেনাপতিদের দিয়ে বাবাককে কোণঠাসা করে রাখেন, যা পরবর্তীতে তাঁর ভাই আল-মুতাসিমের আমলে পুরোপুরি সমাপ্ত হয়। যদিও স্পেন (আন্দালুসিয়া) এবং মরক্কো সরাসরি তাঁর অধীনে ছিল না, কিন্তু তিনি কূটনৈতিকভাবে সেখানে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
খিলাফতের সীমানা বিস্তার (মধ্য এশিয়া ও সিন্ধু) :মামুন তাঁর শৈশব থেকেই খোরাসানে থাকায় মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ভালো বুঝতেন। তাঁর শাসনামলে কাবুলের হিন্দু শাহী রাজবংশ এবং মধ্য এশিয়ার অনেক ছোট ছোট রাজ্য আব্বাসীয়দের বশ্যতা স্বীকার করে। ইসলামের আলো অনেক গভীরে পৌঁছে যায়। সিন্ধু প্রদেশে তখন ছোট ছোট অনেক বিদ্রোহ ছিল। মামুন সেখানে তাঁর বিশ্বস্ত গভর্নরদের পাঠিয়ে শান্তি স্থাপন করেন এবং খিলাফতের কর আদায় ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।
আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থা ও ডাক যোগাযোগ: সীমানা রক্ষা এবং বিদ্রোহ আগেভাগে জানার জন্য মামুন একটি বিশাল 'বারিদ' (ডাক ও গোয়েন্দা বিভাগ) গড়ে তুলেছিলেন।তাঁর অধীনে হাজার হাজার পুরুষ ও নারী গোয়েন্দা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যারা সাম্রাজ্যের কোণায় কোণায় কী ঘটছে তা দ্রুত খলিফাকে জানাত।রোমান সীমান্তে তিনি ছোট ছোট বহু কেল্লা বা 'রিবাত' তৈরি করেছিলেন, যাতে শত্রুরা হঠাৎ আক্রমণ করতে না পারে।
বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধ: খলিফা মামুনের শাসনামলে রোমানদের সাথে আব্বাসীয়দের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে ওঠে। ৮৩০ খ্রিস্টাব্দে মামুন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে রোমান সীমান্ত অতিক্রম করেন। তিনি একে একে 'লুমন'সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করেন। রোমান সম্রাট থিওফিলাস শান্তি প্রস্তাব পাঠালেও মামুন তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। ৮৩১ এবং ৮৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পুনরায় আক্রমণ চালিয়ে সিলিসিয়া (Cilicia) অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সরাসরি কনস্টান্টিনোপল দখল করা। তিনি রোমান সীমান্তের ভেতরে টাইয়ানা নামক স্থানে একটি বড় সামরিক শহর এবং শক্তিশালী ক্যান্টনমেন্ট তৈরির কাজ শুরু করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল রোমানদের ওপর সার্বক্ষণিক চাপ বজায় রাখা এবং স্থায়ীভাবে বাইজেন্টাইন এলাকা দখল করা।
যুদ্ধের ময়দানে খলিফার মৃত্যু: ৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মকালে খলিফা আল-মামুন তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে রোমান সীমান্তের ভেতরে বদন্দুন নামক স্থানে তাবু ফেলেন। আবহাওয়া ছিল প্রচণ্ড গরম। দীর্ঘ সামরিক অভিযানের ক্লান্তি এবং প্রচণ্ড তাপদাহে খলিফা কিছুটা অসুস্থ বোধ করছিলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি নদীর ঠান্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এবং উত্তর দিক থেকে আসা টাটকা ফল (বিশেষ করে খেজুর বা তরমুজ) খেয়েছিলেন।
সেই রাতে তাঁর প্রচণ্ড জ্বর আসে। চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টা করেও তাঁর শরীরের তাপমাত্রা কমাতে পারেননি। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল হয়তো কোনো সংক্রামক ব্যাধি বা অতিরিক্ত গরম থেকে হওয়া 'হিট স্ট্রোক'। খলিফা যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন টাইয়ানা শহরে তাঁর স্বপ্নের সেই বিশাল ক্যান্টনমেন্ট তৈরির কাজ পুরোদমে চলছিল।খলিফার অবস্থা আশঙ্কাজনক শুনে নির্মাণকাজ থমকে যায়। আল-মামুন বুঝতে পেরেছিলেন তিনি আর বাঁচবেন না। তিনি তাঁর ভাই আল-মুতাসিম বিল্লাহকে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন।




Comments
Post a Comment