"আগামীকাল আপনি মারা যাবেন - এটা জানতে পারলে আপনি কি করবেন?


 

আগামীকাল আপনি মারা যাবেন - এটা জানতে পারলে আপনি কি করবেন? একটা ভাইভা বোর্ডের প্রশ্ন ছিল এরকম।

প্রার্থী জবাব দিল, বেছে বেছে আমার শত্রুদের সাথে সাক্ষাৎ করব।

উত্তর শুনে ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা তো অবাক। একজন জানতে চাইলেন, কেন? আপনি এমনটা কেন করবেন?

জবাবে প্রার্থী বলল, যারা আমার আপনজন, তাদের ওপর আর মায়া বাড়ানোর মানে হয় না - তাতে তাদের আর আমার কষ্টই বাড়বে। এর বদলে আমার প্রতি যাদের রাগ, তাদের সাথে একটু ভালো ব্যবহার করলে শেষ সময়ে তারাও হয়তো আমার জন্য দোয়া আর আশীর্বাদ করবে।

ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার সব কাজ যেন নিজের জন্য না হয়! কিছু কাজ শত্রুর কথা ভেবেও করুন, তাতে আখেরে আপনারই লাভ। যে লোকটা আপনার বানান ভুল ধরে, সে আপনার লেখার প্রশংসাকারীর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার ভয়ে সঠিক বানান লিখুন, আপনার লেখার মান বেড়ে যাবে।প্রতিটা অর্জনের চেষ্টার পেছনে শত্রু থাকলে সেটা দ্রুত পাওয়া যায়। শত্রুদের সম্পর্কে সতর্ক থাকুন, কিন্তু তাদেরকে ঘৃণা করবেন না। একটা মানুষ যখন আপনাকে গালি দেয়, তখন সে আপনার কাছ থেকেও একটা পাল্টা গালি শোনার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। আপনি গালি দিয়ে দিলেন তো শেষ; ব্যাপারটা চূড়ান্ত নোংরামি হয়ে গেল আর তার উদ্দেশ্য সফল হল। আর যদি গালির জবাবে হাসিমুখে তাকে 'শুভকামনা' জানান, সে আপনাকে নতুন করে আবিষ্কার করবে। কাউকে তর্কে হারানো মানেই জয়ী হওয়া নয়, কখনো কখনো অন্যের যুক্তি মেনে নেওয়াই প্রকৃত বিজয়।আমি যখন কিছু লিখি, তখন সহমত কমেন্ট দেখলে খুশি হই। তবে কেউ যৌক্তিকভাবে দ্বিমত দিলেও অখুশি হই না। সমালোচকদের ভালোবাসুন; দিন শেষে তারা আপনাকে নিয়ে ভাবতে বসে যাবে - এটা পরীক্ষিত সত্য। মনে রাখবেন প্রত্যেক শত্রুই আপনার জন্য এক একটা সতর্ক বার্তা। আর সতর্কতা সফলতার জন্য প্রচন্ড দরকারি! কেউ অমুকের ভাতিজা বলে পাওয়ার দেখালে, আপনি নিজেকে তমুকের ভাগ্নে হিসেবে পরিচয় না দিয়ে লোকটাকে সালাম দিয়ে চলে আসুন। এতে আপনি ছোট হবেন না, বরং বড় হবেন।

ভাইভা বোর্ডের প্রার্থীর সেই অদ্ভুত কিন্তু গভীর উত্তরটি আসলে আমাদের প্রচলিত জীবনদর্শনের গালে একটা মৃদু চড়। আমরা সাধারণত জীবনের শেষ মুহূর্তে প্রিয়জনদের বুকে টেনে নিতে চাই, যা খুবই স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু প্রার্থীর যুক্তিটি মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এক নির্মম সত্যকে উন্মোচন করে— মায়া যত গভীর হয়, বিচ্ছেদের ক্ষত তত বেশি রক্তক্ষরণ ঘটায়। প্রিয়জনকে আরও বেশি কাঁদিয়ে যাওয়ার চেয়ে, শত্রুর মনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভটুকু মুছে দিয়ে যাওয়া অনেক বেশি কল্যাণকর।

বাস্তব জীবনে আমরা শত্রুকে এড়িয়ে চলি, তাকে ঘৃণা করি কিংবা তাকে ধ্বংস করার ছক কষি। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, আমাদের জীবনে স্তাবক বা প্রশংসাকারীদের চেয়ে সমালোচক বা শত্রুদের ভূমিকা অনেক বেশি গঠনমূলক। একজন স্তাবক আপনাকে সাময়িক আত্মতৃপ্তি দেবে, যা আপনাকে অন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু একজন শত্রু বা কড়া সমালোচক আপনার প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখে। আপনার একটা ছোট ভুলও তার চোখ এড়ায় না। লেখক হিসেবে যখন কেউ আপনার বানান ভুল ধরে, বা আপনার মতামতের তীব্র বিরোধিতা করে, তখন সে আসলে পরোক্ষভাবে আপনার মেন্টর বা শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। তার সেই নিখুঁত সমালোচনার ভয়েই আপনি নিজেকে আরও নিখুঁত করার চেষ্টা করেন। ফলে আপনার কাজের মান বাড়ে।

 আরো জানতে ক্লিক করুন: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের শাসন

আধুনিক যুগে সোশ্যাল মিডিয়া বা আমাদের চারপাশের সমাজটাকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মানুষ এখন পরমতসহিষ্ণুতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। কেউ একটা দ্বিমত পোষণ করলেই আমরা মারমুখী হয়ে উঠি, গালির জবাবে আরও নোংরা গালি ছুড়ে দিই। আমরা ভাবি, তর্কে জেতা বা অপর পক্ষকে চুপ করিয়ে দেওয়াটাই বীরত্ব। কিন্তু প্রকৃত বীরত্ব হলো নিজের ভেতরের অহংকারকে দমন করা। কেউ যখন আপনাকে নিচু করার জন্য গালি দিচ্ছে, সে আসলে আপনার ভেতরের পশুত্বটাকে টেনে বের করার ফাঁদ পাতছে। আপনি যখন তার ফাঁদে পা না দিয়ে হাসিমুখে তাকে 'শুভকামনা' জানান, তখন এক মুহূর্তের জন্য হলেও তার ভেতরের বিবেক জাগ্রত হয়। সে নিজের ক্ষুদ্রতা বুঝতে পেরে লজ্জিত হয়।

আমাদের সমাজে এখন 'অমুকের ক্ষমতা' বা 'তমুকের পরিচয়' দিয়ে অন্যকে দাবিয়ে রাখার এক নোংরা প্রতিযোগিতা চলছে। কেউ ক্ষমতার দাপট দেখালে আমরাও নিজের ভেতরের অহংকার বা অন্য কোনো বড় পরিচয় দিয়ে তাকে টেক্কা দিতে চাই। এতে সাময়িকভাবে হয়তো একটা অহংবোধ তৃপ্ত হয়, কিন্তু দিনশেষে অশান্তি আর শত্রুতা ছাড়া কিছুই অর্জিত হয় না। এর চেয়ে অহংকারী মানুষটাকে একটা মুচকি হাসি আর সালাম দিয়ে চলে আসাটা যে কত বড় নৈতিক জয়, তা কেবল একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষই বোঝে। এতে আপনি হেরে গেলেন না, বরং আপনার ব্যক্তিত্বের উচ্চতা তার অহংকারের চেয়ে অনেক উপরে উঠে গেল।

পরিশেষে বলব, সমালোচনাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যারা আপনার পেছনে কথা বলে, দিনশেষে তারা আপনার জন্য তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। তারা আপনাকে নিয়ে ভাবছে। শত্রু বা সমালোচক হলো জীবনের সেই 'অ্যালার্ম ঘড়ি', যা আপনাকে কখনো অলস বা অসতর্ক হতে দেয় না। সফলতার সিঁড়িতে পা রাখতে হলে যেমন যোগ্যতার প্রয়োজন, তেমনি সেই যোগ্যতা ধরে রাখতে এই সতর্ক বার্তারূপী শত্রুদেরও সমান প্রয়োজন। তাই প্রশংসায় ভেসে না গিয়ে, সমালোচকদের ভালোবাসতে শিখুন,কারণ দিনশেষে তারাই আপনাকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

 

 আরো জানতে ক্লিক করুন: বাংলার ইতিহাস


Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)