ব্রহ্মপুত্র নদ

ব্রহ্মপুত্র নদ :ব্রহ্মপুত্র নদ কেবল একটি জলধারা নয়, এটি এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী এবং বিশালাকার একটি আন্তর্জাতিক নদ। তিব্বত, ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদটি তার অববাহিকার জীবনযাত্রা ও ভূ-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে বিশাল ভূমিকা রাখে।

ব্রহ্মপুত্র তিনটি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তার চরিত্র পরিবর্তন করে ।

.তিব্বত (চীন): হিমালয় পর্বতমালার মানস সরোবরের কাছে চেমায়ুংদুং হিমবাহ থেকে এর উৎপত্তি। তিব্বতে এর নাম সাংপো (Yarlung Tsangpo), যার অর্থ পবিত্রকারী।

. ভারত: অরুণাচল প্রদেশ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করার পর এর নাম হয় দিহং। আসামের সমতলে আসার পর এটি বিশাল প্রশস্ত হয়ে ব্রহ্মপুত্র  নাম ধারণ করে।

. বাংলাদেশ: ভারতের আসামের ধুবড়ী জেলা থেকে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর  সীমান্ত দিয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দেওয়ানগঞ্জের কাছে এটি দুটি শাখায় বিভক্ত হয়— প্রধান শাখাটি  যমুনা নামে দক্ষিণে গিয়ে পদ্মার সাথে মিলিত হয়, আর পুরোনো শাখাটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নামে ময়মনসিংহ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ব্রহ্মপুত্র নদ এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার (বাংলাদেশে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭৬ কিমি)। ব্রহ্মপুত্র একক কোনো খাতে প্রবাহিত না হয়ে অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে চলে। এর মাঝখানে অসংখ্য ছোট-বড় চর বা দ্বীপ তৈরি হয়। গঙ্গা নদীর পর ব্রহ্মপুত্র বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পলি বহনকারী নদী। এটি প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পলিমাটি জমা করে বদ্বীপ গঠন করে।

উপকারিতা :

উর্বরতা: ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটি বাংলাদেশের (বিশেষ করে কুড়িগ্রাম ও জামালপুর অঞ্চলের) জমিকে অসম্ভব উর্বর করে তোলে, যা কৃষি উৎপাদনে সহায়ক।

মৎস্য সম্পদ: এই নদ মিঠা পানির মাছের বিশাল ভাণ্ডার। ইলিশ মাছও উজান বেয়ে এই নদে পাওয়া যায়।

বিদ্যুৎ সম্ভাবনা: এর তীব্র স্রোতকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে (যদিও বাংলাদেশে সমতল ভূমির কারণে এটি সীমিত)।

অপকারিতা :

নদী ভাঙন: ব্রহ্মপুত্রের প্রধান সমস্যা হলো এর বিধ্বংসী ভাঙন। এটি প্রতি বছর হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি গিলে ফেলে।

ভয়াবহ বন্যা: বর্ষাকালে হিমালয়ের বরফ গলা পানি এবং বৃষ্টির কারণে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।

পরিবর্তনশীল গতিপথ: এই নদ তার গতিপথ দ্রুত পরিবর্তন করে, যার ফলে স্থায়ী কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঐতিহাসিক পরিবর্তন (১৭৮৭ সালের ভূমিকম্প):

একটি মজার বিষয় হলো, ১৭৮৭ সালের আগে ব্রহ্মপুত্রের প্রধান ধারাটি ময়মনসিংহ দিয়ে প্রবাহিত হতো। কিন্তু এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও বন্যার ফলে নদের তলদেশ উচু হয়ে যায় এবং মূল স্রোতটি দিক পরিবর্তন করে দক্ষিণে প্রবাহিত হতে শুরু করে, যা বর্তমানে যমুনা নদী নামে পরিচিত।

এটি এশিয়ার একমাত্র প্রধান নদ যা পুরুষবাচক নামে পরিচিত।

Comments

Popular posts from this blog

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাতের পর আরবের পরবর্তী ১১৮ বছরের রাজনীতি

আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা: (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

"আরব্য রজনীর রূপকথার রাজা" খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ও ক্ষমতার জন্য গৃহযুদ্ধ (৮০৯-৮১৩ খ্রিস্টাব্দ)