এপস্টেইনের বিকৃত যৌন অপরাধ ও নির্যাতনের ঘাটি প্রাইভেট আইল্যান্ড 'লিটল সেন্ট জেমস'
সারা দুনিয়ায় তোলপাড় চলছে এপস্টেইন ফাইলস নিয়ে। কুখ্যাত এপস্টেইনের সকল বিকৃত যৌন অপরাধ ও নির্যাতনের ঘাটি প্রাইভেট আইল্যান্ড লিটল সেন্ট জেমস আসলে কোথায়? কী জানা যায় এর সম্পর্কে? কী কী আছে সেখানে?
ক্যারিবীয় সাগরের পূর্বাঞ্চলে, ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের অন্তর্ভুক্ত সেন্ট থমাস দ্বীপের ঠিক দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ 'লিটল সেন্ট জেমস'। এখন এই অভিশপ্ত দ্বীপটি নিয়ে পুরো বিশ্বে তোলপাড় চলছে। তার কারণ সারা দুনিয়া তোলপাড় করা কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের প্রাইভেট আইল্যান্ড।
ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য
লিটল সেন্ট জেমস মূলত একটি হিলি আইল্যান্ড। দ্বীপটির মাঝখানে রয়েছে উঁচু টিলা ও ঢালু পাহাড়। এখান থেকে ক্যারিবীয় সাগরের বিস্তীর্ণ অংশ দেখা যায়। দ্বীপের চারপাশে রয়েছে কোরাল রিফ, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পানির রং এখানে নীল থেকে ফিরোজা, যা ভার্জিন আইল্যান্ডস অঞ্চলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
উষ্ণ ও আর্দ্র ট্রপিক্যাল জলবায়ূ থাকে এখানে। সারা বছরই দেখা যায় রোদপ্রধান আবহাওয়া। বর্ষাকালে হালকা ঝড় ও হারিকেনের প্রভাব পড়ে, তবে বছরের বড় সময় দ্বীপটি শান্ত ও পর্যটনবান্ধব থাকে। ভাবতেই কষ্ট হয়, এই সুন্দর দ্বীপটিই একসময় গড়ে ওঠে জেফ্রি এপ্সটেইনের শিশু নির্যাতন ও বিকৃত যৌনাচারারের ঘাটি হিসেবে।
প্রাকৃতিক সৈকত ও ছোট ছোট কোভ, পাথুরে উপকূলের পাশাপাশি সাদা বালির অংশ
ক্যারিবীয় গাছপালা যেমন নারকেল, পাম, ঝোপঝাড় ও শুষ্ক বনাঞ্চল
জেফ্রি এপস্টেইনের মালিকানায় থাকাকালে লিটল সেন্ট জেমস কার্যত একটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর প্রাইভেট রিসোর্টে পরিণত হয়। এখানে গড়ে তোলা হয় অনেক স্থাপনা। যেমন:
মেইন রেসিডেন্স : বিলাসবহুল প্রধান বাড়ি, যেখানে এপস্টেইনের ও তার ঘনিষ্ঠ অতিথিরা থাকতেন
গেস্ট হাউস ও কটেজ: অতিথিদের জন্য একাধিক আলাদা ভবন
হেলিপ্যাড: ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারে যাতায়াতের সুবিধা
ডক ও প্রাইভেট জেটি: ইয়ট ও নৌযানের জন্য
সুইমিং পুল ও সানডেক
জেনারেটর ও পানির ট্যাংক: দ্বীপের নিজস্ব বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থাপনা
তবে দ্বীপের সবচেয়ে আলোচিত স্থাপনাটি ছিল একটি গম্বুজ আকৃতির ভবন, যা অনেকটা মন্দিরের মতো দেখতে। সরকারি নথিতে এটিকে সাধারণ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র বা অফিস বলা হলেও, এর ব্যবহার নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়েছে। লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ডের এই কথিত মন্দিরটি আসলে এই দ্বীপকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি রহস্য, গুজব ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই স্থাপনাটি একটি গম্বুজ আকৃতির ভবন, রং হালকা নীল–সাদা। দূর থেকে দেখলে এটি প্রাচীন গ্রিক বা রোমান টেম্পল মনে হয়। আবার কারও চোখে মেসোনিক লজ বা পৌত্তলিক উপাসনালয়ের মতো মনে হয়।
ভবনটির উপরে রয়েছে একটি বড় ডোম (গম্বুজ), সামনে স্তম্ভের মতো গঠন, যা দ্বীপের অন্য বিলাসবহুল ভবনগুলোর থেকে একেবারেই আলাদা। ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, এপ্সটেইনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল এটি মূলত দ্বীপের উঁচু জায়গা থেকে চারপাশ দেখার জন্য বানানো। এর ভেতরে কোনো ধর্মীয় কার্যক্রমের অনুমতি চাওয়া হয়নি।
এফবিআই ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্বীপে অভিযান চালালেও ভবনের ভেতরের বিস্তারিত কোনো ছবি বা পূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। কোনো সরকারি নথিতে এখানে ধর্মীয় প্রতীক, বলি বা গোপন আচার–এর প্রমাণ নেই, তারপরেও প্রশ্ন রয়েই যায়। বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনি ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
এপস্টেইনের মৃত্যুর পর দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তত্ত্বাবধানে যায়। পরে এটি বিক্রি হলেও দ্বীপের ভৌগোলিক সৌন্দর্য আজও অক্ষুণ্ন, কিন্তু এর সামাজিক ও নৈতিক ভার এতটাই গভীর যে, পর্যটন মানচিত্রে জায়গা পাওয়ার আগেই এটি ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
লিটল সেন্ট জেমস
আমাদের সামনে
এক দ্বৈত
বাস্তবতা তুলে
ধরে—একদিকে
অপরূপ প্রকৃতি,
অন্যদিকে মানব
ইতিহাসের ভয়ংকর
অপরাধ। এই
দ্বীপ তাই
শুধু একটি
জায়গা নয়,
বরং ক্ষমতা,
নিঃসঙ্গতা ও
নৈতিক পতনের
এক নীরব
প্রতীক।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই দ্বীপেই বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। মার্কিন আদালতের নথি, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য এবং পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে—লিটল সেন্ট জেমস ছিল এপ্সটেইনের অপরাধচক্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানেই তিনি ক্ষমতাবান অতিথিদের জন্য কিশোরীদের পাচার ও নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ উঠে আসছে এপস্টেইন ফাইলসে।
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে এপস্টেইনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তবে তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়নি লিটল সেন্ট জেমসকে ঘিরে প্রশ্ন। বরং আরও গভীর হয় রহস্য। দ্বীপে কারা যেতেন? কী ঘটত সেখানে? কেন এত বছর ধরে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি? এপস্টেইনের মৃত্যুর পর দ্বীপটি জব্দ করা হয় এবং ২০২৩ সালে এক বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী এটি কিনে নেন, যিনি দাবি করেন—এই দ্বীপকে তিনি নতুন পরিচয়ে ফিরিয়ে আনতে চান।
সূত্র: উইকিপিডিয়া, সিবিএস, বিবিসি
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
Comments
Post a Comment